

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়েই গণমাধ্যম এখন এক অদ্ভুত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। একসময় সংবাদপত্রের পাঠক সকালবেলা অপেক্ষা করত সত্য জানার জন্য, টেলিভিশনের দর্শক রাতের প্রধান সংবাদে চোখ রাখত দেশের অবস্থা বোঝার জন্য। কিন্তু সেই সময় যেন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। এখন সংবাদ মানে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা, সেলিব্রেটির ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও কিংবা এমন সব চটকদার খবর, যা কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখে পড়ে আবার মিলিয়ে যায়। এটাই হলো আজকের বাস্তবতায় হলুদ সাংবাদিকতা ও ভিউ ব্যবসার দৌরাত্ম্য।
হলুদ সাংবাদিকতা নতুন কিছু নয়। উনিশ শতকের শেষদিকে আমেরিকার সংবাদপত্রগুলো যখন একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছিল, তখনই শুরু হয় অতিরঞ্জিত শিরোনাম, রক্তচক্ষু ছবি আর গুজবের ওপর ভর করে সংবাদ পরিবেশনের ধারা। লক্ষ্য ছিল একটাই—বেশি কপি বিক্রি করা। সেই পুরোনো ধারা আজ আবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে এই ডিজিটাল যুগে। তবে এখন সংবাদপত্রের কপি নয়, প্রতিযোগিতা হচ্ছে ক্লিক আর ভিউ নিয়ে।
সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো সংবাদ পরিবেশনের পদ্ধতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। মানুষ আর অপেক্ষা করে না পরদিনের পত্রিকা বা রাতের সংবাদ বুলেটিনের জন্য। তারা তাৎক্ষণিক মোবাইল স্ক্রিনে জানতে চায় কী ঘটছে। এই দ্রুততার সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের বড় অংশ খবরের গভীরতা হারাচ্ছে। একটি ঘটনার সত্য যাচাইয়ের চেয়ে আগে প্রকাশ করা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান লক্ষ্য। কারণ, যত দ্রুত খবর ছাড়া যাবে, তত বেশি দর্শক টানা যাবে আর তত বেশি বিজ্ঞাপন আয় হবে।
ভিউ ব্যবসা যেন গণমাধ্যমের এক অদৃশ্য শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টাল—সবাই চাইছে এমন কনটেন্ট, যা মুহূর্তেই ভাইরাল হবে। এজন্য শিরোনামে বাড়াবাড়ি, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন ছবি ব্যবহার, কিংবা গুজবকেও সত্যের মতো উপস্থাপন করা এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দর্শক টানতে গিয়ে অনেক সময় মানবিকতার সীমা পর্যন্ত লঙ্ঘিত হচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থলে মানুষের সহায়তা করার বদলে ক্যামেরা চালানো, মৃতদেহের ছবি প্রকাশ কিংবা কারও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে বিনোদনের মতো পরিবেশন করা—সবই হচ্ছে হলুদ সাংবাদিকতা আর ভিউ ব্যবসার দৌড়ে টিকে থাকার কৌশল। এ প্রবণতা শুধু সংবাদকে অবিশ্বস্ত করছে না, বরং সমাজে ভয়ংকর প্রভাব ফেলছে। জনগণ আসল সমস্যার চেয়ে তুচ্ছ বা চটকদার বিষয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক দুর্নীতি, পরিবেশ ধ্বংস, শ্রমিক নিপীড়ন কিংবা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে। মানুষ ক্রমেই ভোগ করছে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা, কিন্তু হারাচ্ছে চিন্তার গভীরতা। ফলে সমাজে গণচিন্তা ও গণআলোচনার মানও নষ্ট হচ্ছে।
ভিউ ব্যবসা সাংবাদিকদেরও এক ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কে আগে খবর দেবে, কে বেশি ভিউ আনবে—এ নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। অথচ সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো সত্যকে যাচাই করে, নিরপেক্ষভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই নীতির জায়গায় এখন এসেছে বাজারের চাহিদা আর অ্যালগরিদমের খেলা।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে থেকেও গণমাধ্যমের একটি বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কারণ, এটি সত্য প্রকাশ করে, অন্যায়কে উন্মোচন করে এবং জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এ মাধ্যমকে ঘিরে আস্থাহীনতার বড় সংকট তৈরি হয়েছে। মানুষ প্রশ্ন করছে—গণমাধ্যম কি সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে, নাকি রাজনৈতিক ও করপোরেট স্বার্থের কাছে বন্দি হয়ে পড়েছে? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হলে আমাদের এর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। পাকিস্তান আমলে সংবাদপত্র ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। ভাষা আন্দোলনের সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় ও প্রতিবাদী রচনা জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংবাদপত্র হয়ে ওঠে মুক্তিকামী জনতার অস্ত্র। স্বাধীনতার পরও গণমাধ্যম নানা বাধার মধ্যেও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ধরে রাখে। সামরিক শাসনের কালো রাতে সাংবাদিকরা প্রায়ই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সত্যকে তুলে ধরেছেন। সেই সময় সংবাদপত্রের পাতায় প্রকাশিত একটি লেখা জাতীয় রাজনীতিকে নাড়া দিতে পারত।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর, যখন দেশে গণতন্ত্র ফিরে এলো, তখন গণমাধ্যমের চরিত্রে বড় পরিবর্তন ঘটল। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল শুরু হলো, বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রভাব বাড়ল, বিজ্ঞাপননির্ভর অর্থনীতি জোরালো হলো। এ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গণমাধ্যমের সামনে নতুন সম্ভাবনা যেমন তৈরি হলো, তেমনি নতুন সংকটও দেখা দিল। সংবাদ হয়ে গেল ব্যবসার অংশ, দর্শকসংখ্যা ও পাঠকসংখ্যা টিকিয়ে রাখার জন্য শুরু হলো প্রতিযোগিতা।
রাজনৈতিক প্রভাব এখানে একটি বড় ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন দল সবসময় চায় গণমাধ্যমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। সমালোচনামূলক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে সঙ্গে সঙ্গে আসে মামলা, হয়রানি বা বিজ্ঞাপন বন্ধের চাপ। বিপরীতে যারা সরকারের প্রশংসা করে, তাদের নানা সুবিধা দেওয়া হয়। এতে করে সংবাদ পরিবেশনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, পাঠক সত্য থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি করপোরেট প্রভাবও গণমাধ্যমকে দুর্বল করে তুলেছে। গণমাধ্যমের ভেতরের দুর্বলতাও উপেক্ষা করা যায় না। সাংবাদিকদের চাকরির অনিশ্চয়তা, কম বেতন, নিরাপত্তাহীনতা অনেককেই নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকতে দেয় না। অনেক সময় চাকরি রক্ষার তাগিদে কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে তারা আপস করতে বাধ্য হন। সম্পাদকীয় নীতিমালা দুর্বল হওয়ায় সংবাদ পরিবেশনের মানও কমে যাচ্ছে। ফলে জনগণের চোখে গণমাধ্যমের মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে।
গণমাধ্যমকে তার হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে, করপোরেট প্রভাব কমিয়ে পাঠকের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে আরও উৎসাহিত করতে হবে এবং ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
আজ যখন সামাজিক মাধ্যমের ভিড়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ছে, তখন মানুষের আরও বেশি করে দরকার সত্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য। গণমাধ্যম যদি সাহসীভাবে সত্য প্রকাশ করে, তবে মানুষ আবার তার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে। অন্ধকারের ভেতর আলো খুঁজে পাওয়ার মতোই, গণমাধ্যমের কাজ হলো জনগণকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তির ভিড় থেকে মুক্ত করে সত্যের আলো দেখানো।
নুসরাত রুষা
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়