

গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে রাসায়নিক কারখানায় লাগা আগুন পার্শ্ববর্তী পোশাক-প্রিন্টিং কারখানায় ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয় এবং অগ্নিদগ্ধ হয়ে আরও তিনজন হাসপাতালে ভর্তি হন। ধারণা করা হচ্ছে, নিহত ও আহতদের সবাই শ্রমিক।
রাজধানী ও এর সন্নিহিত এলাকায় রাসায়নিকের গুদামে, পোশাক কারখানায় ও অনুরূপ অন্যান্য অসতর্ক স্থাপনায় আগুন লেগে বিশাল সংখ্যায় হতাহত হওয়ার ঘটনা এখন অনেকটাই নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সাধারণ মানুষের কাছেও এটি অনেকটাই গা-সওয়া হয়ে গেছে, বিশেষ করে শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি। অবশ্য এরূপ গা-সওয়া হয়ে যাওয়ার পরও একসঙ্গে অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটলে সমাজে সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যূনতম কিছু মানবিক প্রতিক্রিয়া তো হয়ই। তবে সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সেটিও যেন অনেকটা ধনী ও গরিবের মধ্যে বিভাজিত হয়ে পড়েছে। এসব মৃত্যু নিয়ে রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষ এখন যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ধনী-দরিদ্র ভেদে উৎকট মাত্রার অমানবিক নিষ্ঠুর বৈষম্য। সমাজ ও রাষ্ট্রের পরতে পরতে সম্পদ ও তার বণ্টনের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য ক্রমেই প্রকট থেকে প্রকটতর আকার ধারণ করছে, তা এখন অনিবার্যভাবে মানুষের দৈনন্দিন বোধ, অনুভূতি ও আচরণকেও প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত ও আক্রান্ত করে ফেলেছে। মৃত ব্যক্তি বিত্তবান হলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বশীলরা যেভাবে শোকাহত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন, তার ছিটেফোঁটাও ঘটে না মৃতব্যক্তি যদি দরিদ্র হন তাহলে। এমনকি দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যকার একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যেও এ প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে।
ধনী ও দরিদ্র ভেদে তার প্রতি রাষ্ট্রের আচরণিক পার্থক্য পৃথিবীতে রাষ্ট্রের উৎপত্তির পর থেকে সবকালেই ছিল। কিন্তু সে বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনকেও এভাবে কদর্য ও বিকৃত করে ফেলার ঘটনা বোধকরি খুবই সাম্প্রতিক, যা এখন বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং এমনটি কেন ঘটছে, তা নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা হওয়া উচিত বলে মনে করি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে শিয়ালবাড়ির অগ্নিদুর্ঘটনার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের আরও দু-একটি দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করি। এখন থেকে মাত্র তিন মাসেরও কম সময় আগে গত ২১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনাকবলিত অবস্থায় উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের ওপর ভূপতিত হলে এতে ৩৫ জন প্রাণ হারায়, যাদের অধিকাংশই ছিল বিদ্যালয়ের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী। এরকম অল্পবয়সী শিক্ষার্থীদের এরূপ করুণ মৃত্যুর বিষয়টি নিঃসন্দেহে সর্বস্তরের মানুষের মনকে স্পর্শ করেছিল, যা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সমাজের অন্যান্য স্তরের মানুষের মধ্যেও প্রবলভাবে লক্ষ্য করা গেছে।
রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে দৃশ্যত সংবেদনশীল আচরণ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য একাধিক উপদেষ্টা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সমাজের অন্যান্য পরিচিতজন মাইলস্টোন দুর্ঘটনা নিয়ে শোকপ্রকাশ করে বিবৃতি দেন। ঘটনার স্মরণে পরদিন অর্থাৎ ২২ জুলাই রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। উপদেষ্টাদের কেউ কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় রাষ্ট্র, সমাজ ও সমাজের সাধারণ জনগণ যে ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল, শিয়ালবাড়ির অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তার ছিটেফোঁটাও ঘটতে দেখা গেল না কেন? মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় যেসব উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ব্যক্তিত্ব, গণমাধ্যম ও অন্যরা ঘটনাস্থলকে ভিড়ময় করে তুললেন, শিয়ালবাড়ির দুর্ঘটনায় তাদের প্রায় কারোরই উপস্থিতি চোখে পড়ল না কেন? (প্রশ্নটি মাইলস্টোন দুর্ঘটনার হতাহতদের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি রেখেই উত্থাপিত)। প্রধান উপদেষ্টা ছাড়া এ বিষয়ে কেউ কোনো বিবৃতিও দিলেন না। এমনকি গণমাধ্যমের প্রতিবেদক বা টেলিভিশনের ক্যামেরাকেও ওইভাবে সরব হতে দেখা গেল না, যেমনটি মাইলস্টোনে দেখা গেছে। মাইলস্টোন দুর্ঘটনার পর ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর সরব অংশীদারদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছিল, এ দেশের জনগণের চেয়ে অধিক মানবিক সহানুভূতিসম্পন্ন মানুষ বোধহয় এ পৃথিবীতে আসলেই কম আছে। কিন্তু শিয়ালবাড়িতে ১৬ শ্রমিকের যন্ত্রণাদায়ক নির্মম মৃত্যুর পর যখন উপরোক্তদের কারও নাম-নিশানাও খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, এদের অধিকাংশরাই এখন নিজ নিজ স্বার্থ ও ধান্ধা নিয়ে ব্যস্ত।
শিয়ালবাড়ি অগ্নিকাণ্ডের পরদিন ঐকমত্য কমিশনের বিশাল সভা হলো, যেখানে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকার ও দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ নয় এরূপ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও উপস্থিতি ছিলেন। সে সভায় খুব স্বাভাবিকভাবেই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ শ্রমিকের স্মরণে একটি শোকপ্রস্তাব আনা যেত, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা যেত এবং এ দুর্ঘটনার বিষয়ে সংক্ষেপে হলেও কিছু প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা যেত। কিন্তু এর কোনোকিছুই সেখানে হয়নি। অথচ সেখানে যা হয়েছে, তা দিয়ে তারা নাকি জনগণের কল্যাণ করবেন! এর বাইরেও প্রশ্ন: এতগুলো অভাবী প্রাণ একসঙ্গে ঝরে গেল, যাদের উপার্জনে তাদের সংসারের অন্ন জোগাড় হতো। এ সংসারগুলো তাহলে কীভাবে চলবে? এদের মৃত্যু-উত্তর এ দুঃসময়ে রাষ্ট্র কীভাবে তাদের পাশে দাঁড়াবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কেউই তো কিছু বললেন না? এতবড় অগ্নিকাণ্ড, অথচ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এর ধারেকাছে দিয়েও গেলেন না। শ্রম উপদেষ্টাকে মানুষজন তুলনামূলকভাবে কিছুটা হলেও দায়িত্বশীল ভাবে। কিন্তু এতজন শ্রমিকের মৃত্যুর পর তারও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না। বিজিএমই তো এ বিষয়ে বোধগম্য কারণেই নিশ্চুপ।
আসলে সমাজের প্রায় সবকিছুই এখন নির্ধারিত হয় বিত্তের মাপকাঠিতে—এমনকি মৃত্যুও। সমস্যা হচ্ছে, শ্রেণি-গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত রাষ্ট্রের পরিচালকরা সেদিকে না তাকাতেই পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষও কীভাবে একই স্রোতে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন—সেটাই এখন প্রশ্ন এবং একটি বড় উদ্বেগেরও বিষয়। তাহলে কি শ্রেণিস্বার্থের দ্বন্দ্বে জনগণের মধ্যকার একটি বড় সুবিধাবাদী অংশ এরই মধ্যে লুটপাটকারী শ্রেণির সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়েছে? ধারণা করি, বস্তুগতভাবে তা না হলেও চিন্তায় ও আকাঙ্ক্ষায় সেটি এরই মধ্যে তারা ঘটিয়ে ফেলেছেন। আর সত্যি সত্যি যদি সেটিই হয়ে থাকে, তাহলে আশঙ্কা হয়, শ্রমিকের অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ সামনের দিনগুলোতে যতই বাড়ুক, রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না। এ অবস্থায় একটিই আহ্বান, চলুন এ দুঃসময়ের হাত থেকে আত্মরক্ষার প্রয়োজনে সব ধরনের লোভ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হই।
লেখক: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি এবং সাবেক পরিচালক, বিসিক