

ফিলিস্তিন প্রশ্ন আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল ইস্যু। এর শেকড় নিহিত ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণায়, যেখানে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের বিভাজন প্রস্তাব পাস হলে আরব রাষ্ট্রগুলোর তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালে পশ্চিমা শক্তির প্রত্যক্ষ সহায়তায় ফিলিস্তিনি ভূ-খণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, শরণার্থী সংকট এবং দখলকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে ভেঙে দিয়েছে। গত সাত দশকে বহু যুদ্ধ, শান্তি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান হয়নি।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি ফিলিস্তিন প্রশ্নে নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। তার প্রথম মেয়াদে ইসরায়েলপন্থি নীতির মধ্যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর এবং বিতর্কিত ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি পরিকল্পনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি এই নীতি আরও আক্রমণাত্মকভাবে ফের শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না বরং ইসরায়েলকে নিরঙ্কুশ সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিচ্ছে। যদিও ওয়াশিংটনের নীতিতে পশ্চিমতীর সম্পূর্ণ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি, তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান একতরফাভাবে ইসরায়েলকেন্দ্রিক। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়েছে।
তবে এ অচলাবস্থার বিপরীতে ইউরোপীয় ও পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক ফিলিস্তিন স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন ধাপ উন্মোচন করেছে। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পরদিন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ একই ঘোষণা দেন। এর আগে স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, বেলজিয়ামসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এ স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ৮১ শতাংশ দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও বাস্তবে সীমান্ত ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের দখলেই রয়েছে, তবু এ স্বীকৃতিগুলো আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের পক্ষে এক শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপীয় কূটনীতিতে অন্যতম বড় পরিবর্তন এটি।
স্বীকৃতির এ ধারাবাহিকতার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রতিবাদের নতুন রূপ দেখা গেছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তৃতার সময় বাংলাদেশসহ বহু আরব, আফ্রিকান ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র সভা থেকে ওয়াক আউট করে। নেতানিয়াহু যখন গাজাকে শেষ করে দেওয়া এবং ফিলিস্তিন স্বীকৃতিকে সন্ত্রাসকে পুরস্কৃত করা হিসেবে অভিহিত করেন, তখনই দেশগুলো সরাসরি সভা ত্যাগ করে। এ প্রতিক্রিয়া কেবল কূটনৈতিক প্রতিবাদই নয় বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন এক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে এবং এটি ইসরায়েলবিরোধী ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের একটি সূচনাও বটে।
অন্যদিকে চলমান গাজা যুদ্ধ এ কূটনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশ নারী, শিশু ও শিক্ষার্থী। লক্ষাধিক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে, হাসপাতাল ও স্কুল ধ্বংস হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা, পানি ও খাদ্য সরবরাহ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশ কার্যকর হচ্ছে না, কারণ ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে ঐকমত্য নেই। এ মানবিক বিপর্যয় এখন কেবল আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে চীন ও রাশিয়া নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে। রাশিয়া বহু আগেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে চীন দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তা বাড়িয়েছে। এভাবে তারা মুসলিম বিশ্বের জনমত নিজেদের দিকে টানতে চাইছে। ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন চীন-রাশিয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মেরূকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক জোটকেও প্রভাবিত করবে।
তবে দুঃখজনক, আরব বিশ্বের ঐক্য এখনো দুর্বল। মিশর, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এরই মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে। সৌদি আরবও সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনায় ছিল, যদিও সাম্প্রতিক আগ্রাসনে সেই প্রক্রিয়া স্থগিত রয়েছে। সাধারণ আরব জনগণ ফিলিস্তিনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিলেও শাসকগোষ্ঠীর কূটনৈতিক নির্ভরশীলতা বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছে। এ বৈপরীত্যই ফিলিস্তিন সংকটে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
তবে সব মিলিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সংকট নয় বরং বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা নীতি, ইউরোপীয় স্বীকৃতির ঢেউ, জাতিসংঘে ওয়াক আউট কূটনীতি এবং চীন-রাশিয়ার সক্রিয় অবস্থান মিলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণ তৈরি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে চীন-রাশিয়া, মুসলিম বিশ্ব ও গ্লোবাল সাউথ তথা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। এর প্রভাব পড়ছে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নয় বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও। ভবিষ্যতে এ সংকট কোনদিকে যাবে, তা নির্ভর করবে আরব বিশ্বের ঐক্য, পশ্চিমা জনমতের চাপ এবং ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক ভূমিকার ওপর। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ফিলিস্তিন প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতি এগোতে পারবে না। এটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির নতুন মানচিত্র অঙ্কন করছে এবং মানবাধিকারের পক্ষেও এক শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে।
মো. শাহিন আলম, শিক্ষার্থী
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়