

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্রান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। সংগঠনটি বলেছে, বাজেটের আকার বড় হলেও এটি বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়; তবে এর জন্য প্রয়োজন দূরদর্শিতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকি।
শুক্রবার (১২ জুন) প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দেওয়া এক পর্যবেক্ষণে এফবিসিসিআই এ মন্তব্য করে। সংগঠনটি বাজেট ঘোষণার জন্য অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।
এফবিসিসিআই জানায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ‘৩ আর কৌশল’—‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন (পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা), রিস্টোরেশন (পুনর্গঠন), এবং রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন (ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধি)’ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আগামী অর্থবছরের জন্য ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট গত অর্থবছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বর্তমান বৈশ্বিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে এ বাজেটের আকার বাস্তবসম্মত। তবে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে।
সংগঠনটি উল্লেখ করে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাজেট ঘাটতি প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই বলেছে, ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপ কমিয়ে সুলভ সুদে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থায়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
কর ব্যবস্থার ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করাকে ইতিবাচক উল্লেখ করলেও সর্বোচ্চ করহার ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে এফবিসিসিআই। একই সঙ্গে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো এবং বিক্রয়ের ওপর ন্যূনতম কর ১ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি।
এছাড়া শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর হ্রাস, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে উৎসে কর কমানো, খেজুর ও রান্নার মসলা আমদানিতে রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার, স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের জন্য টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ নির্ধারণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপকে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে অভিহিত করেছে এফবিসিসিআই।
এফবিসিসিআই মনে করে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনটি।