

সহিংসতা ঘটাতে চট্টগ্রামের মতো অস্ত্র জরুরি নয়। তা বিনা অস্ত্রে হাতে করা যায়। মুখেও সম্ভব। আর সশস্ত্রে করলে সেটাতে আওয়াজ বেশি হয়। তবে, শেষতক বড় সমস্যা হচ্ছে না। চট্টগ্রামে প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ বা একজন বাবলা নিহতের ঘটনার হোতারা নিরাপদেই দিন গুজরান করছে। কয়েকটা দিন একটু সরে সরে থাকলে ল্যাঠা চুকে যাবে—সেই আশা তারা রাখতেই পারে। বুধবার রাতের ওই ঘটনার পর চট্টগ্রামের একই জায়গায় বৃহস্পতিবার রাতে অটোচালক ইদ্রিসকে টার্গেট করে দুই পায়ে গুলি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় কৃষক দল নেতা শাহাদাত হোসেনের আগ্নেয়াস্ত্র লাগেনি। সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া কয়েক সাংবাদিককে খালি হাতেই মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছেন। ভাইরাল হওয়া সেই ফুটেজে দেখা গেছে, তার হাতের জোর ও কিল-কনুইর আলাদা এক স্টাইল।
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় তো হাতও তেমন খাটাতে হয়নি। রাতের অপেক্ষা করতে হয়নি। দিনদুপুরে কয়েকটা থাপ্পড়ের পর গ্যাসলাইটেই কাজ সারিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষক মাসুম বিল্লাহর পাঞ্জাবিতে একটু আগুন ধরিয়ে দিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৭০০ টাকা। মাদ্রাসার অক্টোবর মাসের বেতনের চেক নিয়ে কেন্দুয়া অগ্রণী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ। পথে দুটি মোটরসাইকেল আরোহী তাকে আটকায়। মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলের চাবি ছিনিয়ে নেয়। তা দিতে মোচড়ামুচড়ি করায় তারা তাকে মারধর করে গ্যাসলাইটার দিয়ে পাঞ্জাবিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পকেটে থাকা ২ লাখ ৩ হাজার ৭০০ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত আঠারবাড়ীর দিকে পালিয়ে যায়। চিৎকার করে কারও সহযোগিতা বা নজর কাড়তে পারেননি মাসুম বিল্লাহ।
রাজধানীর বনানীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতা ও জুলাই আন্দোলনকারী আব্দুর রহমান রাকিবকে শায়েস্তা করতেও আগ্নেয়াস্ত্র লাগেনি। দেশীয় ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে চলে গেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। এ ঘটনাও দিনদুপুরে। বুধবার দুপুরে বনানী কড়াইলের এরশাদ মাঠ এলাকায় তার বাসায় স্থানীয় কিশোর গ্যাং সদস্য রাব্বি, পিচ্চি শাকিল, তামিম, আলাউদ্দিন আলো ও নকীব হামলা চালায়। কোপায় চাপাতি দিয়ে। আঘাতদৃষ্টে অঘটনের মাত্রা কমই বলা যায়। তার হাতের একটি আঙুল বিচ্ছিন্ন হয়েছে আর শরীরের কয়েক জায়গায় কিছু কোপ পড়েছে। তবে, যাওয়ার সময় হামলাকারীরা বলে গেছে—পরে জান নিয়ে নেবে। খালি হাতে ফিরবে না। জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে গাইবান্ধা পলাশবাড়ীর এক বড় ভাই তো মাইকিং করেই ঘোষণা দিয়েছেন ছোট ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করার। বৃহস্পতিবার সকালে রিকশায় করে গোটা গ্রামে মাইক দিয়ে ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, শুক্রবার (৭ নভেম্বর) জুমার নামাজের পর নিজেদের পানের বরজ এলাকায় ছোট ভাই হাবিজার সঙ্গে আচ্ছা মারামারি করবেন। তবে, মারামারিতে আইটেম কী থাকবে, মানে কী ব্যবহার হবে তা বলেননি। ব্যাপারটি স্যোশাল মিডিয়ায় বেশ ভাইরাল হয়।
পুলিশি হস্তক্ষেপে ঘটনা মারামারি পর্যন্ত গড়ায়নি। এসব ঘটনা গত কয়েক দিনের বিচ্ছিন্ন বা খণ্ড চিত্র। সব ঘটনার সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক নেই। আবার একেবারে যে নেই তাও বলা যায় না। কারণ, নির্বাচন কারও কারও জন্য বিশেষ বিশেষ কাজ সারানোর একটি মৌসুম। এ চক্র এতে হিলিক বোধ করে। পুলক পায়। এমনিতে যথারীতি নির্বাচনের সময় যত এগিয়ে আসছে, মাঠ তত চড়ছে। এ চড়া-কড়া তাপে এরই মধ্যে ১১ জনের পরিচয় হয়ে গেছে লাশ বা মরহুম। বিএনপির দলীয় প্রার্থী ঘোষণার মাত্র দুদিনের মাথায় চট্টগ্রাম নগরীর হামজারবাগ এলাকায় গত বুধবার চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিতে নিহত হয়েছেন আলোচিত ‘সন্ত্রাসী’ সরওয়ার হোসেন বাবলা। একই দিন রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রামের রাউজানে বিএনপির দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন গুলিবিদ্ধসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-৮ আসনের ঘটনাকে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট না বলে বিবদমান দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে দায়ী করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের ঘটনা হুট করে বা তাৎক্ষণিক নয়। টার্গেট করা ঘটনা। টার্গেট কিলিং বা ঘটনা রোখা বলতে গেলে অসম্ভব। কে কাকে মারবে-ধরবে সেটা পুলিশের পক্ষে জানাও সম্ভব নয়। যিনি শিকার হব বা হবেন, তিনিও সবসময় জানেন না। অনিবার্য় কারণে সরকারের এখন সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দিয়ে গেছে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক অস্ত্র লুট হয়েছে। গত বছর ৫ আগস্ট পুলিশের স্থাপনা থেকে লুণ্ঠিত এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ কে কোথায় কোন কাজে ব্যবহার করছে, কে জানে?
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সারা দেশে মাঠ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে তাগাদা দিয়েই আসছেন। লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের বিষয়ে তথ্যের বিনিময়ে বড় অঙ্কের পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। লুণ্ঠিত এলএমজির সন্ধান দিলে ৫ লাখ, এসএমজির সন্ধান দিলে দেড় লাখ, চায়না রাইফেলের সন্ধান দিলে এক লাখ এবং পিস্তল ও শটগানের সন্ধান দিলে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রকৃত সন্ধানদাতা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে পারবেন এবং সন্ধানদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তথ্য দিয়ে সহায়তার আহ্বান জানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা তৎপরতা ও অভিযান বাড়ানোর কথাও জানানো হয় তখন। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর—এ তিন মাসে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র, অন্তত এক হাজার গুলি, গ্রেনেড ও বিস্ফোরকসামগ্রী উদ্ধার করা হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বেশ সন্তুষ্ট। বলছেন, এটি চলমান প্রক্রিয়া। ধীরে ধীরে সব অস্ত্রই উদ্ধার হয়ে যাবে বলে আশাবাদী তিনি। সেনা সদরের সর্বশেষ ব্রিফিংয়েও আশাবাদের তথ্য দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৫ মাস ধরে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত। এর পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারে এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করছে। হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রের ৮১ শতাংশ এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে। গোলাবারুদ (হারিয়ে যাওয়া) উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে ৭৩ শতাংশ। এ ছাড়া ১৯ হাজারের বেশি অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের স্থাপনাগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ১৩ হাজার ১৫৮টি গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে গত ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২১টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩ লাখ ৬৯ হাজার ১৮৪টি গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। বাকি আগ্নেয়াস্ত্র এবং গোলাবারুদ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরও উদ্বিগ্ন। নির্বাচন ঘিরে কে কোথায় এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদের অপব্যবহার করবে, ব্যবহারকারী ছাড়া আর কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এ ছাড়া দেশের বাইরে থেকে অবৈধ অস্ত্র আমদানির কথাও শোনা যাচ্ছে।
রাজধানীর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে সেনা অভিযানে ট্রেনের বগি থেকে ৮টি বিদেশি পিস্তল, ১৬টি ম্যাগাজিন, ২৬ রাউন্ড গুলি, প্রায় আড়াই কেজি গান পাউডার এবং সোয়া দুই কেজি প্লাস্টিক বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনা রীতিমতো পিলে চমকানো। তার ওপর নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময় থেকে যে সহিংস নমুনা দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন-পরবর্তীকালে তা কোথায় গড়াতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী মনোনয়ন ও প্রচারণা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। সেখানে সহিংসতার ঘটনা বাজে বার্তা দিচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনই কমবেশি সহিংসতার সাক্ষী হয়েছে। তপশিল ঘোষণার আগে ও পরে, মনোনয়নপত্র দাখিল, প্রতীক বরাদ্দ, প্রচারণার সময়, ভোটগ্রহণের সময় ক্রমে সহিংসতা বাড়ে।
ভোটের পরও এর রেশ থেকে যায়। প্রতিপক্ষের অফিস ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর হামলা, বোমাবাজি এবং মারামারির ঘটনা সাধারণ ব্যাপার। নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান, ভোটগ্রহণে বাধা দেওয়া, পোলিং এজেন্টদের ওপর হামলা এবং প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গেও সংঘাতের দৃষ্টান্ত আছে। রয়েছে ফল ঘোষণার পর বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, পরাজিত প্রার্থীর বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও। তাই বলে এবার বা আগামীতেও ঘটবে? না, তা কাম্য নয়। দেশ তো নতুন বন্দোবস্তের অপেক্ষমাণ। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। মানুষ কমবেশি সেই স্বপ্ন গিলেছেও। আক্ষেপ এবং প্রশ্ন তো এ কারণেই। ফ্যাসিস্টের বিদায়ের পরও কেন থাকবে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা? এখনকার মাঠের দলগুলোর সবাই সবার চেনা। তারপরও কেন পারস্পরিক অবিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা? ক্ষমতার একচ্ছত্র দখলের প্রবণতা?
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন