

কয়েক দিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘সেফ এক্সিট’। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এনসিপির আহ্বায়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের একটি মন্তব্যে এর সূত্রপাত। তিনি বলেছেন, ‘উপদেষ্টা পরিষদের অনেককেই বিশ্বাস করাটা ছিল বড় ভুল। তাদের প্রতি আস্থা রেখে প্রতারিত হতে হয়েছে। উপদেষ্টারা অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে ফেলেছেন। তারা নিজেদের সেফ এক্সিটের কথা ভাবছেন।’ নাহিদ ইসলামের পর এনসিপির আরেক সংগঠক সারজিস আলমের মন্তব্য বিষয়টি আরও উসকে দিয়েছে। ৭ অক্টোবর তিনি নওগাঁয় এনসিপির এক সমন্বয় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘কিছু উপদেষ্টার মধ্যে দেখা যাচ্ছে, তারা কোনোভাবে দায়সারা দায়িত্ব পালন করেন—নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক্সিট নিতে পারলেই হলো। যারা এ ধরনের চিন্তা করেন, তাদের জন্য মৃত্যু ছাড়া সেফ এক্সিটে নাই।’ এর পরদিন সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের প্রতি একরকম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কোন কোন উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করে সেফ এক্সিট নিতে চান, তা নাহিদ ইসলামকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের কাদের বিশ্বাস করা ভুল ছিল বা কাদের প্রতি আস্থা রেখে কী ধরনের প্রতারণার শিকার তারা হয়েছেন, নাহিদ ইসলাম তা স্পষ্ট করেননি। সংগত কারণেই তার মন্তব্য জনমনে ঔৎসুক্যের সৃষ্টি করেছে। কেননা, তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং যাদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন তারা তার সাবেক কলিগ। ফলে জনমনে এ ধারণা জন্মেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে হয়তো কোনো ইস্যুতে এনসিপি সংগঠকদের মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে অথবা সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা অবস্থান তাদের মনঃপূত হয়নি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অন্তর্বর্তী সরকারের ‘কিছু উপদেষ্টার সেফ এক্সিট’ নেওয়ার চেষ্টার কথা উঠল কেন? এ সরকারের গঠন এবং অদ্যাবধি তাদের দায়িত্ব পালনের মধ্যে এ ধরনের প্রশ্ন ওঠা অবকাশ থাকার কথা নয়। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে এ সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল। তাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করা; যে নির্বাচন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য। যদিও এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় আসেনি, তবে বলা যায়, শ্লথ গতিতে হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সে দায়িত্ব পালনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে রোডম্যাপ সরকার দিয়েছে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তা গ্রহণ করেছে। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের বিলুপ্তি ঘটবে। তখন এ সরকারের সবাই নিরাপদে যে যার বাড়িতে ফিরে যাবেন। এ অবস্থায় নাহিদ-সারজিসরা কেন কয়েকজন উপদেষ্টার সেফ এক্সিট-চিন্তার কথা ছড়িয়ে দিলেন, বোঝা যাচ্ছে না। তাদের এ মন্তব্যের বিপরীতে রিজওয়ানা হাসান ছাড়া এ পর্যন্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। গত ৯ অক্টোবর ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘উপদেষ্টা হিসেবে নিজের সীমিত সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছি। তাই আজ ৭২ প্লাস বছর বয়সে আমাকে যদি সেফ এক্সিটের কথা ভাবতে হয়, তা হবে গভীর দুঃখের বিষয়।’ বোঝাই যাচ্ছে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান তার সাবেক সহকর্মী নাহিদ ইসলামের মন্তব্য সহজভাবে নিতে পারেননি। শুধু তিনি কেন, আমার ধারণা উপদেষ্টাদের কেউই হয়তো নাহিদ-সারজিসের কথা হজম করতে পারছেন না। তবে তাদের অনেকেই ‘কিল খেয়ে কিল হজম’ করার মতো দাঁতে দাঁত চেপে বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এ হজম করাটা কারও কারও কাছে হবে নিয়োগদাতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। কেননা, উপদেষ্টা-প্রধান যখন নিজেই নাহিদ-সারজিসদের তার নিয়োগদাতা বলে ঘোষণা করেছেন, তখন তার পারিষদবর্গ তো আর তার বাইরে নন।
প্রশ্ন উঠেছে, কী এমন ঘটল যে এনসিপির সংগঠকদের কাছে মনে হলো কতিপয় উপদেষ্টা তলে তলে নিরাপদে সরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন? রাজনীতির অন্দরমহলের খোঁজখবর রাখেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ও এনসিপির মধ্যে এরই মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। এ টানাপোড়েন সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর চেষ্টার কারণে। তারা সরকারের রুটিন কাজের বাইরে নাকি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশীদার হতে চাচ্ছেন না। তারা দ্রুত একটি নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে। তাদেরই আগ্রহে, অনেকটা চাপে ড. ইউনূস আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এনসিপি ও তাদের পথনির্দেশক দল জামায়াতে ইসলামী তা চাচ্ছে না। তারা চাচ্ছে যে কোনো অজুহাতে নির্বাচন কমপক্ষে এক বছর পিছিয়ে দিতে। কিন্তু ওই উপদেষ্টারা প্রধান উপদেষ্টাকে বুঝিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্রমেই সমালোচিত হচ্ছে, নানা কারণে মানুষ বিরক্ত হচ্ছে। আর অধিককাল ক্ষমতা ধরে রাখা ঠিক হবে না। এরপর থেকেই এনসিপি-অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব কলহ চলছে।
আরও কয়েকটি কারণে এনসিপি ড. ইউনূসের ওপর নাখোশ। সেগুলোর মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার ইস্যু অন্যতম। এনসিপি যেভাবে এ কথিত সংস্কার চেয়েছিল এবং ড. ইউনূসও প্রথমদিকে যেভাবে তা বলেছিলেন, অবস্থা এখন সেভাবে নেই। বিশেষত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক নাম পরিবর্তন, বিদ্যমান সংবিধান বাতিল করে নতুন করে লেখা এবং সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে (পিআর) জাতীয় সংসদ নির্বাচন, কোনোটিই এনসিপির প্রেসক্রিপশন মোতাবেক হচ্ছে না। বরং প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অভিমত প্রাধান্য পাওয়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একক কৃতিত্বের দাবিদার এনসিপি প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ। তবে তারা প্রধান উপদেষ্টার ওপর নাখোশ হলেও সংগত কারণেই তা প্রকাশ করছে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি এনসিপির অসন্তুষ্টির কারণ আরও রয়েছে। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে নিজেদের পছন্দের কাউকে বসাতে। একই সঙ্গে বর্তমান সেনাপ্রধানকেও অপসারণের দাবি ছিল তাদের। কিন্তু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে অন্তর্বর্তী সরকার দুটির একটিতেও হাত দেয়নি। ফলে এনসিপির সংগঠকদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তাদের ধনুক থেকে তীর বেরিয়ে গেছে এবং তা লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। তা ছাড়া গত জুনে লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠক ও সেখানে যৌথ বিবৃতিতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা এনসিপি সংগঠকদের হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। সে হতাশার কথা তারা চেপে রাখেননি। ‘প্রধান উপদেষ্টা লন্ডনে গিয়ে সেজদা দিয়ে এসেছেন’ বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে কটাক্ষ করা হয়েছে। এতদিনের চেপে রাখা ক্ষোভ এখন বেরিয়ে আসছে।
এখন কথা হলো, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বা এর কয়েকজন উপদেষ্টাকে সেফ এক্সিট খুঁজতে হবে কেন? তারা কি এমন কোনো অপকর্মে জড়িয়েছেন যে, সহজ-স্বাভাবিক পথে বের হয়ে যেতে পারবেন না? নাকি নাহিদ-সারজিসদের কাছে এমন কোনো তথ্য রয়েছে, যা দিয়ে ওইসব উপদেষ্টার থলের বিড়াল বের করে দেওয়া যাবে? অনেকের ধারণা, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী এনসিপি সংগঠকরা উচ্চাভিলাষের জালে আটকা পড়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েই চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা নিজেরাই সেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। অপরিপক্বতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্বন্ধে অনভিজ্ঞতা তাদের এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন ব্যাপার।
অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রগামী সৈনিক হিসেবে ফ্যাসিবাদী শাসনের কবল থেকে মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষের কাছে তাদের আসন ছিল সুউচ্চে। কিন্তু নিজেরাই সে আসন থেকে নিজেদের নামিয়ে এনেছেন ভূতলে। রাজনৈতিক বিষয়ে অতিমাত্রায় খবরদারি ও অন্তর্বর্তী সরকারকে হাতের পুতুল বানানোর কসরতে তারা অল্পদিনেই দেশবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েন। সে পরিপ্রেক্ষিতে যে আশা নিয়ে তারা রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন, জনগণের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় তা হতাশায় পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ এ প্রশ্নও তুলেছেন, নাহিদ-সারজিস-হাসনাতরা কারও গোপন অভিলাষের গবেষণার গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হলেন কি না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইরে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের চেষ্টা অনেক দিন থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছিল। ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সুযোগে খালেদা জিয়া-শেখ হাসিনাকে মাইনাস করে একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে তদস্থলে প্রতিস্থাপনের চেষ্টার কথা কারও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তবে মাঠে নেমে কঠিন বাস্তবতা অনুধাবন করে দেশবাসীর উদ্দেশে খোলা চিঠির হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে সে অভিলাষ পরিত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন রাজনীতির সেই শৌখিন খেলোয়াড়। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর কারও পুরোনো সে তৃষ্ণা জেগে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির সুযোগে নিজেদের তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বাসনা জাগতেই পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, খেলোয়াড় হিসেবে যাদের মাঠে নামানো হয়েছিল, তারা সুবিধা করতে পারছেন না। ফলে এবারের প্রজেক্টও বিফল হতে বসেছে। এ অবস্থায় মাঠে নামা অনভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা তাদের কোচের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হওয়াটা স্বাভাবিক। যেহেতু মূল কোচের বিরুদ্ধে কিছু বলাটা সমীচীন নয়, তাই তার সহচরদের বিরুদ্ধে বাক্যগোলা বর্ষণ করে মনের খেদ মেটাচ্ছেন এনসিপি সংগঠকরা!
গ্রামাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে মাছ মারার এক ধরনের ফাঁদ পাতা হয়—দোয়াইর বা চাঁই নামে। এগুলোর গঠনপ্রণালি এমন যে, মাছ যেদিক দিয়ে প্রবেশ করে সেদিক দিয়ে আর বের হতে পারে না। উল্টো দিকের ঢাকনা খুলে আটকেপড়া মাছ তুলে নেয় শিকারিরা। অন্তর্বর্তী সরকার, এর উপদেষ্টাবৃন্দ কিংবা এনসিপি কি সেরকম কোনো চাঁইয়ে আটকে গেছে? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে উল্টো দিকের ঢাকনা খুলে তাদের বের করে আনবে কে বা কারা?
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক