মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
জাকির হোসেন
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:১৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রান্তিকালের কথকতা

প্রহসনের রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে এবার নেপালে সরকারের পতন হয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা শাসকশ্রেণির তখ্তে-তাউস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। গত মঙ্গলবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর আকাশে যখন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল, তা শুধু একটি সংসদ ভবন জ্বলেপুড়ে ছারখার হওয়ার সাধারণ ছবি নয়। বিষয়টি দক্ষিণ এশিয়ার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতারই অংশ। ২০২২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা এবং গত বছর (২০২৪) আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পালাবদল যেন একই নদীর বয়ে চলা। এ তিন দেশেই প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি—এ তিনটি দেশেই গণবিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। একপর্যায়ে যখন জনগণ মনে করেছে যে, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের কোনো সমাধান দিতে পারছে না; তাই তারা বিকল্প ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকেছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের ঘটনা এই ইঙ্গিত দেয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে যদি প্রচলিত গণতন্ত্র জনগণের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ এবং দুর্নীতি দমন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেসব দেশে বড় রাজনৈতিক পালাবদল বা বিকল্প রাজনীতির প্রতি সমর্থন বাড়বে। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের বিক্ষুব্ধ মানুষের জ্বলে ওঠা শুধু একটা প্রতীক নয়; এ ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি অশনিসংকেত।

নেপালে ঘটনাটি সাধারণ মানুষের বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, যা বহুদিনের হতাশাকে মাত্র দুদিনের মধ্যে বিস্ফোরণে পরিণত করেছে। এ ভয়াবহ বিক্ষোভে শুধু সংসদ ভবন জ্বলতে দেখা যায়নি। অর্থমন্ত্রীকে রাস্তায় ফেলে বিক্ষুব্ধ জনতা পকেটমারের মতো পিটিয়েছে। মন্ত্রীদের বাড়িঘরও হামলার শিকার হয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারে করে মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নিয়েছেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ভবনেও বিক্ষোভকারীরা ঢুকে ভাঙচুর চালিয়েছে। নেপালে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ মনে হলেও, এর পেছনের কারণ একটি নয়—একাধিক এবং তা অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। এটা মূলত সীমাহীন বেকারত্ব, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের অর্থাৎ জেনজির এক স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ। মাত্র ১৭ বছরে নেপালে ১৩ বার সরকার পতন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণরা অভিজাত রাজনীতিকদের সন্তানদের বিদেশ ভ্রমণের বিলাসবহুল ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছিলেন। এই ডিজিটাল আন্দোলন সাধারণ মানুষের দুর্দশা এবং রাজনৈতিক পরিবারের সীমাহীন সুবিধার ব্যবধানটা মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছিল।

গত বছর জুলাই-আগস্টে আমাদের দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের মাত্র ১৩ মাসের মাথায় নেপালে সরকারের পতন ঘটল। তফাতটা শুধু পতাকার রং আর স্লোগানে। ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের প্রতি শাসকের প্রাথমিক অনমনীয়তা ও দমনপীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত প্রবল জনবিক্ষোভের জেরে পতন ও পলায়ন। কলম্বো, ঢাকার পর এবার কাঠমান্ডুও দেখল একই ছবি।

২০২২ সালের জুলাই মাসে আর্থিক মন্দায় বিধ্বস্ত শ্রীলঙ্কায় বিক্ষুব্ধ জনতার নিশানা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে এবং তদারকি প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের সরকারি বাসভবন। বর্ষা বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সংসদ ভবন ও গণভবনেরও একই পরিণতি হয়েছিল।

সমাজমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে গত সোমবার থেকেই বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন নেপালের তরুণরা। ওই বিক্ষোভে ১৯ জন বিক্ষুব্ধের মৃত্যু হয়। শেষে ছাত্র-যুবদের আন্দোলনের মুখে সোমবার রাতেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় নেপাল সরকার। কিন্তু এরপরও বিদ্রোহ থামেনি। মঙ্গলবার সকাল থেকে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের দাবিতে বিদ্রোহ আরও জোরালো হয়। একের পর এক নেতা-মন্ত্রীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভের মুখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ওলি। মঙ্গলবার সকালেই তিনি জানিয়েছিলেন, সন্ধ্যায় সর্বদল বৈঠক করবেন। কীভাবে এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়, উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের পথ কী, তা নিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে এর আগেই তাকে পদত্যাগ করতে হয়।

প্রায় আড়াইশ বছর স্থায়ী রাজতন্ত্রের অবসানের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতারা নানাভাবে মানুষকে ঠকিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে নেপালের তৎকালীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনযুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের (মাওবাদী) নেতা পুষ্পকমল দহল ওরফে প্রচন্ড। তার নেতৃত্বেই ওই বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি নেপাল সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু করেন মাওবাদী যোদ্ধারা। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অপশাসনের অভিযোগ তুলে সরকারি বাসভবন ভাঙচুর করা হয়। নিশানা করা হয় সামরিক বাহিনীকেও। আত্মগোপনে থেকেই এ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন প্রচন্ড। দমনপীড়়নের মাধ্যমেই এ অভ্যুত্থান থামাতে চেয়েছিল নেপালি রাজতন্ত্রের ছত্রছায়ায় থাকা সে দেশের সরকার। এর ফলে ১০ বছরে মৃত্যু হয়েছিল অন্তত ১৭ হাজার জনের। ঘরছাড়া হতে হয়েছিল দুই লাখ মানুষকে। সেই সময় নেপাল সরকারের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। সরকারি দমনপীড়ন সত্ত্বেও গ্রামীণ নেপালের বড় অংশের দখল নেয় মাওবাদী যোদ্ধারা। সেসব জায়গায় সমান্তরাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করে তারা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৬ সালে মাওবাদীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় সরকার। ওই শান্তিচুক্তিতেই নেপালে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্র তৈরির কথা বলা হয়। ২০০৮ সালের ২৮ মে নেপালের সংবিধানে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র শব্দটি যোগ করা হয়। জুন মাসে কাঠমান্ডুর রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যান নেপালের শেষ রাজা জ্ঞানেন্দ্র। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন প্রচন্ড। তবে পুরো মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি তিনি। এরপর ২০২৪ সালের মার্চে নেপালের সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) নেতা ওলির সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করেছিলেন তিনি। ওই বছরের ৩ জুলাই জোট ভেঙে নেপালি কংগ্রেসের হাত ধরে ওলির দল। ১২ জুলাই আস্থা ভোটে হেরে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন পুষ্পকমল দহল প্রচন্ড।

প্রচন্ডের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আবার আদর্শচ্যুত হওয়ারও অভিযোগ তুলেছেন একদা তার সঙ্গী মাওবাদী নেতারা। কিন্তু যেভাবে সরকার এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি জনযুদ্ধ চালিয়েছিলেন, তা নেপালে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত করেছে বলে মনে করেন অনেকেই। দীর্ঘ জনযুদ্ধের পরও হয়তো কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব আনতে পারেননি প্রচন্ড। কিন্তু কার্যত তার আন্দোলনেই নেপালে রাজতন্ত্রের পতন হয়েছিল। অন্য দলগুলোর সমর্থন নিয়ে, অস্ত্র ছেড়ে নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হয়েছিল মাওবাদীরাও। নেপালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রচন্ডের ভূমিকার কথা স্বীকার করেন প্রত্যেকেই। সেই মাওবাদী নেতার বাড়িতেও ভাঙচুর চালালেন ছাত্র-যুবারা। তিনবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়া প্রচন্ড বর্তমানে নেপালের বিরোধী দলনেতা। নেপালের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে বহুবার জোট এবং সরকার বদল করেছেন তিনি। কিন্তু তারপরও নেপালে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমেনি। ছাত্র-যুবার ক্ষোভ থেকে রেহাই পায়নি বাড়িও। মঙ্গলবার নেপালের ললিতপুর জেলার খুমালতারে প্রচন্ডর বাসভবনে চড়াও হন বিক্ষোভকারীরা। ভাঙচুর করা হয় বাড়ি। তারপর থেকে তিনি কোথায় আছেন, দেশেই রয়েছেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ছাত্র-জনতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অধিকার ফিরে পাওয়ার পরও রাজপথ ছাড়েননি। পুলিশ বাহিনীর সদস্যকে পেটানো হয়েছে, সেনাবাহিনীর সদস্যরা নীরব দর্শকের মতো তা প্রত্যক্ষ করেছেন। ছাত্র-জনতা চাইছে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, চাইছে গুলি চালানোর বিচার, চাইছে যাবতীয় দুর্নীতির তদন্ত। তারা নিজেরাই ঘোষণা দিয়েছে—এটা জেনজির বিপ্লব। নতুন সমাজ তৈরি করতে চায়। নেপালের এ অভ্যুত্থান আরও একটি আলোচনা উসকে দিয়েছে। তা হলো, এ ধরনের আন্দোলন আরব বসন্তের মতো এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। নেপালের পর এখন এর গন্তব্য কোথায়...

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩৪ তলার ফ্ল্যাট কেনার পর জানতে পারলেন ভবনটিই ৩২ তলা

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

১০

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১১

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১২

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৩

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৪

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৫

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৬

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৭

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৮

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৯

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

২০
X