

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আগামী ডিসেম্বরের দিকে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির রায় মাথায় নিয়ে তার এই ‘স্বেচ্ছায় ফেরার’ এবং ‘গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর আশঙ্কার মুখোমুখি হওয়ার’ প্রকাশ্য প্রত্যয় ঢাকার রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাক্ষাৎকারটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে আশ্রিত থাকার দীর্ঘ দুই বছর পর, এই প্রথম তিনি কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সরাসরি নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কথা বললেন।
শেখ হাসিনার এ সাক্ষাৎকার একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের অবদমিত নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার, রাজনৈতিক দল ও বিশ্লেষকদের মাঝে আইনি ও কৌশলগত নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাসন থেকে দেশের মাটিতে ফেরার এ ‘হাই-ভোল্টেজ’ ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে—তা নিয়েই এখন আলোচনা।
বিএনপিসহ অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতারা বলছেন, অবশেষে শেখ হাসিনার বোধোদয় হয়েছে। তবে তিনি আদৌ বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় ফিরবেন কি না তা বিশ্বাস করার মতো কোনো লক্ষণ নেই। ফলে সেটি ফাঁকা আওয়াজও হতে পারে। আর দেশে ফিরলে তো জুলাই যোদ্ধারা বসে থাকবে না। আইন তার নিজের গতিতে চলবে বলে রাজনীতিকরা মনে করেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। তবে তার সেই সৎসাহস আছে বলে মনে করি না। তার ভাষ্য, শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে রেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগ সংগঠনের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবেননি। তিনি আরও বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য মুলত ‘ফাঁকা আওয়াজ’। আওয়াজ দিয়ে দেখছেন দেশে কী হয়? নেতাকর্মীরা আবারও তার জন্য মাঠে নামছেন কি না? তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি সহসা দেশে আসবেন বলে মনে হয় না।
মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই দলটিকে বর্তমানে ‘পরিবার লীগ’ বলে অভিহিত করেন। তারা মনে করেন, শেখ হাসিনা সবার আগে নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, পরিবারের লোকজনকে আগে বিদেশে পাঠিয়েছেন। কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেননি, একবারের জন্য নেতাকর্মীদের বিপদের কথাও চিন্তা করেননি। এখন দেশে ফেরার কথা বলে তিনি পরিস্থিতি যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দেখেছি, তবে এসব তথ্য কতটা সত্য-মিথ্যা, তা আগে যাচাই করা প্রয়োজন। এর আগে তিনি অনেক কথা বলেছেন। কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় আইনের প্রতি সম্মান জানিয়ে নিজেকে আইনের কাছে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত নেন, সেটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত বিষয়।
তিনি বলেন, দেশের নাগরিক হিসেবে যে কোনো ব্যক্তির আইনের আশ্রয় নেওয়া এবং আইনগত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার অধিকার রয়েছে। যদি শেখ হাসিনা নিজে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, শেখ হাসিনা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছেন, এটা শুনে খুব ভালো লাগল। এই উপলব্ধি তার আরও আগে হলে এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে যদি কালকেই দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতেন সেটা বরং বেশি ভালোই হতো। মঞ্জু আরও বলেন, অনেকে শেখ হাসিনার কথাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না। অতীতে এ ধরনের নানা কথা বললেও তিনি কথা রাখেননি। আমি এবার বিশ্বাস রাখতে চাই, কারণ তার বয়স হয়েছে। মৃত্যুর আগে অতীতের ভুল শোধরানোর একটা সুযোগ তিনি কাজে লাগালে খারাপ হবে না বলে মনে করি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা কীভাবে আসবে, তার সঙ্গে কারা কারা আসবে, সে আত্মসমর্পণ করবে কি না এটা ঠিক করবে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়টি দিল্লির সঙ্গে ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে। এখানে আর কোনো পক্ষ নেই। ফলে সরকারই ঠিক করবে তাকে কখন, কীভাবে আনা হবে এবং কীভাবে বিচারের রায় কার্যকর করবে—সব প্রস্তুতি নিয়েই তাকে আনতে হবে।
গতকাল রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা উদ্যোগ (এমএসএমই) দিবস-২৬ উপলক্ষে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্মাননা প্রদান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, শেখ হাসিনার অবস্থান ও বক্তব্যও দিল্লির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। দিল্লি থেকে তাকে যতটুকু পারমিট করা হয়, সে অনুযায়ী তিনি কথা বলেন। আওয়ামী লীগ তো এখন কোনো রাজনৈতিক দলই নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে ঘিরে যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়, সরকার যদি সেটাকে প্রশ্রয় দেয় তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশের আপামর জনগণ, জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষ, ত্রিশ হাজার আহত ও এক হাজার ৪০০ শহীদ পরিবারের সদস্য, আমরা সবাই প্রস্তুত আছি।
আওয়ামী লীগের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটিকে দলগতভাবে বিচারের আওতায় আনার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। এটাই সঠিক পদক্ষেপ। শেখ হাসিনার রায় অলরেডি হয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরেন, কেবল ফিরবেন ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। আমরাও চাই, তার ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে।