

সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে তিনি তরুণীর সঙ্গে খাটে বসে অন্তরঙ্গ সময় কাটাচ্ছেন। একজন তরুণীর সঙ্গে সংসদ সদস্যের এমন ‘আপত্তিকর’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়, সঙ্গে চলতে থাকে সমালোচনাও।
গত সোমবার রাত থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। যদিও শুরুর দিকে জামায়াত ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদের ফেসবুক আইডি থেকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি বলে প্রচারণা চালায়। পরে অবশ্য সংসদ সদস্য গাজী নজরুল নিজেই ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন তারা বিয়ে করেন। রাজধানীর মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার অফিসে অবস্থানের সময় তার গাড়ির চালকের ষড়যন্ত্রে ওই ভিডিও করা হয়।
গাজী নজরুল দাবি করেছেন, দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ তার গাড়িচালক। সে ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে তাদের কক্ষে প্রবেশ করে এবং জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করে।
দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করা ওই তরুণীর নাম মরিয়ম খাতুন। তিনিও ভিডিও বার্তায় বলেছেন, এমপি গাজী নজরুল ইসলাম তার স্বামী। প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম ভিডিও বার্তায় বলেছেন, তার স্বামী গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়ম বেগমের বিবাহ হয়েছে।
অবশ্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তরুণী নিজেদের স্বামী-স্ত্রী দাবি করলেও এবং তাতে প্রথম স্ত্রী সাক্ষ্য দিলেও ছড়িয়ে পড়া নতুন আরেকটি ভিডিওতে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়াও দ্বিতীয় স্ত্রী পরিচয় দেওয়া ওই তরুণীর একটি বায়োডাটা, একজন সংসদ সদস্য স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরের অফিসে অবস্থানকালে জিম্মি হওয়া এবং এক লাখ টাকা চাঁদা দিয়েও আইনগত প্রতিকার না চাওয়া নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৯৫১ সালের ২১ মে। তিনি সাতক্ষীরা থেকে জামায়াতের হয়ে তিনবারের নির্বাচিত এমপি। চলতি সংসদ ছাড়াও ওই আসন থেকে ১৯৯১ এবং ২০০১ সালে এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশের সূরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও আগে সাতক্ষীরা জেলা ও শ্যামনগর থানা জামায়াতের আমিরের দায়িত্বও পালন করেন। এই জনপ্রতিনিধি কেন হঠাৎ করে দ্বিতীয় বিয়ে করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তার নির্বাচনি এলাকায়। স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতারা ও এমপির ঘনিষ্ঠজনরাও ভিডিও ভাইরালের আগে তার বিয়ের খবর জানতেন না বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করা ওই তরুণীর সঙ্গে গাজী নজরুলের বয়সের তফাৎ অন্তত ৫৭ বছরের।
যা বললেন এমপি গাজী নজরুল: ভিডিও ভাইরালের পর গতকাল মঙ্গলবার এমপি গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে কালবেলা। তিনি বলেন, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মোছা. মরিয়ম বেগমের সঙ্গে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
ভিডিওর ঘটনার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ১৩ জুলাই আমার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে মগবাজারে আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক অফিসে যাই। সেখানে আমরা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা অবস্থান করি।
অফিসে খাট থাকা এবং শ্বশুরের অফিসে প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে গিয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি আমার শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর বাসা ও অফিস।’ তবে সেদিন কেন গিয়েছিলেন, সেই উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ওইদিন সংসদ ছিল বিকেলে। সেখান থেকে সংসদের যাওয়ার কথা ছিল তার।
তার ভাষ্য, সেখানে অবস্থানকালে জোহরের নামাজ আদায়ের আগে আমার গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যায়। সে ৫ থেকে ৭ জন সন্ত্রাসী নিয়ে আমাদের রুমে ঢোকে এবং আমাদের জিম্মি করে। এই ওবায়দুল্লাহ দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা। পারিবারিক ঝামেলার কারণে সে পূর্বপরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্র করে সম্মান নষ্ট করেছে।
এমপি গাজী নজরুল বলেন, এক পর্যায়ে তাকে জিম্মি করে বাসার নিচে একটি বিকাশের দোকানে বসিয়ে রেখে তারা ৫ লাখ টাকা দাবি করে। তিনি বিকাশ থেকে ৫০ হাজার টাকা ও ব্যাংক থেকে আরও ৫০ হাজার টাকা ম্যানেজ করে দেন। ‘ওই সন্ত্রাসীদের’ কাছে অস্ত্র ছিল কি না এবং অস্ত্র দিয়ে তাকে জিম্মি করা হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে এমপি বলেন, অস্ত্র থাকতে পারে, তাদের একজনের কাছে কালো ব্যাগ ছিল। তবে অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়নি।
তার ভাষ্য, ওবায়দুল্লাহ যে গাড়িটি চালায়, সেটির মালিক মূলত দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবা মাসুম বিল্লাহ। ওবায়দুল্লাহকে গাড়িটি চালাতে দিয়েছিলেন। তিনি ওই গাড়িটি দিয়ে মাঝেমধ্যে চলতেন। সেদিনও গাড়িটি দিয়ে তার সংসদে যাওয়ার কথা ছিল।
তিনি জিম্মি হওয়ার পর ফোনে আর চালক ওবায়দুল্লাহকে পাননি জানিয়ে বলেন, ওইদিন রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ওবায়দুল্লাহ তাকে ফোন দেয়। সন্ত্রাসীরা গাড়িটি আটকে রেখেছে জানিয়ে আরও ৫ লাখ টাকা চায়। প্রায় একই সময়ে মাসুম বিল্লাহকে (দাবি করা দ্বিতীয় শ্বশুর) ফোন দিয়ে গাড়ি ছাড়াতে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। কিন্তু পরে আর টাকা দেওয়া হয়নি। মূলত গাড়িটি কেউ আটকে রাখেনি। ওবায়দুল্লাহ টাকার জন্য এই নাটক সাজিয়েছিল।
পুরো ঘটনাটি পড়েছে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায়। একজন এমপিকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিরঝিল থানার ওসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ওই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বা মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ থানায় অবহিত করেননি। জিডি বা মামলাও করেননি কেউ।
শ্বশুরের বাসা ও অফিসে স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটানোর সময় একজন সংসদ সদস্যকে দিনদুপুরে এভাবে জিম্মি করে চাঁদাবাজি করার ঘটনায় তাৎক্ষণিক বা পরে পুলিশের সাহায্য নেননি কেন জানতে চাইলে গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তাৎক্ষণিকভাবে তা নেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে মাসুম বিল্লাহকে (শ্বশুর) আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেছিলাম। সে আর নেয়নি। তবে তা নেওয়া যাবে।’
দীর্ঘ সময় ধরে এমন ঘটনার পরও স্থানীয় দলীয় কর্মীদের কাছ থেকেও তখন সহায়তা নেননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পারিবারিক বিষয়ে দলীয় কারও সঙ্গে শেয়ার করতে চাইনি।’
দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা কেন এমন করবে, জানতে চাইলে গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। এর জের ধরে এই ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ঘটনার ওবায়দুল্লাহ তার শ্বশুরকে বলেছিল, ‘তোকে দেখে নেব, মজা দেখাব, তোর মেয়ের জীবন তছনছ করে দেব।’
‘পরে হিংসা ও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ আমাদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়’, বলেন এমপি নজরুল।
অবশ্য এসব বিষয়ে গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ, দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করা তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহর বক্তব্য জানতে পারেনি কালবেলা।
ছড়িয়ে পড়া বায়োডাটার সুপারিশ নিয়ে যা বললেন এমপি: এদিকে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে দ্বিতীয় স্ত্রীর একটি বায়োডাটা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, ওই তরুণীর বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। থাকেন রাজধানীর পল্লবীতে। তার জন্ম ২০০৮ সালের মে মাসে। চলতি বছরই তিনি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। তিনি অবিবাহিত।
ওই বায়োডাটায় সাতক্ষীরা-৫ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের সুপারিশ রয়েছে। সবুজ কালিতে তিনি লিখেছেন, ‘জোর সুপারিশ করছি।’ নিজে তারিখ দিয়েছেন ২২ জুন, ২০২৬। কিন্তু ভিডিও ভাইরালের পর গাজী নজরুল দাবি করছেন, তিনি ১৭ জুন বিয়ে করেছেন এবং ভিডিওটি ১৩ জুলাইয়ের।
ওই বায়োডাটা ভুয়া কি না, জানতে চাইলে গাজী নজরুল ইসলাম এমপি বলেন, সেটি সঠিক এবং তার সুপারিশও সঠিক। তবে ১৭ জুন বিয়ে করে ২২ জুন স্ত্রীকে অবিবাহিত উল্লেখ করা বায়োডাটায় স্বাক্ষরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবিবাহিত উল্লেখ থাকলে চাকরি পেতে সুবিধা হয়।’ পৃথক ভিডিওতে যা দেখা গেল: এমপি গাজী নজরুল ইসলাম প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে দ্বিতীয় শ্বশুরের অফিসে যাওয়ার কথা বললেও আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েক ব্যক্তি ওই কক্ষে ভিডিও করছে এবং এমপি ও তরুণীর বক্তব্য নিচ্ছে।
ভিডিওকারীদের নজরুল ইসলামকে জেরা করতে এবং নীলা নামের এক নারীকে নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। ভিডিওতে বলা হয় ‘এই যে এইটা নীলার বাসা। আগে আওয়ামী লীগ করত। এখন দেহ ব্যবসার জন্য বাড়ি ভাড়া দেয়।’ এ সময় এমপি নজরুলকে উদ্দেশ করে এক যুবক প্রশ্ন করেন, ‘আগে কয়বার এসেছেন? সত্যি করে বলেন, কয়বার এসেছেন। আমরা কয়েকদিন দেখেছি আপনি এখানে আসেন। ধরতে পারছিলাম না।’ ওই সময় নজরুল ইসলামকে হাতজোড় করে ক্ষমাও চাইতে দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘একবারই এসেছি। আমাদের ছেড়ে দেন। আমরা অন্যায় করেছি।’ তবে ভিডিওতে তরুণীকে বেশ স্থির দেখা যায়। তিনি নিজের ভিন্ন একটি নাম বলেন এবং ভিডিও মুছতে বলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ষড়যন্ত্র করে অনেক কিছুই করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা ছিল, তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল।’ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত জামায়াতের: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে দলের সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে এ কথা জানান।
বিবৃতিতে জানানো হয়, সম্প্রতি গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবর জামায়াতে ইসলামীর নজর এসেছে। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজস্ব বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। এরপর দলের সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।