

প্রিয়জন হারানোর বেদনা কখনো মুছে যায় না। সময়ের সঙ্গে ক্ষত কিছুটা শুকালেও স্মৃতি আর শূন্যতা থেকে যায় আজীবন। ময়মনসিংহের আলোচিত দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর কেটে গেছে ছয় মাস। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কাছে মনে হয়, ঘটনাটি যেন ঘটেছে সেদিনই। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন গভীর শোক, অনিশ্চয়তা এবং বিচার পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা। নিহত দিপু চন্দ্র দাস জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে।
গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকার জামিরদিয়া এলাকার একটি পোশাক কারখানায় ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে (২৮) পিটিয়ে ও আগুন ধরিয়ে হত্যা করে কিছু লোক। এ ঘটনায় ১৯ ডিসেম্বর নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে ভালুকা থানায় একটি মামলা করেন। ওই মামলায় এরই মধ্যে ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সংকটে পরিবার, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: দিপু নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। পরিবারের সদস্যরা এখনো শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরতে চেষ্টা করলেও প্রতিটি মুহূর্তে তারা অনুভব করেন প্রিয় মানুষটির অনুপস্থিতি। শুরুতে বিভিন্ন মহল থেকে খোঁজখবর নেওয়া হলেও সময়ের সঙ্গে তা অনেকটাই কমে গেছে।
দিপুর মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে পরিবারের আর্থিক অবস্থায়। দৈনন্দিন ব্যয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আগে সংসারের পুরো দায়িত্ব দিপু বহন করতেন। তার অনুপস্থিতিতে আয়ের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সহায়তা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে সংসার চালানো নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে কিছুটা হতাশা থাকলেও মামলার অগ্রগতি নিয়ে তারা আশাবাদী হতে চান। তবে একই সঙ্গে দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পরিবারের দাবি, এরই মধ্যে যেসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মামলার সব আসামিকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। বিশেষ করে পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
নিহত দিপু চন্দ্র দাসের স্ত্রী মেঘনা রানী এখন ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বামীকে হারানোর পর তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। একদিকে মানসিক শোক, অন্যদিকে সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব—সবকিছু একাই সামলাতে হচ্ছে তাকে।
মেঘনা রানী বলেন, ‘এ কঠিন সময়েও আমার শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের সবাই আমার এবং আমার মেয়ের পাশে রয়েছেন। তাদের ভালোবাসা ও সহযোগিতাই এখন আমাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি।’ একই সঙ্গে স্বামীর হত্যার সুষ্ঠু বিচারও তার প্রধান দাবি।
দিপুর মা এখনো সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, ‘ঘরের প্রতিটি কোণে ছেলের স্মৃতি রয়েছে। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখলেই বুক ভেঙে কান্না আসে। আমার ছেলেটা আর কোনোদিন আমাদের কাছে ফিরে আসবে না। তাকে নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত আশা ছিল। কিন্তু আজ সেই সব স্বপ্ন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন মা হিসেবে আমার এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি শুধু মৃত্যুর আগে আমার সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই।’
দিপুর বাবা রবি চন্দ্র দাস বলেন, ‘সন্তান হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তার চেয়েও বড় উদ্বেগ হলো পরিবারের ভবিষ্যৎ। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারীকে হারিয়ে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। দিপুর মৃত্যুর পর পরিবারের নির্ভরযোগ্য আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে দিপুর স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সবাই একসঙ্গেই বসবাস করছি।’
মামলার অগ্রগতি: তদন্ত সূত্রে যা জানা গেছে, মামলার অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে সিসিটিভি ফুটেজ এবং জব্দকৃত বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। এ ছাড়া শনাক্ত হওয়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নাম-ঠিকানা যাচাই-বাছাই এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ পর্যন্ত মামলায় ২৯ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৯ আসামির বিভিন্ন সময় রিমান্ড মঞ্জুর করে এর মধ্যে ১২ জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এ মামলার তিনজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. তোয়াবুল ইসলাম খান বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজ, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জব্দকৃত আলামতের ভিত্তিতে আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জব্দকৃত আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তদন্তে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত আছে। তদন্তের অবশিষ্ট কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে শিগগির আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।’
তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত মামলার ২৯ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সবাই বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে দুজন আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও পরবর্তী সময়ে সেই জামিন বাতিল হওয়ায় তারাও বর্তমানে কারাগারে আছেন।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘দিপু হত্যা মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মামলার অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান এবং গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি জানান, মামলাটিতে কোনো এজাহারনামীয় আসামি নেই। এজাহারে ১৪০ থেকে ১৫০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এরই মধ্যে গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, এ মামলার ছায়াতদন্ত, আসামি শনাক্তকরণ এবং গ্রেপ্তার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালনা করছে জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) একটি বিশেষ আভিযানিক দল।
ময়মনসিংহ জেলা জজকোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আনোয়ার আজিজ টুটুল বলেন, ‘দিপু হত্যা মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ময়মনসিংহের কোনো আদালত থেকে এ মামলার কোনো আসামি জামিন পাননি। আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি, যেন কোনো আসামি আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে মুক্তি না পান। উচ্চ আদালত থেকে দুজন আসামি একপর্যায়ে জামিন লাভ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই জামিন বাতিল করা হয়েছে।’
জেলা হিন্দু মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক ডা. এনসি পাল বলেন, কোনো সুস্থ মানুষ এ হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড দেখে ঠিক থাকতে পারবে না। একটি মানুষকে হত্যা করে লাশ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা মেনে নেওয়ার মতো নয়। এ ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ আমরা মানতে পারছি না। আমরা আমাদের প্রিয় মানুষটিকে আর ফিরে পাব না; কিন্তু তার হত্যার বিচার হলে অন্তত মনে হবে রাষ্ট্র আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।