

স্বৈরশাসকদের শেষ পরিণতি হয় নির্মম। ইতিহাস তাই বলে। নৃশংস স্বৈরাচাররা শেষ পর্যন্ত নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, কাপুরুষের মতো দেশ থেকে পালিয়েছেন, নির্বাসিত জীবনে উদ্বাস্তুর মতো মৃত্যুবরণ করেছেন, অথবা দেশে কিংবা বিদেশে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণের অভাব নেই। এই যেমন ধরুন ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির কথা। যে মানুষটি একসময় গর্বভরে বলেছিলেন যে, ফ্যাসিবাদই ইতালির ভবিষ্যৎ। কিন্তু দেশজুড়ে গেরিলা আর মিত্রশক্তির সৈন্যরা একে একে দখল নেয় তার সাম্রাজ্য। মুসোলিনি তখন একদল অনুসারীসহ সুইজারল্যান্ডে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। শরীর ক্লান্ত, চোখে ভয়, কিন্তু মুখে তখনো সেই স্বৈরাচারীর ভান। তিনি জার্মান সেনাদের কনভয়ে পালানোর পরিকল্পনা করেন। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে জার্মান কোট পরা, টুপির আড়ালে মুখ লুকানো। দোঙ্গো নামের ছোট্ট একটি গ্রামে একদল ইতালিয়ান পার্টিজান জার্মান ট্রাক থামায়। তারা প্রথমে মুসোলিনিকে চিনতেই পারেনি। কিন্তু একসময় সেই মুখ, সেই পরিচিত দৃষ্টি আর লুকানো গেল না সত্য—‘তুমি মুসোলিনি!’ শুষ্ক বাতাসে শব্দটি গর্জে ওঠে। তাকে আটক করা হয়। এক নির্জন গ্রামে একটি বাড়ির দেয়ালের সামনে দাঁড় করানো হয় মুসোলিনিকে এবং তার প্রেমিকা ক্লারা পেতাচ্চিকে। পাহাড়ি বাতাসে গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। মুসোলিনি যুগের ইতি ঘটে।
কিন্তু নাটক এখানেই শেষ নয়, তাদের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিলানের লোরেতো স্কয়ারে। জনতার ভিড় সেখানে উত্তাল সমুদ্রের মতো। কেউ থুতু দিচ্ছে, কেউ লাথি মারছে, অনেকেই সেই মানুষটির ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে, যার শাসনে তারা বছরের পর বছর ভয়ে কাটিয়েছে। মানুষ তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখে, যাতে পুরো ইতালি দেখে, এক স্বৈরশাসকের শেষ পরিণতি কেমন হয়। একসময় যে মুসোলিনি নিজেকে ‘রোমান সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম’ ভাবতেন, তার সেই অহংকার গুঁড়িয়ে যায় মিলানের রাস্তায় জনতার ক্ষোভের ঢেউয়ে। এ কাহিনি ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের। এরপর এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে আমরা স্বৈরশাসকদের করুণ পরিণতি বরণ করতে দেখেছি।
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে আফ্রিকার দেশ শাদের প্রেসিডেন্ট হিসেন হাব্রেকে তার সাম্রাজ্য ছেড়ে পালানোর ইতিহাস আমরা জানি। বছরের পর বছর ধরে তার ভয়ংকর গোপন পুলিশ হাজারো মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করেছে। এমন অভিযোগে দেশ উত্তাল ছিল। বিদ্রোহীরা রাজধানীতে ঢুকে পড়তেই হাব্রে বুঝলেন সময় ফুরিয়ে গেছে। তিনি দ্রুত একটি কনভয় নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সেনেগালের দিকে রওনা দিলেন। সেখানেই শুরু হয় তার দীর্ঘ পলাতক জীবন। সৈন্য-প্রহরায় ঘেরা বিশাল প্রাসাদে তিনি থাকতেন, যেন অতীতের কোনো রাজা নির্বাসনে।
কিন্তু একদিন শাদের মানুষদের আর্তনাদ পৃথিবীর কানে পৌঁছে গেল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বছরের পর বছর প্রমাণ সংগ্রহ করল। অবশেষে সেনেগাল সম্মত হলো, একটি বিশেষ আফ্রিকান আদালত বসবে। ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনটিতে, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন হাব্রে। তার মুখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, কিন্তু সাক্ষীদের গলার কাঁপনে, কান্নায় আদালত ভারী হয়ে উঠেছিল। রায় হলো, আজীবন কারাদণ্ড। এটাই ছিল আফ্রিকার মাটিতে প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধের ঐতিহাসিক বিচার।
অতএব আমাদের শাসকশ্রেণিকে মনে রাখতে হবে, ভয়ের সংস্কৃতিতে গড়া ক্ষমতা ভেঙে পড়ে খুব সহজেই। মুসোলিনি, হিটলার, পিনোশে, ফুজিমোরি, হাব্রে কিংবা হাসিনার গল্প তাই শুধু স্বৈরশাসকের পতন নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের অদম্য চেতনার গল্প, যা শেষ পর্যন্ত অত্যাচারের শিকল ভেঙে ফেলে।