

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ থেমেছে, তবে নীরব ক্ষোভের ভেতরেও শোনা যাচ্ছে গর্জন। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর যুদ্ধবিরতি যেন এক ক্ষণস্থায়ী বিরতি! যেখানে বারুদের ধোঁয়া এখনো আকাশ ছুঁয়ে আছে আর মাটিতে জমে আছে এক অনিশ্চয়তার ছায়া। কাগজে লেখা শান্তির এ চুক্তি বাস্তবে কতটা শান্তি আনবে, কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্নের যেন শেষ নেই। কারণ বন্দুক থামলেও অবিশ্বাসের যুদ্ধ এখনো চলছে। হরমুজ প্রণালির জলরাশিতে যেমন ঢেউ থামে না, তেমনি থামেনি উত্তেজনাও। লেবাননের আকাশে ঘন ঘন বিস্ফোরণের আলো, উপসাগরের পানিতে আটকে থাকা জাহাজ আর কূটনীতির টেবিলে অদৃশ্য টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে এ যুদ্ধবিরতি এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের গল্পের কথা বলছে। যেন শান্তির আবরণে মোড়ানো এক অস্থির ভবিষ্যৎ। এই মুহূর্তে বিশ্ব তাকিয়ে আছে—এই যুদ্ধবিরতি কি সত্যিই শান্তির শুরু, নাকি আরও বড় সংঘাতের আগে একটি বিরতি মাত্র? পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর আঞ্চলিক প্রভাব—প্রতিটি অমীমাংসিত প্রশ্ন যেন আগুনের মতো জ্বলছে। আপাতত যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু গল্প শেষ হয়নি। বরং শুরু হয়েছে নতুন এক অধ্যায়, যেখানে প্রতিটি উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
বিশ্ববাসী যখন স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রত্যাশায় আছে, তখন এ সংকটের সমাধানের পথের পাঁচ কাঁটা নিয়ে বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হঠাৎ করে দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু এরপর কী হবে, তা নিয়ে এখনো অনেক বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইসরায়েলও এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, তবে বলা হচ্ছে তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেই এতে রাজি হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান—দুপক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করছে। কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলা এখনই সম্ভব নয়। কারণ এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চলতে দেখা গেছে। বুধবার কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ইরানের হামলার অভিযোগ করেছে, আর ইসরায়েল লেবাননে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, শুক্রবার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনা আলোচনার জন্য একটি ‘কার্যকর ভিত্তি’ হতে পারে। তবে এ পরিকল্পনায় ঠিক কী রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
ইরান বিভিন্ন সময়ে তাদের ১০ দফা পরিকল্পনার একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করেছে। এসব পরিকল্পনায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র গত মাসে ১৫ দফা একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল, যার সঙ্গে ইরানের প্রস্তাবের মিলও খুব কম। ট্রাম্প আবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি এমন কিছু শর্ত নিয়ে আলোচনা করছেন যা প্রকাশ্যে থাকা ইরানের পরিকল্পনা থেকে ভিন্ন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য কিছু নির্দিষ্ট শর্ত আছে, যা গোপনে আলোচনায় তোলা হবে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লিভিট বলেন, ইরানের প্রথম ১০ দফা পরিকল্পনাকে ‘গুরুত্বহীন’ মনে করে ট্রাম্প তা বাতিল করে দেন। পরে ইরান একটি নতুন ও সংক্ষিপ্ত পরিকল্পনা দেয়, যা আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তবে সেই নতুন পরিকল্পনায় কী আছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে পাঁচটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা চলতে থাকলে এই যুদ্ধবিরতি টিকবে কি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলছে, লেবানন এ যুদ্ধবিরতির অংশ নয়। কিন্তু ইরান ও পাকিস্তান বলছে, এটি এর অন্তর্ভুক্ত। এই বিভ্রান্তি যুদ্ধবিরতিকে ভেঙে দিতে পারে। ট্রাম্প লেবাননের সংঘর্ষকে ‘পৃথক ঘটনা’ হিসেবে দেখাতে চাইলেও বাস্তবে এটি ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। ইরানের পরিকল্পনায় সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে।
ইরান সতর্ক করেছে—যদি লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ না হয়, তাহলে তারা আলোচনা থেকে সরে আসতে পারে এবং হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইরানকে ওই প্রণালি খুলে দিতে হবে— এটাই যুদ্ধবিরতির শর্ত। লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ নতুন দফায় শুরু হয়েছে মার্চে। হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালালে, ইসরায়েল পাল্টা হামলা শুরু করে। যদিও হিজবুল্লাহ সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ করেছে, ইসরায়েল থামার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিমান হামলা চালায় বুধবার, মাত্র ১০ মিনিটে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি কে নিয়ন্ত্রণ করবে এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান এটি নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র চায় এটি ফের খুলে দেওয়া হোক। কিন্তু ইরানের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, তারা এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায়। এমনকি তারা জাহাজ চলাচলের জন্য টোল (ফি) নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যৌথভাবে এই প্রণালি পরিচালনা করতে পারে। তবে এটি কীভাবে সম্ভব হবে, তা পরিষ্কার নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো টোল নেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কী হবে
ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখাই তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি দাবি করেছেন, এই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ইরানের কাছে এখনো উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে, যার হিসাব পরিষ্কার নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ এই ইউরেনিয়াম ইরানের কাছে থাকবে, ততক্ষণ তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা ধরে রাখবে।
ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কাজ করে এই ইউরেনিয়াম সরিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এটি বাস্তবসম্মত নয় এবং ইরান এতে রাজি হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। কিন্তু ইরান বলছে, এটি তাদের অধিকার।
ইরান কি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বজায় রাখবে
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ধ্বংস করা। কিছুটা ক্ষতি হলেও ইরান এখনো এই সক্ষমতা ধরে রেখেছে। বুধবারও ইরান বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে, যা প্রমাণ করে তাদের সামরিক ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাদের ড্রোনও এখনো বড় হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে
ইরান চায়, সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। কিন্তু এটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি আলোচনায় থাকবে। আগে যুক্তরাষ্ট্র কিছু শর্তের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল, বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। কিন্তু এখন ইরান কঠোর অবস্থানে আছে এবং আগের অভিজ্ঞতার কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি বিশ্বাস করছে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, এই যুদ্ধবিরতি খুবই নাজুক। সামনে অনেক জটিল প্রশ্ন রয়েছে, যার সমাধান না হলে এই শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া কঠিন হবে।