

ফুসফুস শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুটি কোমল জীবন্ত অঙ্গ, যাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস প্রাণে বেঁচে থাকার ছন্দ দেয়। এরা যেন শরীরের গভীরে থাকা দুটি বেহালার মতো যাদের টানে জীবনের সুর বাজে। কিন্তু এ বেহালা দুটিকে প্রতিদিন ধীরে ধীরে নিঃশব্দে মানুষ বিষ দিয়ে ঝলসে দিচ্ছে।
সিগারেট এক নীরব শত্রু, যা মানুষের ফুসফুসকে প্রতিদিন একটু একটু করে খেয়ে ফেলে। প্রতিটি টানে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে সিগারেট যে ক্ষতিটা করে; শরীর তার কিছুই বুঝতে পারে না। প্রথম কারণ শরীরের সজীবতা মরে সময় নিয়ে। কিন্তু এক সময় যখন বুঝতে পারে তখন আর কিছুই করার থাকে না। তখন চিকিৎসা নয়, সময় কেনার যুদ্ধ চলে আর সেই যুদ্ধের হার হয় শেষ দিয়ে।
বাংলাদেশে ধূমপান এখন অভ্যাস নয়, বরং একটি সামাজিক মহামারি। এ দেশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা, শহরের রাস্তা থেকে শুরু করে গ্রামের হাট; সর্বত্র সিগারেটের ধোঁয়া চোখে পড়ে। অনেক কিশোর-কিশোরীকেও এ ধোঁয়ার ভেতর হাঁসফাঁস করতে দেখা যায়। দেখে মনে হয় এ ধোঁয়া যেন তাদের এক ধরনের সাহস আর স্টাইলের আহ্বান দিচ্ছে। অথচ তারা জানে না এটি স্টাইল নয়, এটি জীবনের ঘড়িকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ মানুষ তামাক ও ধূমপানের কারণে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ সরাসরি সিগারেট পানের মাধ্যমে এবং বাকিরা পরোক্ষভাবে ধূমপানে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বাংলাদেশে এ সমস্যা আরও ভয়াবহ। এ দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ পুরুষ ও ৮ শতাংশ নারী ধূমপানে আসক্ত। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। তারা ভাবছে এটা ফ্যাশন, আবার অনেক সময় চাপ থেকে মুক্তি পেতে তারা ধূমপান করে।
মানুষের ফুসফুস একটি জটিল কিন্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ। এ অঙ্গ রক্তে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় এবং শরীরের কোষগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে। এ ফুসফুস যখন প্রতিদিন বিষাক্ত ধোঁয়ার আক্রমণের শিকার হয় তখন প্রথমে হালকা কাশি, পরে ক্রমাগত শ্বাসকষ্ট, এরপর ধীরে ধীরে অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। ফুসফুস তখন চিকিৎসকের রিপোর্টে একটি ছিদ্রভরা, কালো, ক্ষতবিক্ষত অঙ্গ হিসেবে ধরা পড়ে।
সিগারেটের ভেতরে থাকা নিকোটিন মারাত্মক আসক্তির উপাদান। এটি মস্তিষ্কে এমন এক ধরনের অনুভূতি তৈরি করে, যাতে ধূমপায়ী কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি পায়। কিন্তু এ স্বস্তির পেছনে ভয়াবহ পরিণতি লুকিয়ে থাকে। সিগারেটের ভেতরে থাকা সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে প্রায় ঊনসত্তরটি পদার্থ সরাসরি ক্যান্সার সৃষ্টি করে। এসব কথা শুনলে শিউরে উঠতে হয় কিন্তু আসক্ত মানুষের কাছে এগুলো শুধুই তথ্য, তাদের হৃদয়ে কথাগুলো পৌঁছায় না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, ধূমপান শুধু ধূমপায়ীর ক্ষতি করে না; যারা আশপাশে থাকে তারাও প্যাসিভ স্মোকার হিসেবে একই বিষ নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করছে। একটি শিশুও এ ধোঁয়ার শিকার হতে পারে যদি তার বাবা ঘরে ধূমপান করেন। সিগারেট আসলে নিজের মৃত্যু নয়, এটি একাধিক মৃত্যুর দায় বহন করে। অনেক দেশ এ সংকট মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সিগারেটের প্যাকেটের ওপর ভয়াবহ ছবি, ধূমপানের বিরুদ্ধে মিডিয়ায় সচেতনতামূলক প্রচারণা, কর বৃদ্ধি আর প্রকাশ্য জায়গায় ধূমপানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা অনেকটা সফল হয়েছে। বাংলাদেশও কিছু আইন রয়েছে কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। অনেকে আইন লঙ্ঘন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।
সিগারেট ছাড়ার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তি। কেউ যদি না চায় তাকে জোর করে কখনোই ছাড়ানো যাবে না। কিন্তু তাকে বোঝাতে পারলে সে নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এজন্য পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর সমাজের সহযোগিতা দরকার। কোনো ধূমপায়ীকে অপমান না করে তাকে বুঝিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করতে হবে। কাউন্সেলিং, নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির সাহায্যে ধূমপান ছাড়া সম্ভব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে যাতে মানুষ তরুণ বয়সেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে পারে। মিডিয়ায় সিগারেটকে স্টাইল হিসেবে দেখানো বন্ধ করতে হবে আর তুলে ধরতে হবে এটি কতটা ক্ষতিকর।
সিগারেট ধোঁয়ার মতো দেখতে হলেও এর ক্ষতি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু বোঝা যায় যখন অনেক দেরি হয়ে যায়। অনেক পরিবারেই দেখা যায় কীভাবে একজন মানুষ ধূমপান করে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এটি শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট।
আমাদের উচিত এ সংকট এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখা। তা না হলে একদিন হয়তো অক্সিজেন থাকবে কিন্তু ফুসফুস থাকবে না। এ বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জীবনের পাশে দাঁড়ানোর, ধোঁয়ার বিরুদ্ধে কথা বলার সময় এখনই। ফুসফুস আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, এখন দায়িত্ব ফুসফুসকে বাঁচিয়ে রাখার।
আরমীন আমীন ঐশী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়