

মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইরানে বিমান হামলা স্থগিত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল রোববারও ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরোক্ষ যোগাযোগ এবং আলোচনা অব্যাহত ছিল। এদিকে কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা এই সংঘাত সামলাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনা ও সামরিক পদক্ষেপ—উভয় পথই খোলা রাখছেন। এমন পরিস্থিতিতে আগামী মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে ইরানি নেতাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এই কূটনৈতিক সমঝোতা চেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করছেন তিনি।
আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের আগে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সাফল্য দেখানোর তীব্র চাপে রয়েছেন নেতানিয়াহু। অন্যদিকে, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া আগের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর প্রায় দুই সপ্তাহ ইরানে তুমুল হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। তবে গোলাবারুদের মজুদ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসায় নতুন করে হামলা আপাতত স্থগিত রেখেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র হামলা বন্ধ রাখায় তেহরানও রোববার ঘোষণা দিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছে। ইরানের সেনা মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া জানান, গত দুই দিন ধরে আমেরিকানরা তাদের হামলা বন্ধ রেখেছে। আমাদের কৌশল মূলত পাল্টা জবাব দেওয়া, তাই আমরাও আপাতত আমাদের অভিযান স্থগিত করেছি।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের মাধ্যম হরমুজ প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে রোববার ইরান ও ওমানের শীর্ষ কূটনীতিকরা আলোচনা করেন। মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কথা স্বীকার করলেও জলপথটি দিয়ে কোন কোন জাহাজ চলবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা ও ফি দাবি করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে, সে জন্য মধ্যস্থতাকারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মার্কিন গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, গত শুক্রবার ওভাল অফিসের এক জরুরি বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নতুন সামরিক অভিযানের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেন। জেনারেল কেইন জানান, প্যাট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টর এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইলের মতো আক্রমণাত্মক অস্ত্রের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী হিসেবে সোচ্চার ভূমিকা নিচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, সোমবার ওয়াশিংটন রওনা হওয়ার আগে তিনি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যৌথ হামলায় ট্রাম্পকে রাজি করাতে নেতানিয়াহু বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি চান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা যেন ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর জোর দেন; যদিও মার্কিন প্রতিনিধিরা প্রাধান্য দিচ্ছেন হরমুজ প্রণালি সচল করায়।
কাস্পিয়ান সাগরে নতুন মোড়: ইউক্রেনের ড্রোন হামলা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা স্থগিতের খবরের মধ্যেই আরেক যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে। কাস্পিয়ান সাগরে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এতে এক ইরানি নাবিক নিহত ও অপর একজন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ জানায়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজগুলো ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে সামরিক উপকরণ পারাপারে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, কাস্পিয়ান সাগরে সামরিক উপকরণ পরিবহনকারী ইরান-সংশ্লিষ্ট মালবাহী জাহাজ ও একটি যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে কিয়েভ সফল দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে।
তবে এ ঘটনাকে বৈরী ও অপরাধমূলক আখ্যা দিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ইরান। তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে ইরান কখনোই হস্তক্ষেপ করেনি। তারা তেহরানে নিযুক্ত ইউক্রেনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে। পাশাপাশি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি প্রধান কাজা কাল্লাসের সঙ্গে কথা বলে এ হামলার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।