

ঈদুল ফিতরের আগে কমপক্ষে ১৮০টি তৈরি পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-বোনাস না হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে খোদ সরকারি প্রতিবেদনে। যথাসময়ে বেতন-বোনাস না হলে এসব কারখানার ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯২ জন শ্রমিকের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিতে পারে; নামতে পারে রাস্তায়। তারা সড়ক অবরোধ করলে ঘরমুখো যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়বেন। এ ছাড়া কোনো একটি কারখানায় অসন্তোষ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা আশপাশের কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য করেন। ফলে দ্রুত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশের আইজিকে দেওয়া বিশেষ প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ প্রতিবেদনে যেসব ব্যক্তি ও সংগঠন বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনসহ বাম ঘরানার শ্রমিক নেতারা পোশাক শ্রমিকদের উসকানি দিতে পারেন; তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ঈদের বেতন-বোনাস দিতে যেসব প্রতিষ্ঠান অসমর্থ্য, তাদের সরকারের যে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্প সময়ের জন্য ঈদুল ফিতরের বেতন ও বোনাস পরিশোধের শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল ফিতর সামনে রেখে কলকারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য ‘১২ মার্চ’ সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। গত ৩ মার্চ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৪তম সভা এবং তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (আরএমজি বিষয়ক টিসিসি) ২৩তম সভা থেকে ওই সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। সরকারের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে। শিল্প পুলিশের হিসাবে গতকাল পর্যন্ত মাত্র ২২ শতাংশ শিল্প কারখানায় বেতন-বোনাস হয়েছে। তবে শ্রমিকরা যে মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন দাবি করেছেন, সেটার কোনো সুরাহা হয়নি।
বিশেষ প্রতিবেদনে যেসব মালিক কর্তৃপক্ষের ঈদে বেতন-বোনাস দিতে অসামর্থ্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মতাদর্শগত অবস্থান পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, নির্দলীয় মালিকের গার্মেন্টের সংখ্যাই বেশি। তবে ১৯ শতাংশ তৈরি পোশাক কারখানার মালিক আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা অনেকে পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারবে না। এটা নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এদিকে নিবন্ধনহীন অনেক কারখানা মালিক বেতন-বোনাস পরিশোধ না করে কারখানা বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে শ্রমিকরা বকেয়া পাওনা আদায়ের দাবিতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও রাস্তা অবরোধসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারেন। ঈদের আগে বেতন-বোনাসের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, সচিবালয়, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, শ্রমভবন ও শহীদ মিনার এলাকায় সমাবেশ করতে পারেন শ্রমিকরা। এতে ওইসব এলাকায় ব্যাপক যানজট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকার নিরাপত্তাও জোরদার করতে বলা হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।
আরও কিছু সুপারিশ: প্রতিবেদনে সরকারের কাছে আরও যেসব সুপারিশ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধে অসামর্থ্য হওয়ার আশঙ্কায় থাকা গার্মেন্টগুলোকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় (মালিক, শ্রমিক ও সরকার) আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা; কারখানাগুলোর শ্রমিকদের নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি বোনাস এবং মার্চ মাসের অগ্রিম বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া; বেতন-বোনাস পরিশোধকে কেন্দ্র করে শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টির সুযোগে শ্রমিক সংগঠনের কিছু নেতা এবং স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের উসকানি দিয়ে কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, রাস্তা অবরোধসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া; সাব-কন্ট্রাক কিংবা ছোট ছোট কারখানার মালিকরা বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে পালিয়ে যেতে না পারেন, সে ব্যাপারে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা; কোনো কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিলে পার্শ্ববর্তী কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা; শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আগেই ঈদ প্রস্তুতি কমিটির মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া; শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া; সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট কারখানার শ্রমিক, মালিক, বিজিএমইএ বা বিকেএমইএর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা; পোশাক খাতের সক্রিয় সন্দেহভাজন বিদেশি সংস্থা ও এনজিওগুলোর কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বিশেষ টিমের মাধ্যমে গার্মেন্টস সেক্টরে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের গঠিত কন্ট্রোল রুমকে সার্বক্ষণিক সতর্ক অবস্থায় রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সব শিল্পাঞ্চলের ব্যাংকের শাখাগুলো ঈদের কাছাকাছি সময় পর্যন্ত খোলা রাখা, যাতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পারে।
পাঁচ স্থানে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ: এদিকে বেতন-বোনাসের দাবিতে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা ময়মনসিংহের ভালুকা ও ত্রিশাল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, কুমিল্লার চান্দিনা ও রাজধানীর মিরপুরে বুধবার এবং গতকাল বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন। এ সময় বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ভালুকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের সরিয়ে দেন। আগামী সোম ও মঙ্গলবার বিক্ষোভের মাত্রা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এবারের সংকটকে ভয়াবহ উল্লেখ করে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের প্রশিক্ষণ সম্পাদক শ্রমিক নেতা মমিনুর রহমান মমিন কালবেলাকে বলেন, প্রতি বছর ঈদ এলেই কিছু শ্রমিককে রাস্তায় নামতে বাধ্য করা হয়। তারা বেতন-বোনাসের জন্য আন্দোলন করেন। এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। মালিকরা সারা বছর ব্যবসা করেন। ঈদ এলে শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে টালবাহানা করেন। অনেকে সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা বা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ শ্রমিকরা সারা বছর ঈদের ছুটির অপেক্ষায় থাকেন। প্রিয়জনের কাছে ছুটে যান। এই সময় তাদের জিস্মি করা, বেতন-ভাতা না দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সাড়ে তিনশর মতো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। মালিকরা পলাতক বা আত্মগোপনে। এসব কারখানার একটা ইস্যু আছে। তার ওপর যদি ঈদের আগে কারখানাগুলো বেতন-ভাতা না দেয়; পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। আমরা চাই প্রত্যেক শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা বুঝে পাক। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এটাই প্রত্যাশা।
জানতে চাইলে শিল্প পুলিশের গাজীপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন কালবেলাকে জানান, সরকারের তরফ থেকে গতকালের মধ্যে বেতন-বোনাস পরিশোধের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে মাত্র ২২ শতাংশ কারখানায় শ্রমিকদের বেতন-বোনাস দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। আশা করা হচ্ছে, রবি ও সোমবার অধিকাংশ কারখানা বেতন-বোনাস পরিশোধ করবে।
তৈরি পোশাকসহ যে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক অসন্তোষ রোধে শিল্প পুলিশ সক্রিয় রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও মালিকপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পুলিশ কাজ করছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ প্রধান ও অ্যাডিশনাল আইজিপি গাজী জসীম উদ্দীন কালবেলাকে বলেন, শিল্পকারখানায় কিছুটা অস্থিরতার আশঙ্কা থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকার, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ চেষ্টা করছে যাতে শ্রমিকরা সময়মতো বেতন-ভাতা পেয়ে যান। এরই মধ্যে প্রায় অর্ধেক কারখানায় বেতন হয়ে গেছে। সরকারি প্রণোদনার অর্থ ছাড় জটিলতায় কিছু কারখানায় এখনো বেতন-বোনাস হয়নি। আশা করছি, আগামী রবি-সোমবারের মধ্যে সেগুলোতে বেতন-বোনাস হয়ে যাবে। মঙ্গল-বুধবার নাগাদ কিছু কারখানায় অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। পুলিশ সে বিষয়ে সতর্ক আছে।