

সম্প্রতি বছরজুড়ে বর্ষা মৌসুমের ডেঙ্গু রোগ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শীতকালেও ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই। মৌসুমি রোগ হিসেবে পরিচিত ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে দুর্ভোগের নাম। এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখনো আশাব্যঞ্জক কোনো খবর নেই।
গতকাল কোনো মৃত্যু না হলেও ৪১০ জন ডেঙ্গু রোগী রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। নভেম্বর মাসেই মৌসুমের সর্বোচ্চ ২৩ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। চলতি মাসেই ডেঙ্গুতে ৯৪ জন মারা গেছেন, যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ। ফলে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৩৭৭ জনে পৌঁছেছে।
এ পর্যন্ত ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ১৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। গবেষকরা আগেই আশঙ্কা করেছিলেন, নভেম্বরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু হতে পারে, যা বাস্তব হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, কার্যকর পরিকল্পনার অভাব এবং মশক নিধনে ব্যর্থতার কারণে এবারও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা সরকারি হিসাবেই লক্ষাধিক ছাড়াতে পারে এবং মৃত্যুও ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেম্বরে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার উপদ্রব খুব একটা কমেনি। ডিসেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকবে। তাদের ধারণা, ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, নভেম্বরে এডিস মশার বিস্তার যতটা কমবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, ততটা কমেনি। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। শনাক্ত রোগী ও মৃত্যুর দিক থেকে মৌসুমের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে নভেম্বরে। আগামী মাসেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা নেই। মশাবাহিত রোগটির প্রকোপ থেকে মুক্তি পেতে হলে আগামী জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। আশঙ্কার বিষয় হলো, যদি আগামী মাসে আবার বৃষ্টি হয়, তবে ডেঙ্গুর প্রকোপ ফের বাড়তে পারে এবং ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ৯৩ হাজার ১৯৪ জন মানুষ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। এ সময় ডেঙ্গুতে ৩৭৭ জন মারা গেছেন।
চলতি মাসে (নভেম্বর) মারা গেছেন ৯৪ জন, অক্টোবরে ৮০ জন, সেপ্টেম্বরে ৭৬ জন, জানুয়ারিতে ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, মার্চে কোনো মৃত্যু হয়নি, এপ্রিলে ৭ জন, মে মাসে ৩ জন। জুন মাস থেকে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে—জুনে ১৯ জন, জুলাইয়ে ৪১ জন ও আগস্টে ৩৯ জন মারা গেছেন।
এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৯৩ হাজার ১৯৪ জনের মধ্যে জানুয়ারিতে ১ হাজার ১৬১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪ জন, মার্চে ৩৩৬ জন, এপ্রিলে ৭০১ জন, মে মাসে ১ হাজার ৭৭৩ জন, জুনে ৫ হাজার ৯৫১ জন, জুলাইয়ে ১০ হাজার ৬৮৪ জন, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬ জন, সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার ৮৬৬ জন, অক্টোবরে ২২ হাজার ৫২০ জন এবং নভেম্বরের ২৮ দিনে ২৩ হাজার ৩২২ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তাদের মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৯০ হাজার ৬৫২ জন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ২ হাজার ১৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী।
দেশের সর্বশেষ অবস্থা অনুযায়ী, মৃত্যুহীন একটি দিনে ৪১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০৩ জন ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে ৯৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০২ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৮ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩৭ জন, বরিশালে ৩৯ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৩১ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও রংপুর বিভাগে নতুন কোনো রোগী ভর্তি হয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এদিকে, গতকাল ৪৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ বছর এখন পর্যন্ত ৯০ হাজার ৬৫২ জন রোগী ছাড়পত্র পেয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার নিয়মিত ডেঙ্গু সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার দেশে ডেঙ্গু নিয়ে ৫৬৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং ওইদিন ৭ জনের মৃত্যু হয়।
২০০০ সালে ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। সে বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হন এবং ৯৩ জন মারা যান। তখন এটি সাধারণ মানুষের কাছে নতুন রোগ ছিল।
ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড হয় ২০২৩ সালে। সে বছর তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
গত বছর (২০২৪ সালে) জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন। এ সময়ে ৫৭৫ জন মারা যান।