

ফিফা বিশ্বকাপের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে মাঠে বাংলাদেশের কোনো দল না থাকলেও উদ্বোধনী মঞ্চে উড়ল লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে পারফর্ম করলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজে ও মিউজিক প্রডিউসার সঞ্জয় দেব।
সঞ্জয় দেবের পারিবারিক শিকড় সুনামগঞ্জে। তিনি সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগর এলাকার বিশিষ্ট চিকিৎসক স্বর্গীয় ডা. ধীরেন্দ্র দেব চৌধুরীর নাতি। তার মা মিতা দেব সুনামগঞ্জের পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিবারের সন্তান এবং নিজেও সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই সঞ্জয়ের বেড়ে ওঠায় সংগীতের প্রভাব ছিল গভীর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সঞ্জয়ের এই অর্জন নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন সুনামগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রখ্যাত প্রচ্ছদ শিল্পী ও সাহিত্যিক ধ্রুব এষের একটি ছড়া উদ্ধৃত করে অনেকেই লিখেছেন— ‘মিতুর ছেলে সঞ্জয়, বাংলাদেশের বিশ্বজয়।’ কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও অভিনন্দনে ভাসাচ্ছেন সঞ্জয় ও তার পরিবারকে।
১৯৯১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে জন্মগ্রহণ করেন সঞ্জয় দেব। পরবর্তীতে পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ক্যালিফোর্নিয়ার সান জোসেতে বেড়ে ওঠা সঞ্জয় এভারগ্রিন ভ্যালি হাই স্কুল, ডি আনজা কলেজ এবং সান জোসে স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। ব্যবসায় শিক্ষা সম্পন্ন করলেও তার মূল আগ্রহ ছিল সংগীত ও সাউন্ড প্রোডাকশনে।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক ইলেকট্রনিক মিউজিক প্রডিউসার হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছেন। তার সঙ্গী ও নির্বাহী প্রযোজক কুণাল আগরওয়ালের সঙ্গে কাজ করে তিনি একাধিক জনপ্রিয় সংগীত প্রযোজনা করেছেন।
সঞ্জয়ের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘Shangri-La’, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মিউজিক চার্টে স্থান পেয়েছিল। ২০১৭ সালে আমেরিকান আইডলের শিল্পী এলিয়ট ইয়ামিনের সঙ্গে প্রকাশ করেন ‘Iewf (Obvi)’। ২০২১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড GOT7-এর সদস্য মার্ক টুয়ানের সঙ্গে প্রকাশ করেন ‘One in a Million’। এছাড়া ২০২২ সালে ভারতীয় সুপারস্টার গুরু রান্ধাওয়ার জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘Man of the Moon’-এর একাধিক গানের রচয়িতা ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন তিনি।
‘সির সির’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন বিশ্বকাপ উপলক্ষে সঞ্জয় দেবের পরিবেশিত অফিসিয়াল সংগীত ‘সির সির’ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলেছে। মরক্কোতে ধারণ করা গানটির ভিডিওচিত্র গত ৮ জুন ফিফার অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই কোটি কোটি দর্শক গানটি উপভোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ফুটবলপ্রেমীরা গানটির প্রশংসা করছেন।
নিজের শেকড়কে প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করার সুবাদে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন সঞ্জয় দেব। তিনি লিখেছেন, ‘একজন অভিবাসীর সন্তান হিসেবে নিজের ঘরের স্টুডিও থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে পৌঁছানো অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি। এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি সেই সব তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা দুই সংস্কৃতির মাঝে বেড়ে উঠেও নিজেদের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রাখে। আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আমার শেকড়কে প্রতিনিধিত্ব করছি।’
সঞ্জয়ের এই অর্জনে আবেগাপ্লুত সুনামগঞ্জের সাবেক পিপি খায়রুল কবির রুমেন বলেন, মিতা দেব আমাদের কলেজ জীবনের সহপাঠী ছিলেন। তার ছেলে সঞ্জয় বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবে—এটি শুধু পরিবারের নয়, পুরো সুনামগঞ্জের গর্ব। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলছে না, কিন্তু বাংলাদেশের একজন সন্তান বিশ্বমঞ্চে পারফর্ম করছে, এটিও কম গৌরবের নয়।
জানা গেছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে সঞ্জয় বিশেষভাবে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মোটিফ ব্যবহার করে কয়েক হাজার জ্যাকেট প্রস্তুত করেছেন, যা তার দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।