

অনেক হাইপ-হাইট থাকলেও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দেশ থেকে পাচার হওয়া টাকা ফেরতের আশা দিনকে দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। দুরাশার নামান্তর। বাস্তবে ওই চেষ্টার প্রসেসই এখনো শুরু করা যায়নি। যদিও ক্ষমতায় অভিষেকের পরই এ-সংক্রান্ত ঘোষণা ছিল নোবেলজয়ী প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। তা আশা দেখিয়েছে। মানুষের মন কেড়েছে। পরে নানান ইস্যুর চোট ও ডামাডোলে বিষয়টি আর সামনে আসেনি। আলোচনাও হারিয়ে যায়। দৃশ্যত ব্যতিব্যস্ততা চলে যায় নির্বাচন, সংস্কার, বিচারসহ বিভিন্ন দিকে। এর মাঝেও পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ভেতরে-ভেতরে চেষ্টা কম করছে না সরকার। এ ব্যাপারে সরকারের হিতাকাঙ্ক্ষী মহল থেকে ‘যতটুকু চিবানো সম্ভব, ততটুকু মুখে নেওয়ার’ পরামর্শ থাকলেও, তা আমলে না নিয়ে এ চ্যালেঞ্জ জেতার একটি মিশন অনেক দূর এগিয়েছে বলে তথ্য মিলছিল। নির্বাচনের আগেই এ-বিষয়ক কিছু সুসংবাদ প্রাপ্তির আভাসও ছিল।
জানানো হয়েছিল, এস আলম, সামিট, নাসা ধরনের কিছু প্রতিষ্ঠান ও এসবের মালিক-মহাজনরা দেশের অন্তত ৪০ হাজার কোটি লুট এবং পাচার করেছেন এ-সংক্রান্ত পর্যাপ্ত তথ্য-সাবুদ এখন সরকারের হাতে। দেশি-বিদেশি কয়েকটি সংস্থা এ ব্যাপারে নীরবে অনেক কাজ করে দিয়েছে সরকারকে। ৪০ হাজার কোটির বিস্তারিত জানার পর দুদক, সিআইডিসহ কয়েকটি সংস্থাকে আরও আপডেট নিতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে বিশ্বব্যাপী তার সম্মানে আরেকটি পালক যোগ করার অভিপ্রায় কাজ করছে ড. ইউনূসের মধ্যে। বিশ্বের বিশেষ পাঁচ দেশের সাত শহরে চলেছে একটি এক্সক্লুসিভ অনুসন্ধান। এ ছাড়া ৯ দেশে ৩৫২ পাসপোর্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। যেগুলো টাকার বিনিময়ে অর্জন করেছে কিছু বাংলাদেশি। অস্ট্রিয়া, ডোমেনিকা, গ্রেনাডা, নর্থ মেসিডোনিয়া, মালটা, সেন্ট লুসিয়া, তুরস্কের মতো দেশে টাকা পাচার হতে পারে বা কেউ ওইসব দেশের পাসপোর্টধারী হবেন, তা ধারণাতীত। এখন এ-সংক্রান্ত তথ্যের আর তেমন আপডেট নেই। তথ্য মিলছে পাচারে এলেমদারদের দেশে থাকা অর্থসম্পদ রক্ষণ-সংরক্ষণে রাজনৈতিক মহলের তদবির ও মধ্যস্থতার।
জড়িতদের বিচার কতটুকু করা যাবে, এ নিয়ে সংশয় থাকলেও এসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বাংলাদেশের অনুকূলে নিয়ে আসার একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সহায়তায়। প্রায় আধা ডজন আন্তর্জাতিক সংস্থা এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা দিয়েছে। ঘটনা মালুম করে ওই অর্থ পাচারে জড়িতরা শেখ হাসিনার আমলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেটাবেজ-সিবিএস নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের লোক বসিয়ে বেশ কিছু তথ্য এরই মধ্যে গায়েব করে ফেলেছে। তা উদ্ধারে সক্ষম এক্সপার্টও এরই মধ্যে হায়ার করা হয়েছে। এদিকে, দেশের ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাট ও অর্থ পাচারে জড়িতদের মধ্যে কম অপরাধীদের সঙ্গে সমঝোতার চিন্তাও কাজ করছে সরকারের অভ্যন্তরে। এ ক্ষেত্রে পাচারকারীদের সঙ্গে সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য হলো টাকা উদ্ধার, শাস্তি নয়। বিদেশি কয়েকটি সংস্থার কিছু লোক এরই মধ্যে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। টেকনিক্যাল সহায়তার পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়ায় যেন আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকে, সেই তালিম দিয়েছেন তারা। কারণ, পাচারের ওই অর্থ আইনত এখন বিদেশি সম্পদ। সেগুলো ফেরত আনতে আইনি লড়াই করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক কিছু ল ফার্ম আছে, যারা নিজেরাই অর্থ দিয়ে মামলা চালায়, জিতলে লাভ ভাগ করে, না জিতলে কেউই কিছু পায় না। এরকম কয়েকটি ‘ল’ ফার্ম সাড়া দিয়েছে।
এ ক্ষেত্রেও মামলা দুই ধরনের। সিভিল ও ক্রিমিনাল। ক্রিমিনাল মামলায় সাধারণত সমঝোতার সুযোগ থাকে না। এসব মামলায় অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য। সেখানে টাকা আদায় প্রাধান্য পায় না। কিন্তু ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ অনেক সময় সিভিল মামলার আওতায় পড়ে। তখন শাস্তি নয়, মূল উদ্দেশ্য টাকা উদ্ধার সম্ভব হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৯৮ শতাংশ মামলা কোর্টে না গিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। এমনকি আদালতেও বিচারক দুপক্ষকে নিজেরা বসে সমাধানের আদেশ দিতে পারেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে এমন সমঝোতা হলে আদালতও সেই নিষ্পত্তিকে গ্রহণ করেন।
পাচারের টাকা ফেরতের বিষয়টির বাঁক এরই মধ্যে ঘুরে গেছে। ভাও বুঝে যে যেখান দিয়ে পারছে তাদের দেশে থাকা সম্পদের ভাগ হাতানোর একটা আচার চর্চা হচ্ছে দেশে। এস আলমের গাড়ি সরিয়ে বহিষ্কার হওয়া বিএনপির কয়েক নেতাকে দলে ফেরানো হয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা সুফিয়ান, এনাম, খোরশেদ, মামুন মিয়াদের বড় দাগের পদপদবি দেওয়ার আয়োজনও চূড়ান্ত। চট্টগ্রামের কালুরঘাট শিল্প এলাকা থেকে এস আলমের বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল গাড়ি সরানো নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন এ নেতারা। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত ১৪টি বিলাসবহুল গাড়ি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে ভাইরাল হয়েছিলেন তারা। এ সংশ্লিষ্ট একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরেছে কয়েক দিন। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন জমি ও সম্পদ যেন কেউ না কেনেন, গভর্নরের এ ঘোষণার পরপরই কাজটি সেরেছিলেন তারা। বিষয়টি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিলে তাদের বহিষ্কার করা হয়।
বাংলাদেশ থেকে প্রতারণা, জালিয়াতি ও হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করে এস আলম ও তার পরিবার বিদেশে এবং দেশে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তৈরি করেছেন। একদিনে এসব সম্পদ হয়নি। বছরের পর বছর ধরে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার পরিবারের পরিচালিত ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বাংলাদেশের এক খোলা গোপন রহস্য হিসেবে পরিচিত ছিল। নতুন অনুসন্ধান বলছে, এ কার্যক্রমের পরিধি ধারণার চেয়েও বেশি; যা আধুনিক বিশ্বে অন্যতম দুঃসাহসিক আর্থিক কেলেঙ্কারি। অন্তত নয়টি বিদেশি আর্থিক নজরদারি সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত এক সাম্প্রতিক অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা—প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অন্তত ৪৭০টি শেল কোম্পানির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নয়টি দেশে পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত। এই অর্থ বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
ভাগেযোগে এখন এর হকদার বা শরিক হওয়ার বাসনা অনেকের। এ ক্ষেত্রে বিএনপির চলমান মৌসুমি ধড়িবাজদের অনেকের সঙ্গে এরই মধ্যে একটি গাঁথুনি গড়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে ছোট-বড় বলতে কথা নেই। রাজধানী, বন্দরনগরী, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পর্যন্ত চলছে এস আলমের রাজনৈতিক এমএলএম। এতে ভাগ্য বদলে যাচ্ছে অনেকের। তা তার নিজের এলাকায়ও। এস আলমের গাড়ি ও টাকার বস্তা সরানোর কাণ্ডে অবদান রাখা এনাম ও খোরশেদকে বিশেষ কাজের জন্য সমৃদ্ধ পটিয়ার বিএনপির রাজনীতির উচ্চাসন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেখানে রাজনীতির শীর্ষ অবস্থান মানে দেশের বিশেষ কয়েকটি সেক্টরকে কবজা করা। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টিকে ফ্যাক্টর করা পর্যন্তই এস আলমের কাজ নয়। মূল কাজ দেশে বড় রকমের গুবলেট পাকানো। অনেকের ধারণা ছিল, এস আলমের সঙ্গে আওয়ামী লীগের দহরম-মহরম বেশি থাকায় বিএনপি নেতারা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। কিন্তু সেটা শুধুই ধারণা। বাস্তব ভিন্ন।
জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগের নিমিত্তে নামে-বেনামে ছয়টি ব্যাংক থেকে ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করতে সমস্যা হয়নি। এখনো তার আশীর্বাদদাতার অভাব হচ্ছে না। এ সিরিজের মাঝে নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নামে প্রায় ৩৫০ বিঘা জমি, দুবাইয়ে রিসোর্ট ও খেজুরবাগান; গেল সপ্তাহে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে নাসা গ্রুপের সম্পত্তির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, বাণিজ্য উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান, বিজিএমইএ সভাপতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রতিনিধিরা।
দুদক থেকে তার সম্পদের কিছু খোঁজও জানানো হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে গুলশান-১-এর ১২ তলা বিশিষ্ট দুটি বিল্ডিং (ব্যাংক বিল্ডিং)। ৩০০ ফিট এলাকায় দুই বিঘা জমি। জলসিঁড়ির, সেক্টর-১৭-তে একটি মার্কেট। মেয়ে আনিকার নামে একাধিক প্লট। মেঘনাঘাটে একটি ওয়্যারহাউস এবং পেট্রোল পাম্প। ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০০ বিঘা জমি। গুলশানে শান্ত মারিয়মের পাশে বাউন্ডারি করা আনুমানিক ১০ বিঘা জমি। দুবাইয়ে খেজুরবাগান ও রিসোর্ট। চাঁদপুরে বিশাল মার্কেট। নিকেতনে ১০ বিঘা জমি। হাতিরঝিলের প্রজেক্টে বড় দুটি খেজুরের ডিপো, যাতে রয়েছে ১০-১২ কোটি টাকার খেজুর। মহাখালী ডিওএইচএসের মসজিদের পাশে ১০ কাঠা জমির ওপর বাসা। গুলশান-১-এ দখলকৃত বাসা, যেখান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গুলশানে পারটেক্স গ্রুপের কাছ থেকে কেনা এক বিঘা জমি। পূর্বাচলে ২০টি প্লট। পূর্বাচলে ২.৫ বিঘার ওপর একটি হাসপাতাল। নীলা মার্কেটের সামনে পুলিশ হাউজিংয়ের বিপরীতে ৩০ বিঘা জমি। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় মহাখালী বাসস্ট্যান্ডের পাশে তিন বিঘা জমির ওপর নাসা হেড অফিস। তেজগাঁও আড়ংয়ের বিপরীতে সাত বিঘা জমি। আড়ংয়ের পাশে গাজী গ্রুপ থেকে কেনা সাত বিঘা জমি।
সরকারি তরফে দেওয়া এসব হিসাব আরব্য রজনীর গল্পের মতো। প্রশ্ন হচ্ছে—এস আলম, নাসা, সামিট ইত্যাদির এসব হিসাব জানানো শুধু পিলে চমকানোর জন্য; নাকি নানা মহলের থাবায় ফেলতে? তাদের ভিলেনের খাতায় ফেলে রাখা কাম্য নয়। বিচার হওয়া জরুরি। তাদের কল-কারখানাগুলোর চাকা ঘুরতে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখাও প্রত্যাশিত। তারা নিঃসন্দেহে অপরাধী। কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠিত কল-কারখানা অপরাধী নয়। সেখানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরাও দোষী নয়।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন