এম এম মাহবুব হাসান
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
নম্রতার ফাঁদ

যখন ভদ্রতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা

এম এম মাহবুব হাসান
এম এম মাহবুব হাসান

একটি কোম্পানির বোর্ডরুম। টেবিলের এপাশে সিইও, ওপাশে দলের সেরা কর্মকর্তারা। একটি প্রকল্প ব্যর্থতার দ্বারপ্রান্তে। সবাই জানেন কোথায় সমস্যা, কে দায়ী। কিন্তু কেউ মুখ খুলছেন না। সভাকক্ষে শুধু নীরবতা। সেই সৌজন্যের নীরবতাই সেদিন সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হয়ে উঠল।

দৃশ্যটি অপরিচিত নয়। বাংলাদেশের অফিসে, পরিবারে, বন্ধুমহলে—সর্বত্র আমরা এমন এক সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে উঠি; যেখানে সত্য বলাকে অভদ্রতা আর চুপ থাকাকে ভদ্রতা বলে শেখানো হয়। ‘বড়দের মুখে মুখ দিতে নেই’, ‘একটু সহ্য করো’, ‘কিছু বলতে নেই’—এই বাক্যগুলো শৈশব থেকেই আমাদের ভেতরে গড়ে তোলে এক নিরীহ, অনুগত সত্তা। কিন্তু প্রশ্ন একটাই—এই আনুগত্যতাই কি আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা নয়?

ভদ্রতার আড়ালে আসলে থাকে ভয়

আমরা প্রায়ই নম্রতা আর ভয়কে গুলিয়ে ফেলি। যাকে আমরা ‘ভদ্রতা’ বলি, তার বড় একটা অংশ আসলে ভয়— প্রত্যাখ্যানের ভয়, সম্পর্ক নষ্টের ভয়, ‘খারাপ মানুষ’ তকমা পাওয়ার ভয়। একজন তরুণ কর্মকর্তা জানেন বসের সিদ্ধান্তটি ভুল, তবু মুখ খোলেন না। একজন উদ্যোক্তা বোঝেন অংশীদারিত্বটি টেকসই নয়, তবু আপত্তি জানান না। একজন সন্তান উপলব্ধি করেন পারিবারিক সিদ্ধান্তটি তার স্বপ্নকে গলা টিপে ধরছে, তবু মেনে নেন।

এই অতিরিক্ত বিনয়ের সংস্কৃতিকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘নম্রতার অত্যাচার’ বা Tyranny of Niceness। কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী ইভলিন সামার্স তার একই নামের বইয়ে দেখিয়েছেন, ‘সর্বদা ভালো ও ভদ্র থাকার’ সামাজিক চাপ কীভাবে মানুষের সত্যিকারের অনুভূতি, সততা ও ব্যক্তিত্বকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে। যেখানে সত্য বলার চেয়ে বিনয়ী থাকাটাকেই বড় মনে করা হয়, সেখানে কার্যকর আলোচনা থেমে যায়, সংগঠন পিছিয়ে পড়ে।

হার্ভার্ড যা বলছে

বিষয়টি কেবল আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, গবেষণাও একই কথা বলছে। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক অ্যামি সি. এডমন্ডসন দশকের পর দশক ধরে কর্মক্ষেত্রের এই নীরবতার মূল্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক বেদনার্ত সত্য। নতুন কর্মীরা প্রথম দিকে উৎসাহ নিয়ে যোগ দেন, কিন্তু ধীরে ধীরে টের পান তাদের প্রশ্ন ও পরামর্শ সত্যিকার অর্থে স্বাগত পায় না। তখন তারা মাথা নিচু রেখে নিজের মতামত চেপে যান। এই চুপ করে যাওয়া দলের শেখার ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা—দুটোকেই ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়।

হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর ২০২৫ সালের মে-জুন সংখ্যায় এডমন্ডসন ও তার সহকর্মীরা স্পষ্ট করে বলেছেন, মনোগত নিরাপত্তা মানে নিছক ‘ভালো পরিবেশে থাকা’ নয়। এটি হলো এমন একটি কর্মপরিবেশ যেখানে মানুষ অকপটে কথা বলতে পারেন, প্রশ্ন করতে পারেন এবং ভুল স্বীকার করতে পারেন—লজ্জা বা প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই। চুপ থাকা আর নম্র থাকা তাই এক জিনিস নয়। সত্যিকারের সম্মান সেখানেই থাকে, যেখানে সত্য বলার সুযোগ ও সাহস—দুটোই বিদ্যমান।

সংখ্যার ভাষায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য

২০২৪ সালে পরিচালিত Turas Leadership Consulting-এর এক বৈশ্বিক জরিপের তথ্য রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। ৯০ শতাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা চান তাদের দল আরও বেশি গঠনমূলক মতামত দিক—কিন্তু একই সঙ্গে ৬৩ শতাংশ নেতা নিজেরাই সেই মতামত চাইতে সংকোচ বোধ করেন, পাছে দুর্বল ভাবা হয়।

লিঙ্গভেদে এই ব্যবধান আরও চমকপ্রদ—পুরুষ নেতাদের ৭১ শতাংশ এই ভয়ে ভোগেন, নারী নেতাদের ক্ষেত্রে যা মাত্র ৪৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান কেবল নেতৃত্বের দুর্বলতা নয়, আমাদের সমাজে ‘শক্তিশালী পুরুষ’ সম্পর্কে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণারও আয়না—যেখানে সাহায্য চাওয়া বা মতামত নেওয়াকে দুর্বলতার চিহ্ন ভাবা হয়, অথচ বাস্তবে এটিই প্রকৃত নেতৃত্বের লক্ষণ।

কর্মীদের চিত্রটাও সমান হতাশাজনক। তরুণ প্রজন্মের ৬৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রে নিজের মত প্রকাশে আত্মবিশ্বাস পান না। একুশ হাজার কর্মীর ওপর পরিচালিত আরেকটি জরিপে মাত্র ২৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের নেতা সত্যিকার অর্থে পরামর্শ ও নতুন উদ্যোগকে উৎসাহিত করেন। সংখ্যাগুলো মিলিয়ে একটাই গল্প দাঁড়ায়—নেতারা সত্য শুনতে চান, কিন্তু সত্য বলার মতো পরিবেশ তৈরি করেন না।

একজন নেতার বদলে যাওয়ার গল্প

আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠানের সিইও এক সময় লক্ষ করলেন, দলের সবাই হাসিমুখে সম্মতি দিচ্ছেন, কিন্তু ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। সভাগুলো ‘সবকিছু ঠিকঠাক’ বলে শেষ হয়, অথচ প্রকল্পগুলো বারবার হোঁচট খায়।

ধীরে ধীরে তিনি বুঝলেন, এটি ভয় থেকে জন্ম নেওয়া একটি মিথ্যা ভদ্রতার সংস্কৃতি—যেখানে মানুষ প্রকৃত মতামত না দিয়ে কেবল সামাজিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ‘হ্যাঁ’ বলে চলেছেন।

এই উপলব্ধি তাকে নাড়িয়ে দিল। তিনি নিজেই প্রথম পদক্ষেপ নিলেন—সভায় নিজের ভুল স্বীকার করলেন, দলকে সরাসরি প্রশ্ন করতে আমন্ত্রণ জানালেন এবং যে কর্মী ভিন্নমত দিলেন, তাঁকে পুরস্কৃত করলেন। ধীরে ধীরে পুরো সংগঠনটি বদলে গেল।

‘না’ বলার মধ্যেই আছে শক্তি

আমাদের সমাজে ‘না’ বলাকে এখনো অভদ্রতার চিহ্ন মনে করা হয়। অথচ ‘না’ বলার সক্ষমতাই মানুষকে দায়িত্বশীল করে তোলে। যিনি ‘না’ বলতে পারেন না, তার ‘হ্যাঁ’র কোনো মূল্য নেই।

যে পেশাদার সব কাজে ‘হ্যাঁ’ বলেন, তিনি কোনো কাজেই পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন না। যে পরিবারে কাউকে কখনো ‘না’ শুনতে হয় না, সেখানকার সন্তান বাস্তব জগতের জন্য তৈরি হয় না। যে দলে নেতাকে কখনো চ্যালেঞ্জ করা হয় না, সে দল কখনো উদ্ভাবনী হতে পারে না। নেতৃত্বে এই ‘রাজনৈতিক ভদ্রতা’র সমস্যার মূলে রয়েছে পরিস্থিতির চেয়ে ব্যক্তির অনুভূতিকে বড় করে দেখার প্রবণতা। সমাধান হলো উল্টো পথে হাঁটা—আগে ইস্যু, পরিস্থিতি ও আচরণ, তারপর ব্যক্তি। সত্যি কথা হলো, আমাদের বাস্তবতা এখনো অন্য পথে হাঁটছে।

সাহসী কথা বলা মানে রূঢ় হওয়া নয়

সত্য কথা বলা আর কঠোর হওয়া এক জিনিস নয়, এ দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। সাহসী কথা বলা যায় উষ্ণতার সঙ্গে, শ্রদ্ধার সঙ্গে এবং সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে। কয়েকটি ছোট অভ্যাস এই পথ সহজ করতে পারে।

প্রথমত, নিজের সঙ্গে সৎ থাকুন। কী চান, কী চান না—আগে নিজে বুঝুন। যিনি নিজের সঙ্গে সৎ নন, তিনি অন্যের সঙ্গে সৎ হতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, কথাকে আক্রমণ নয়, তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করুন। ‘তুমি ভুল করেছ’ নয়, বলুন ‘এই সিদ্ধান্তে এই সমস্যা হতে পারে’—পার্থক্যটুকু বিশাল।

তৃতীয়ত, সঠিক সময় ও পরিসর বেছে নিন। প্রকাশ্যে সমালোচনা নয়, একান্তে কথা বলুন—যেখানে মানুষটি নিজেকে রক্ষার বদলে সত্যিই শুনতে পারবেন।

চতুর্থত, শুনতে শিখুন। সাহসী যোগাযোগ কেবল বলার মধ্যে নয়, শোনার মধ্যেও। যিনি অন্যের কঠিন কথা শুনতে পারেন, তিনিই সত্যিকারের শক্তিশালী।

পরিবর্তন শুরু হোক আজ থেকেই

হার্ভার্ডের গবেষকেরা সাতাশ হাজারের বেশি কর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যারা নিজেদের মতামত নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারেন, তারা সংকটের সময়েও বেশি স্থিতিস্থাপক এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন।

এই সত্য কেবল কর্মক্ষেত্রের জন্য নয়। পরিবারে, বন্ধুত্বে, সমাজে—প্রতিটি সম্পর্কের গভীরতা নির্ভর করে সত্য বলার সাহসের ওপর।

আজ হয়তো একটি কথা আটকে আছে আপনার ভেতরে। একটি কথোপকথন দরকার, যেটি মাসের পর মাস এড়িয়ে যাচ্ছেন। হয়তো একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপনার মত আছে, কিন্তু বলছেন না।

মনে রাখবেন—যে কথাটি বলছেন না, সেটিই আসলে সবচেয়ে জরুরি। সেই নীরবতার একটি মূল্য আছে, এবং সেই মূল্য আপনিই চুকাচ্ছেন। ভদ্রতা একটি গুণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু ভদ্রতার আড়ালে সত্য লুকিয়ে রাখা আর নম্রতা নয়—সেটি ভীরুতা। আর ভীরুতা কাউকে কখনো বড় করেনি। আজই শুরু করুন। একটি ছোট সত্য কথা দিয়ে। দেখবেন পৃথিবীটা বদলে যায়নি—শুধু আপনি একটু বড় হয়েছেন।

লেখক: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইবোলার কারণে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানাল উগান্ডা

ফসল গেল পানিতে, শেষ সম্বল নৌকাও চুরি

বাজেটকে সর্বোচ্চ অন্তর্ভুক্তিমূলক করার চেষ্টা করেছি : অর্থমন্ত্রী

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছে ব্রাজিল, কখন-কীভাবে দেখবেন

জলবায়ু মোকাবিলায় বনায়নের বিকল্প নেই : শামীম

আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তি  

প্রকাশ্যে নারীকে পেটালেন যুবদল নেতা

‘নতুনরা আগামীতে সাহিত্যাঙ্গণে নেতৃত্ব দিতে পারে সে চেষ্টাই অব্যাহত থাকবে’

প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষার ফল কবে, জানাল অধিদপ্তর

বাজেটের আকার বড় হলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব নয় : এফবিসিসিআই

১০

নম্রতার ফাঁদ / যখন ভদ্রতাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বাধা

১১

পাবিপ্রবিতে কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার স্মরণে সেমিনার অনুষ্ঠিত

১২

সদরঘাটে লঞ্চ দুর্ঘটনা  / নিহত সেই পরিবারের হাতে ৫ লাখ টাকা তুলে দিলেন নৌপ্রতিমন্ত্রী

১৩

‘মদ-সিগারেটের দাম বাড়ানোর পরও বিরোধীদলের এই বাজেট পছন্দ নয়’

১৪

কাপ্তাই সড়কে ৩ ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক

১৫

ভারতের নতুন সেনাপ্রধান হতে যাচ্ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ধীরাজ শেঠ 

১৬

চট্টগ্রাম থেকে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর

১৭

কোচিং শেষে বাড়ি ফিরছিলেন শিক্ষার্থী, পথেই মৃত্যু

১৮

বাংলাদেশিদের ব্রাজিল উন্মাদনার খবর এবার ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমে

১৯

বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে বৃক্ষরোপণকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে: ডিসি ফরিদা

২০
X