কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশেষ লেখা

ভাষা আন্দোলনের বৈপ্লবিক তাৎপর্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ভাষা আন্দোলনের বৈপ্লবিক তাৎপর্য

বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন ঐতিহাসিক অবশ্যই, কিন্তু কোন অর্থে? সে কি শুধু এই একক অর্থে যে, অত্যন্ত বড় ও রক্তাক্ত এবং অতিশয় তাৎপর্যমণ্ডিত এক ঘটনা ঘটেছিল বায়ান্ন সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে? সেই অর্থেও নিশ্চয়ই, কিন্তু সেই একক অর্থে নয়। ঐতিহাসিক আরও একদিক দিয়ে এবং সেটাই প্রধান দিক।

সাংস্কৃতিক বিবেচনায় ভাষা আন্দোলন একদিক দিয়ে ছিল সামন্তবাদবিরোধী, অন্যদিক দিয়ে উপনিবেশবাদবিরোধী। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ধারণা সামন্ততান্ত্রিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের একটা স্বাভাবিক অঙ্গ। ধর্মের স্থলে ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার যে উদ্যোগ তার মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ছিল সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার বাইরে চলে আসার, পরলোকের চাইতে ইহলোককে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার। এর মধ্যে ছিল আত্মার চাইতে বস্তুকে অধিক বাস্তবিক জ্ঞান করার চেষ্টা, বহু যুগের প্রথা ও অভ্যাসের বিরুদ্ধে যাওয়ার উদ্যোগ—নিঃসন্দেহে। অন্যদিকে উর্দুর আধিপত্যকে মেনে না নেওয়ার যে মানসিকতা তা উপনিবেশবাদবিরোধী। পাঞ্জাবি শাসকরা বাংলাদেশকে তাদের উপনিবেশ হিসেবে শাসন অর্থাৎ শোষণ করবে শিক্ষিত বাঙালি তরুণরা এ অবস্থাটাকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। সেই বিদ্রোহ উপনিবেশবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশের সঙ্গে একদিকে তাই বহিঃদেশীয় শাসনের বিরোধ, অন্যদিকে বিরোধ দেশীয় সামন্তবাদী মানসিকতার।

এ দেশের সাংস্কৃতিক অগ্রগতির প্রধান শত্রুও ওই দুটি, একদিকে সামন্তবাদ, অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ। সামন্তবাদ অর্থনীতিতে যতটাই থাকুক না থাকুক, সংস্কৃতিতে আছে পুরোমাত্রায়—এখনো আছে, আছে অব্যাহত শক্তি ও প্রতিপত্তিতে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে যে এক ধরনের গ্রামীণ স্থবিরতা থাকে সেই স্থবিরতা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম প্রধান অংশ। এ স্থবিরতা নানান চেহারায় রয়েছে এবং তাকে নানানভাবে আদর্শায়িত ও গৌরবান্বিত করা হচ্ছে। আবহমান কালের যে বাংলার কথা বলা হয়, বলা হয় যে সোনার বাংলার কথা, সে এই স্থবির, চিত্রকল্প বাংলা। আমাদের অভিজ্ঞতার ও অনুভবের অনেক গভীরে শিকড় গেড়ে আছে যুগ-যুগান্তের পুরাতন সামন্তবাদী মানসিকতা। পুঁজিবাদী আধুনিকতার কোনো কোনো চিহ্ন এসেছে বটে, যেমন এসেছে যন্ত্রপাতি কিছু কিছু, কিছু আসবাব, কতকগুলো ধারণা, কিন্তু সেই চিহ্নসমূহ মরণপণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়নি প্রাচীন সামন্তবাদের সঙ্গে। বরং একই প্রভুর-সাম্রাজ্যবাদের—আনুকূল্যে এ দুই আপাতবিরোধী শক্তি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেছে আমাদের সংস্কৃতিতে এবং করবে। একই গৃহে পাশাপাশি দেখছি সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদ, সনাতন অভ্যাস ও আধুনিক অর্জন। একই ব্যক্তির মধ্যে আছে গভীর সংস্কারাচ্ছন্নতা ও উগ্র বিদেশিয়ানা। আধুনিকতা নব্যাগন্তুক, সে এমন তেজস্বী নয়, প্রগল্ভ নয় যে, ছিন্নভিন্ন করে দেবে বিগতযৌবন সামন্তবাদী চেতনাকে। প্রায়ই দেখা যায় আধুনিকতাটা ওপরের, মনের ভেতরে গভীর, অতলান্ত, সনাতন পন্থা। এ আধুনিকতা নিতান্ত মেকি, অত্যন্ত আত্মসচেতন, প্রচণ্ডরূপে ভীতু। সহাবস্থানে তাই বাধা নেই। বিদেশি প্রভুরা সেটাই চায়, তাতে সন্তুষ্ট হয়, কেননা তাতে দেশীয় জনসাধারণের মুক্তিকে প্রতিহত করার সুযোগ ও সম্ভাবনা দেখা দেয়।

ভাষা আন্দোলনকে একই সঙ্গে লড়তে হয়েছে দুয়ের বিরুদ্ধে। সংস্কৃতিকে চেয়েছে মুক্ত করতে সামন্তবাদের শান্ত কিন্তু কঠিন অবরোধ থেকে এবং উপনিবেশবাদ-সাম্রাজ্যবাদের নিষ্ঠুর লুণ্ঠনাভিলাষের আবেষ্টন থেকে। এ আন্দোলনকে যখন বলা হয় সাইনবোর্ড বদলানোর, টাইপরাইটার ভাঙার এবং অফিস-আদালতে ইংরেজির পরিবর্তে বাংলার হুকুম নামাদি রচনা করার আন্দোলন, তখন দেখি আবার সেই সামন্তবাদী সামান্যতা ও সংকীর্ণতাতেই প্রত্যাবর্তনের ছদ্মবেশী প্রচেষ্টা চলছে। প্রসারতা আসছে একটু, ইংরেজির জায়গায় বাংলা আসছে, কিন্তু সামান্যতা ও সংকীর্ণতা থাকছে। সামন্ততন্ত্রের জগৎটা ছোট্ট ও আত্মসন্তুষ্ট, সেই খর্বাকৃতি ও আত্মসন্তুষ্ট জগতে যদি আমরা ফিরে যাই, তবে ভাষা আন্দোলনের বৈপ্লবিক শক্তিকেই খাটো করে আনব আমরা। বাংলা প্রচলন গুরুত্বপূর্ণ অবশ্যই, কিন্তু সেটা মূল লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার নিগড় ভেঙে, সাম্রাজ্যবাদী আবেষ্টনকে ভূলুণ্ঠিত করে এগিয়ে যাওয়া, উৎপাদন ব্যবস্থায় ও উৎপাদন সম্পর্কে এমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যাতে মেহনতি মানুষের মুক্তি ঘটে, দারিদ্র্য দূর হয় এবং একটা নতুন জগৎ গড়ে ওঠে পুরাতন ও অমানবিক জগতের ধ্বংসস্তূপের ওপর। অতটাই সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা এই আন্দোলনের।

যদি এভাবে না দেখি তবে সেই না দেখার কারণটাও সাংস্কৃতিক। এ কথা সত্য যে, ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের একাংশের অসন্তোষের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আন্দোলন সেখানে থেমে থাকেনি। জনসাধারণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে এবং যে নতুন মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল বায়ান্ন সালে, তাই পরে বিকশিত হয়ে পর্যায়ক্রমিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। দুঃখের বিষয় যেটি, তা হচ্ছে—এ অগ্রগতির সঙ্গে তাল রেখে সাংস্কৃতিক চেতনা অগ্রসর হয়নি।

জনসাধারণের দিক থেকে দেখলে সামন্তবাদ ও উপনিবেশবাদের মধ্যে দ্বন্দ্বটুকু সামান্য, উভয়ের মধ্যে গভীর মৈত্রীটাই প্রধান সত্য। এই মৈত্রী স্বার্থের ভিত্তিতে। সামন্তবাদী চেতনা বিশেষ শ্রেণির কতকগুলো সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করতে চায়, রক্ষা করাই তার অভিপ্রায়। উপনিবেশবাদও তাই, সেও চায় বিশেষ সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ করবে অধীন শ্রেণিকে। তাই এরা একই উদ্দেশ্যের সমর্থক; অধিকাংশ মানুষকে বঞ্চিত রেখে অল্পকিছু মানুষকে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে, ভোগে-বিলাসে নিমজ্জিত রাখা। জনসাধারণকে তারা উভয়েই ভয় করে। উভয়েই গণবিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল, স্থিতাবস্থার সমর্থক, পরিবর্তনভীরু। দ্বন্দ্বটুকু পোশাকি, মেহনতি মানুষের সঙ্গে ষড়যন্ত্রটা বাস্তবিক।

দ্বন্দ্বও যে ষড়যন্ত্র হতে পারে পাকিস্তান আমলের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংকটের মধ্যে তা দেখা গেছে। ভাষা আন্দোলনকে শুধু বাংলা প্রচলনের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা তারই একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উপনিবেশবাদ বাংলা প্রচলনে বাধা দিয়েছে প্রথমে, কিন্তু পরে মেনে নিয়েছে। ঠিক আছে, স্বীকার করা গেল অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা, চালু করা গেল বাংলা উন্নয়নের বিবিধ উদ্যম। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের জীবনে কি পরিবর্তন এলো? চাল কি সস্তা হলো, সহজলভ্য হলো কি কাপড়? বাংলা চালু হওয়ার উদ্যমের মধ্য দিয়ে যে টাকাটা এলো তাতে লাভ হলো সেই শ্রেণির মানুষের, ইংরেজি চালু থাকাতেও যাদের সুবিধা ছিল। সাধারণ মানুষ চায় অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন, বাংলা ভাষা প্রচলন ততটাই মূল্যবান যতটা তা সাহায্য করতে পারে সেই মৌলিক পরিবর্তনকে। প্রচলন লক্ষ্য নয়, লক্ষ্যে পৌঁছবার উপায় মাত্র।

অথবা ধরা যাক, লাল-পেড়ে শাড়ি পরতে পারা না-পারা। সেও একটা সাংস্কৃতিক সংকট সৃষ্টি করেছিল। উপনিবেশবাদী শাসকরা এমন অবস্থার সৃষ্টি করল যে, মনে করা গেল লাল-পেড়ে শাড়ি পরতে পারা না-পারার ওপর আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। সেই হট্টগোলে তলিয়ে গেল এই কঠিন সত্যটি যে, দেশের অধিকাংশ মানুষের সমস্যা শাড়িই, শাড়ির পাড় নয়, পাড় আছে কি নেই, তা লক্ষ করার সময় হয় না বেশিরভাগ মানুষের। অথচ ওই বিশেষ ধরনের পোশাক পরিধানের অধিকার অর্জন করাকেই বিবেচনা করতে বাধ্য করা হলো মস্ত বড় অগ্রগতি হিসেবে। রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া না গাওয়া নিয়েও এই একই ব্যাপার। ওই গান গাইবার সুযোগ দিলেই যে সব মানুষ গাইবে, বা গাইতে পারবে, অথবা গাইতে চাইবে, তা মোটেই সত্য নয়। অথচ নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে এমন ধারণার সৃষ্টি করে দেওয়া হলো যে, ওই গান গাইতে পারাই জীবনের সর্বপ্রধান উদ্দেশ্য। গানের পক্ষে-বিপক্ষে ভাগাভাগি হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন বুদ্ধিজীবীরা। যারা গানের পক্ষে তারাই প্রগতিশীল। সেই বিশেষ মুহূর্তে তাই ছিল বটে। কিন্তু এ প্রগতিশীলতা নিতান্তই আপেক্ষিক। রবীন্দ্রসংগীতের ভক্তদের অনেকেই যে সামন্ত-সংস্কৃতির ও পুঁজিবাদের গোঁড়া সমর্থক, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তার চেয়ে বড় কথা, রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া না গাওয়ার মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক অবস্থায় কোনো তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসবার প্রতিশ্রুতি নেই। এসব কৃত্রিম সংকট যে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা অত্যন্ত গভীর। কেননা এরা মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয় মানুষের। সমাজে যে শোষণ আছে, আছে মেহনতি মানুষের কঠোর কঠিন বন্ধন, সেই রূঢ় সত্যটাকে ভুলে যাই আমরা।

আমাদের লোক-সংস্কৃতির দুর্বলতাগুলো সামন্ত-সংস্কৃতির বিশিষ্ট চরিত্রলক্ষণ। বস্তুত একই মানসিকতা বিস্তৃত উভয় ক্ষেত্রে এবং আমরা, শিক্ষিত ভদ্রলোকরা দূরে নই এ মানসিকতা থেকে। এ মানসিকতাই নিয়ামক শক্তি আমাদের, আধুনিকতা বহিরারোপিত পোশাক মাত্র। সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতিতে স্থবিরতা আছে, আছে আলস্য, উদ্যমহীনতা। সে-সংস্কৃতি সংকীর্ণ ও আত্মসন্তুষ্ট। গভীরভাবে অদৃষ্টবাদী। নিচের মানুষ ওপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, সব সম্পর্কই প্রভু-ভৃত্যের। গ্রাম্য বীরপূজা তথা পৌত্তলিকতা এবং সংস্কারাচ্ছন্ন আধ্যাত্মিকতা তার কেন্দ্রে প্রোথিত। অকিঞ্চনের সামান্য আয়োজন সেই সংস্কৃতি।

পুঁজিবাদী আধুনিকতা এমনিতে এ মানসিকতার বিরুদ্ধপক্ষ। সে উৎকেন্দ্রিক; তুচ্ছ জ্ঞান করে দেশীয় প্রথা ও অভ্যাসকে, অবজ্ঞা করে—ঘৃণাও। দেশের মধ্যে ভালো দেখতে পায় না কিছু, কিছুই হবে না বলে এ দেশের, বলে চরিত্র খারাপ এ দেশের মানুষের-ভীষণভাবে। এ আধুনিকতা নিজে উৎপাদন করে না, ভোগ করে এবং সুযোগ খোঁজে কী কী সুবিধা পাওয়া যায় দেশে এবং কখন কীভাবে যাওয়া যায় বিদেশে। এ আধুনিকতাও অতিশয় সামান্যই। কিন্তু শুধু সামান্যতাতেই ঐক্য নয় উভয়ের, প্রকৃত ঐক্য—আগেই উল্লেখ করেছি উভয়ের গণবিরোধিতায়।

যখন চরিত্র ঠিক নেই মানুষের বলে অভিযোগ করা হয় তখন সত্য কথা ও মিথ্যা কথা বলা হয় একই সঙ্গে। সত্য কথা এইদিক দিয়ে যে, সত্যি চরিত্র ঠিক নেই সুবিধাভোগকারী মধ্যবিত্তের। আবার সেটা মিথ্যা কথা এই জন্য যে, চরিত্রে ত্রুটি নেই জনসাধারণের। যত প্রকার অনাচার তা সুবিধাভোগীরাই করেন, তাদের সমাজ নোংরামির দ্বারা আচ্ছন্ন। সামাজিক আয়নায় তারা নিজেদের চেহারাই দেখেন শুধু এবং নিজেদেরই সমাজের একমাত্র সত্য বলে মনে করেন যেহেতু, তাই চরিত্রহীনতা ভিন্ন অন্য কিছু দেখতে পান না। অথচ জনসাধারণ চরিত্রশক্তির পরিচয় দিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত। তারাই চালু রেখেছেন উৎপাদনব্যবস্থা, সচল রেখেছেন সামাজিক যন্ত্র। বিশেষ করে যখন সংকট আসে বড় তখন সাধারণ মানুষের মানবিক, পরিশ্রমী, ভীতিহীন গুণগুলো এমনভাবে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে যার সামনে সুবিধাভোগীদের চরিত্রকে মনে হয় বিপরীতের আদর্শ উদাহরণ। যেমন, সংকট এসেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। সাধারণ মানুষের চরিত্রশক্তি সেদিন পরীক্ষিত হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা মূলত তাদের কারণেই এসেছে। কিন্তু যখন স্বাধীন হলো দেশ, দেখা গেল নেতারা ফিরে আসছেন তাদের নিরাপদ আশ্রয় থেকে, সেইসঙ্গে আসছে তাদের সঙ্গী-সাথিরা। তখন শুরু হলো লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতা, স্বাধীনভাবে, পূর্ণোদ্যমে। এ তৎপরতাই তাদের প্রধান কর্তব্য, কখনো গোপনে করেন, সুযোগ পেলে প্রকাশ্যে। জনসাধারণের উৎপাদন তারা নির্বিচারে ভোগ করেন এবং বলেন চরিত্র ঠিক নেই এ দেশের মানুষের।

তারা হতাশা পোষণ করেন দেশের ভবিষ্যৎ বিষয়ে, কেননা তারা নিজেদেরই দেখেন শুধু এবং নিজেদের মধ্যে আশাব্যঞ্জক কোনো কিছুই দেখতে পান না। জনসাধারণের অসামান্য শক্তিকে, সেই শক্তির অসম্ভব-সাধন ক্ষমতাকে তারা পাশ কাটিয়ে যান, চোখে পড়লেও দেখতে চান না কিছুতেই। সেই শক্তিকে গোপনে তারা ভয়ও করেন।

সবচেয়ে ক্ষতির কথা এ হতাশাকে তারা প্রচার করেন দেশবাসীর মধ্যে, বিভিন্ন মাধ্যমের ভেতর দিয়ে। মাধ্যমগুলো তাদের করতলগত—প্রচার মাধ্যমগুলো যেমন, সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোও তেমনি। যাদের গণমাধ্যম বলা হয় তারা আসলে প্রচারমাধ্যম ভিন্ন অন্যকিছু নয়। যখন যে-সরকার ক্ষমতায় থাকে তখন তার ক্ষমতায় থাকার পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা এদের প্রধান দায়িত্ব এবং সরকার যেহেতু বিশেষ শ্রেণির, তাই প্রচার মাধ্যমগুলো বিশেষ শ্রেণির পক্ষে এবং অনিবার্য প্রতিফল হিসেবে জনসাধারণের বিরুদ্ধে, বলে। মাধ্যমগুলোর আসল চরিত্র ধরা পড়ে দেশে যখন বড় রকমের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্ত এগিয়ে আসে সেই মুহূর্তে। তখন খবর দেওয়া নয়, খবর লুকিয়ে রাখা, বরং যা ঘটছে তার উল্টোটা প্রচার করার দায়িত্ব এদের নিতে হয়। খবরের অভাবে গোটা দেশ তখন গুজবের জলাভূমিতে পরিণত হয়। তারপর পরিবর্তন ঘটে গেলে দেখা যায় গতকালকের সবচেয়ে বড় দুষ্কৃতকারী আজকের সব চেয়ে বড় জননেতায় পরিণত হয়েছেন। প্রচার মাধ্যমগুলো নতুন শাসনকর্তাদের পক্ষে বলতে থাকে সেই একই ভাষায়, একই পদ্ধতিতে, একই কণ্ঠে। শুধু দেখা যায় নামগুলো বদলে গেছে, অথবা অদলবদল হয়েছে। পরিবর্তনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওই পর্যন্তই, নামের রদবদল শুধু। এমনকি শব্দগুলোও বদলায় না, সেই একই শব্দ ভেসে আসতে থাকে বেতারে, সংবাদপত্রে, টেলিভিশনে। পূর্বলিখিত নাটকে প্রথাসিদ্ধ অভিনয় দেখা যায়।

পরিবর্তন যে ব্যাপক ও গভীর হয় না তার কারণ অবশ্য পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় না। ঘটনা যে ঘটবে, সে যে আসন্ন এমন কোনো লক্ষণ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দেখা যায় না। পরিবর্তনের পক্ষে তর্ক, বিতর্ক, মত, রচনা কোথাও দেখা যায় না; বরং বেতার, সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমগুলোকে লক্ষ করলে মনে হবে কোনো পরিবর্তনই হবে না—আজ নয়, কোনো দিনই নয়। তবু পরিবর্তন হয়। সাধারণ মানুষ এগিয়ে যান সংস্কৃতিসেবীদের পেছনে ফেলে। তারপর ঘটনা ঘটে। ঘটার পরে সংস্কৃতিসেবীরা তৎপর হন, বলেন, ঘটবে যে আগেই তারা জানতেন এবং ঘটনার ব্যাখ্যা দেন নিজেদের মতো করে, ঘটনা পাছে আরও এগিয়ে যায়, গিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠিত সুযোগ-সুবিধাগুলোকে বিপর্যস্ত করে দেয় সেই আতঙ্কে ঘটনাকে ধরে রাখতে চান যেখানে ঘটেছে সেখানেই। তাদের প্রধান অভিলাষ থাকে নতুন পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করা, নিজেদের সুযোগ-সুবিধাগুলোকে আরও সুবিস্তৃত ও সুদৃঢ় করা।

সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোও প্রচার মাধ্যমই আসলে। সুবিধাভোগকারী শ্রেণির মানসিকতাকেই গোলামের মতো বিশ্বস্ততায় প্রচার করে তারা। এই শ্রেণির মানুষেরাও সমাজকে ভয় করেন, কেননা সমাজ মানুষের শত্রুপক্ষ, সে আশ্রয় দেয় না, সুযোগ পেলেই নিরাশ্রয় করে। বৈরী সমাজের হাত থেকে নিজেকে রক্ষার লক্ষ্যে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধি করার প্রাণপণ চেষ্টা চলতে থাকে অব্যাহত। অথচ সমাজ পরিবর্তন করলে, সমাজকে মানুষের মিত্রপক্ষ হিসেবে গড়ে তুললে, এক কথায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করলে যে ভয় দূর হতে পারে মানুষের, মানুষে মানুষে শত্রুতা দূর হতে পারে—এ সত্যটি প্রচার করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না এই শ্রেণি। বরং ভয় পান সব মানুষের সমান সুযোগ স্বীকৃত হলে সবাই গরিব হয়ে পড়বে, সীমিত সম্পদে বহু মানুষের ভাগাভাগিতে কারও ভাগে কিছু পড়বে না। কিন্তু সত্য বিপরীতপ্রান্তবর্তী। সত্য এই যে, সব মানুষের সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অগ্রগতি সাধিত হবে। দেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে আবদ্ধ উৎপাদন শক্তিকে মুক্ত করা। সমাজতন্ত্রকে ভয় করা হয় আরও একটি কল্পিত কারণে। সে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার ভীতি। অথচ প্রকৃত আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সমাজতান্ত্রিক সমাজেই সম্ভবপর। কেননা সেখানে মানুষ মানুষের শত্রু নয়, পরস্পর পরস্পরের মিত্র, একের স্বার্থ অন্যের স্বার্থের বিরোধী নয়, পরিপূরক। সমাজতন্ত্রভীতি সংস্কৃতির সব এলাকায়ই সুপ্রতিষ্ঠিত, প্রচারিত। সেই কারণে সাংস্কৃতিক উদ্যমসমূহ অবাধে প্রবাহিত এবং সূক্ষ্মভাবে জনবিরোধী, পরিবর্তনভীরু ও প্রতিক্রিয়াশীল।

যেমন ধরা যাক, শিক্ষার ক্ষেত্র। সংস্কৃতিতে শিক্ষার স্থান ও গুরুত্ব সর্বাধিক। প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিক্রিয়ার উৎফুল্ল প্রজননভূমি। শিক্ষা তারাই অধিক পায় যারা বিত্তবান। শিক্ষার মাধ্যমে তারা দক্ষতা অর্জন করে, নিজেদের শ্রেণিস্বার্থকে দৃঢ়তর করার জন্য। উচ্চশিক্ষার সুযোগ-সুবিধাভোগীদের জন্যই প্রশস্ত। নিম্নবিত্তরা আসে বটে, কিন্তু বড়লোকের ঘরে দরিদ্র ঘরজামাইয়ের মতো তারা দাসে পরিণত হয়, ব্যবস্থার দাস, ব্যবস্থার পরিবর্তন তারা চায়ও না, আনার শক্তিও রাখে না। শিক্ষা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করছে মানুষে মানুষে, স্বার্থসচেতনতার সৃষ্টি করছে। সৃষ্টি করছে কৃত্রিম আধুনিকতার।

সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলাতেও একই তৎপরতা। এমনিতেই এসব মাধ্যমের মধ্যে আলস্যের প্রশ্রয় থাকে, তদুপরি যখন এরা মাধ্যম হয় অলসশ্রেণির হাতে তখন তাদের পক্ষে সম্পূর্ণরূপে প্রতিক্রিয়াশীল না হয়ে উপায় থাকে না। সাহিত্যে, সংগীতে, চিত্রকলায় বিবেক, আবেগ ও ঐক্যের স্থান দেখি সংক্ষিপ্ত, কেননা এরা অল্প কজন মানুষের হাতে সৃষ্ট, অল্প কিছু মানুষের উপভোগের প্রয়োজনে। শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করার সুপ্ত অভিপ্রায় শিল্পীকে বিবেকবান হতে দেয় না, আবেগকে তিনি ভয় করেন, তিনি ঐক্য চান না সব মানুষের। এসব ক্ষেত্রে যে আধুনিকতা এসেছে, তা এদের উৎকেন্দ্রিক করছে, দেশের প্রবহমান জীবনধারা ও শুভবুদ্ধির সঙ্গে সংযুক্ত না করে। যেভাবে বন্ধু-বান্ধবরা একত্র হয়ে ফিল্ম ক্লাব গড়েন বিদেশি ফিল্ম দেখবেন বলে এবং প্রচার করেন নিজেদের সুখ সমগ্র দেশবাসীর সুখ বলে, সেভাবেই সংস্কৃতির চর্চা চলছে দেশে। নাটক হচ্ছে বলে হৈচৈ শোনা যায়, অথচ দেখা যায় অল্প কজন লোক দেখছেন নাটক, ঘুরে ঘুরে তারাই। তারা স্রষ্টা, তারাই দর্শক।

সামন্ততান্ত্রিক সনাতনপন্থা ও পুঁজিবাদী আধুনিকতার মধ্যে যে গোপন আঁতাত আছে, তা বোঝা যায় সমাজে মেয়েদের স্থান নিরূপণের ব্যাপারে উভয়ের ঐক্য দেখলে। পুঁজিবাদ নারীকে সর্বপ্রকার স্বাধীনতা দিয়েছে বলে আস্ফালন করে। অথচ ব্যাপার একই, উভয় ক্ষেত্রে। মেয়েদের জড়পিণ্ড বলে গণ্য করা হয় সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায়, দামি ও সচল পুতুল বলে গণ্য করা হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়। ওইটুকুই তফাত। কিন্তু উভয় ব্যবস্থাই অমানবিক। জড়পিণ্ড যেমন মানুষ নয়, সচল পুতুলও তেমনি মানুষ নয়। নারীমুক্তি এ দেশে ঘটেনি, নারীর অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে, গৃহাভ্যন্তর থেকে তাকে কোথাও কোথাও এনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে প্রদর্শনীর প্রাঙ্গণে।

মোট কথাটা এই যে, পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ—এ দুই শত্রুকে পরাস্ত করতে না পারলে সংস্কৃতির মুক্তি নেই। সংস্কৃতি শুধু ওপরকাঠামো নয়, এ ভেতরের ব্যাপারও বটে। মূল কাঠামোতে পরিবর্তনের জন্য আবশ্যক মানসিকতা সৃষ্টি করার কাজে। চেতনাকে উন্নততর স্তরে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব শুধু কিছু সংস্কৃতিসেবীদের নয়, সবারই। সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি ও পরিবর্তন ভিন্ন বৈপ্লবিক রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে না, এলেও টিকবে না। মনের জগৎটাকে অন্ধকারে রেখে সামাজিক জগতে বিদ্যুৎশক্তি আনতে পারব না আমরা। চেষ্টা করলে পশুশ্রম ঘটবে।

সংস্কৃতির গুরুত্ব এত বেশি বলেই তথাকথিত সংস্কৃতিসেবীদের হাতে একে ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক। সংস্কৃতিকে মুক্ত করার সমবেত দায়িত্ব সব প্রগতিশীল মানুষের।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বড় বিভ্রাটের কবলে ফেসবুক, কী ঘটেছিল সেই এক ঘণ্টায়

নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, যুবদল নেতাসহ গ্রেপ্তার ২

ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে ৬১

ফ্রান্স ও স্লোভাকিয়া সফরে গেলেন মোদি

শহরের মতো হয়ে গেছে গ্রাম, বদলে যাচ্ছে নগরের সংজ্ঞা

গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’র অগ্রণী ভূমিকা

সাবলেট বাসায় কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টা, গণপিটুনি দিল এলাকাবাসী

নেপালের রাষ্ট্রপতিকে আম উপহার পাঠাল বাংলাদেশ

মে মাসে সড়কে ঝরল ৬২২ প্রাণ : যাত্রী কল্যাণ সমিতি

এশিয়াওয়ান আশিয়ান সামিট / ‘গ্রেটেস্ট ব্র্যান্ড’ ল্যাবএইড ক্যানসার হাসপাতাল, ‘গ্রেটেস্ট লিডার’ সাকিফ শামীম

১০

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ১৫ জন পুশইন, প্রতিহত করল বিজিবি

১১

বিশ্ববাজারে আরও কমলো স্বর্ণের দাম

১২

শিল্পকলার সম্মাননায় আবেগাপ্লুত সৈয়দ আব্দুল হাদী

১৩

ভারতের এএন-৩২ বিমান বিধ্বস্ত

১৪

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত ৫০

১৫

বিশ্বকাপের মঞ্চ মাতানো সঞ্জয়ের অজানা তথ্য 

১৬

গাজীপুরে বহুতল ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৫ ইউনিট

১৭

চুক্তিতে ২৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছেন ট্রাম্প : ইরান

১৮

‘দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে কাজ করবে যুবদলের নতুন নেতৃত্ব’

১৯

বিশেষ সম্মাননা পাচ্ছেন প্রয়াত কারিনা কায়সার

২০
X