মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার ও ডা. মালিহা খান মাজলিশ
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:০৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নগর স্বাস্থ্যসেবায় অচলাবস্থা কাটবে কবে

নগর স্বাস্থ্যসেবায় অচলাবস্থা কাটবে কবে

বাংলাদেশের সংবিধানে (১৯৭২, পরিমার্জিত) স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নয়, বরং নির্দেশনামূলক নীতিমালা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১৫(ক) ও ১৮(১)-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জনগণের পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন করা। যদিও স্বাস্থ্য নিয়ে সরাসরি সংবিধানে উল্লেখ নেই, তবে জনস্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তি হিসেবে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (UPHC) সার্বিক দায়ভার রাষ্ট্রের। নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব পালনের কাঠামো তৈরি হয়েছে বিভিন্ন আইন ও প্রশাসনিক বিধির মাধ্যমে। ব্যবসা বণ্টন বিধিমালা ১৯৯৬ (সংশোধিত ২০১৭)-এর অধীনে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নীতি ও হাসপাতাল, মেডিকেল শিক্ষা, জেলা ও উপজেলার অধীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা তদারক করে আর সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯ ও পৌরসভা অধ্যাদেশ ২০১০-এর ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ শহর ও পৌর প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি চালায়।

নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রকল্প (UPHCP-I) ১৯৯৮ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনে বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইউএনএফপিএ এবং নর্ডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ৬ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তায় শুরু হয়। দ্বিতীয় ধাপে (UPHCP-II, ২০০৫-২০১২) এটি বেড়ে দাঁড়ায় আটটি সিটি করপোরেশন ও সাতটি পৌরসভায়; নতুনভাবে যুক্ত হয় সুইডেন দূতাবাস ও যুক্তরাজ্যের ডিএফআইডির সহায়তা। বর্তমানে তৃতীয় ধাপের দ্বিতীয় পর্যায় (UPHCSDP-II, ২০১৮-২০২৫) ১১টি সিটি করপোরেশন ও ১৮টি পৌরসভার ৪৫টি পার্টনারশিপ এলাকা নিয়ে বিস্তৃত, যা বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকার অর্থায়নে ৪৫টি নগর মাতৃসদন (Comprehensive Reproductive Health Care Center), ১৬৭টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (Primary Health Care Center) ও ৩৩৪টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক নগরে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ১৯৯৮ সালে চালু করে ‘সবুজ ছাতা’ কর্মসূচি, যাতে নগর এলাকায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সহজলভ্য হয়। এনজিওগুলোর সহযোগিতায় এ কর্মসূচির অধীনে আন্তর্জাতিক সহায়তায় (ইউএনএফপিএ, ইউনেসকো, জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়) ৭৭ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর ‘সবুজ সাথী’ নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকায় গড়ে ওঠে ১৯টি নগর ডিসপেনসারি (urban dispensaries), বর্তমানে বেড়ে নগর ডিসপেনসারির সংখ্যা ৩৫টি। বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবা, টিকা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও সাধারণ রোগের চিকিৎসা পাওয়া যায় এসব কেন্দ্রে। এ ছাড়া নগরে আরও আছে ১৫৮ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ৩৪টি সমন্বিত কেন্দ্র (comprehensive centers), ৫৬টি টিবি_ডটস কেন্দ্র (DOTS centers), ৪৭টি স্বেচ্ছামূলক কাউন্সেলিং ও টেস্টিং কেন্দ্র (voluntary counseling and testing (VCT) centers), ৫২টি এইচআইভি/এইডস ক্লিনিক এবং প্রায় ৪ হাজার স্যাটেলাইট সেবাকেন্দ্র।

২০০৭ সালে ইউএসএআইডি (USAID) অর্থায়নে শুরু হয় বাংলাদেশ স্মাইলিং সান ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রোগ্রাম (Bangladesh Smiling Sun Franchise Program-BSSFP)। প্রায় ৫৭ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তায় এ কর্মসূচির আওতায় ২৬টি এনজিওর মাধ্যমে ৩২৩টি স্থায়ী ক্লিনিক, ৮ হাজার ৮০০টি স্যাটেলাইট ক্লিনিক ও ৬ হাজার কমিউনিটি সার্ভিস প্রোভাইডার চালু হয়। এ কর্মসূচির লক্ষ্য পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার পরিধি বিস্তৃত করা, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সুলভমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এবং দীর্ঘমেয়াদি এনজিওগুলোর টেকসই আর্থিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের জন্মের ৫৩ বছরে নানা উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে নগর স্বাস্থ্যসেবার চিত্র ভিন্ন। স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ভাগাভাগির ফলে দাতাদের সহায়তা প্রদানে জটিলতা সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল কাঠামো। প্রযুক্তিগত সমন্বয়ের অভাব, দাতাদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্য এবং দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা সব মিলিয়ে নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্থায়ী অচলাবস্থা।

গত ৫৩ বছরে মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য অসংখ্য কর্মশালা, গবেষণা হয়ে থাকলেও এ চ্যালেঞ্জ উত্তরণ সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে ২০১৭ অনুযায়ী, নগরের শিশুদের মাত্র ৫৫ শতাংশ নিয়মিত টিকা নেয়। প্রসূতি সেবার হার মাত্র ২৮.৭ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় টিকাদান ৮৫ শতাংশ হলেও নগরে পুরোপুরি টিকাপ্রাপ্ত শিশু ৭৯ শতাংশ, শূন্য-ডোজ ২.৪ শতাংশ এবং অপূর্ণ-টিকা ৯.৮ শতাংশ। ফলে টিকাদান ঘাটতি সবচেয়ে বেশি নগরেই, যা বর্তমান নগর স্বাস্থ্যসেবার করুণ চিত্র তুলে ধরে। অস্থায়ী বসতি বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান ভরসা এখনো অনানুষ্ঠানিক সেবা প্রদানকারীরা। ২০১৫ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, অস্থায়ী-বাসিন্দাদের মধ্যে ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ চিকিৎসা নেন অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে, যার মধ্যে শুধু ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান থেকে প্রায় ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নেন। অন্যদিকে মাত্র ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ সরকারি আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সেবা নিতে যায়। গবেষণায় জানা গেছে, অনানুষ্ঠানিক সেবা নেওয়ার পেছনে বাসস্থান থেকে দূরত্ব, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা, সেবা প্রদানকারীর ভালো ব্যবহার, কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া, দ্রুত সেবা পাওয়া এবং অপেক্ষার ঝামেলা না থাকা—এ নিয়ামকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ, যথেষ্ট উদ্যোগ ও পরিসংখ্যান থাকার পরও বাস্তবে নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো দুর্বল। নানা জটিলতা ও সমন্বয়ের অভাবে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে দুর্বল জনগোষ্ঠী।

লেখকদ্বয়: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১০

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১১

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১২

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৩

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৪

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৫

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৬

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৭

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৮

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৯

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

২০
X