

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ মন্তব্য করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার এ ধরনের চুক্তি করার সময় যথেষ্ট অস্থির ও উদ্বিগ্ন ছিল।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য হাত-পা বাঁধা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ইচ্ছা করলেই অন্তর্বর্তী সরকার বলতে পারত, নির্বাচিত সরকার আসছে, আপনারা তাদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাবেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উৎসাহ চরম মাত্রায় ছিল, যা বাজেটের সময় থেকেই লক্ষ্য করা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব মন্তব্য করেন আনু মুহাম্মদ। সভার আয়োজন করে ‘বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচ’।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্টারলিংকের সঙ্গে চুক্তি করার প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের চুক্তি করার ক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত উৎসাহ দেখে মনে হয়, তারা কার্যত বিভিন্ন কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন।’ নতুন সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, এই চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। কারণ, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষর করার কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনো এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। যেসব দেশ করেছে, তাদের চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক।’ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করলে তৈরি পোশাক খাত শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। তবে ব্যবসায়ীরা জানান, শর্তাবলী অস্পষ্ট, তুলার দাম বেশি হবে এবং রপ্তানির পরিমাণ নির্দিষ্ট নয়।
অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘ইউনূসের আগ্রহ কি তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও সুবিধার জন্য ছিল, নাকি জাতিসংঘ মহাসচিব হওয়ার আগের দায়িত্বে এ কাজ করা বাধ্যতামূলক ছিল?’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা চুক্তিকে ‘অসম ও ক্ষতিকর’ উল্লেখ করে বলেন, ‘চুক্তির শর্ত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও কৃষি-শিল্প খাতে ভর্তুকি সীমিত করার শর্ত উদ্বেগজনক।’ তিনি চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের করা চুক্তিগুলো আইনিভাবে ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এগুলো অনফেয়ার কন্ট্রাক্ট টার্মসের (অসম চুক্তি) উদাহরণ। নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিগুলো শুধুই অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও আইনগতভাবেও বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার মাধ্যমে এগুলো পর্যালোচনা করা এখন সময়ের দাবি।’
আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ওয়াচের কো-অর্ডিনেটর বরকত উল্লাহ মারুফ। সভায় উপস্থিত ছিলেন উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষক মাহা মির্জা।