মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৯:১১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সম্পাদকীয়

শাসকশ্রেণির জন্য বার্তা

শাসকশ্রেণির জন্য বার্তা

স্বৈরশাসকদের শেষ পরিণতি হয় নির্মম। ইতিহাস তাই বলে। নৃশংস স্বৈরাচাররা শেষ পর্যন্ত নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, কাপুরুষের মতো দেশ থেকে পালিয়েছেন, নির্বাসিত জীবনে উদ্বাস্তুর মতো মৃত্যুবরণ করেছেন, অথবা দেশে কিংবা বিদেশে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন উদাহরণের অভাব নেই। এই যেমন ধরুন ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির কথা। যে মানুষটি একসময় গর্বভরে বলেছিলেন যে, ফ্যাসিবাদই ইতালির ভবিষ্যৎ। কিন্তু দেশজুড়ে গেরিলা আর মিত্রশক্তির সৈন্যরা একে একে দখল নেয় তার সাম্রাজ্য। মুসোলিনি তখন একদল অনুসারীসহ সুইজারল্যান্ডে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। শরীর ক্লান্ত, চোখে ভয়, কিন্তু মুখে তখনো সেই স্বৈরাচারীর ভান। তিনি জার্মান সেনাদের কনভয়ে পালানোর পরিকল্পনা করেন। নিজের পরিচয় গোপন রাখতে জার্মান কোট পরা, টুপির আড়ালে মুখ লুকানো। দোঙ্গো নামের ছোট্ট একটি গ্রামে একদল ইতালিয়ান পার্টিজান জার্মান ট্রাক থামায়। তারা প্রথমে মুসোলিনিকে চিনতেই পারেনি। কিন্তু একসময় সেই মুখ, সেই পরিচিত দৃষ্টি আর লুকানো গেল না সত্য—‘তুমি মুসোলিনি!’ শুষ্ক বাতাসে শব্দটি গর্জে ওঠে। তাকে আটক করা হয়। এক নির্জন গ্রামে একটি বাড়ির দেয়ালের সামনে দাঁড় করানো হয় মুসোলিনিকে এবং তার প্রেমিকা ক্লারা পেতাচ্চিকে। পাহাড়ি বাতাসে গুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। মুসোলিনি যুগের ইতি ঘটে।

কিন্তু নাটক এখানেই শেষ নয়, তাদের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিলানের লোরেতো স্কয়ারে। জনতার ভিড় সেখানে উত্তাল সমুদ্রের মতো। কেউ থুতু দিচ্ছে, কেউ লাথি মারছে, অনেকেই সেই মানুষটির ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে, যার শাসনে তারা বছরের পর বছর ভয়ে কাটিয়েছে। মানুষ তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখে, যাতে পুরো ইতালি দেখে, এক স্বৈরশাসকের শেষ পরিণতি কেমন হয়। একসময় যে মুসোলিনি নিজেকে ‘রোমান সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম’ ভাবতেন, তার সেই অহংকার গুঁড়িয়ে যায় মিলানের রাস্তায় জনতার ক্ষোভের ঢেউয়ে। এ কাহিনি ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের। এরপর এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে আমরা স্বৈরশাসকদের করুণ পরিণতি বরণ করতে দেখেছি।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের এক রাতে আফ্রিকার দেশ শাদের প্রেসিডেন্ট হিসেন হাব্রেকে তার সাম্রাজ্য ছেড়ে পালানোর ইতিহাস আমরা জানি। বছরের পর বছর ধরে তার ভয়ংকর গোপন পুলিশ হাজারো মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যা করেছে। এমন অভিযোগে দেশ উত্তাল ছিল। বিদ্রোহীরা রাজধানীতে ঢুকে পড়তেই হাব্রে বুঝলেন সময় ফুরিয়ে গেছে। তিনি দ্রুত একটি কনভয় নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সেনেগালের দিকে রওনা দিলেন। সেখানেই শুরু হয় তার দীর্ঘ পলাতক জীবন। সৈন্য-প্রহরায় ঘেরা বিশাল প্রাসাদে তিনি থাকতেন, যেন অতীতের কোনো রাজা নির্বাসনে।

কিন্তু একদিন শাদের মানুষদের আর্তনাদ পৃথিবীর কানে পৌঁছে গেল। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বছরের পর বছর প্রমাণ সংগ্রহ করল। অবশেষে সেনেগাল সম্মত হলো, একটি বিশেষ আফ্রিকান আদালত বসবে। ২০১৬ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনটিতে, আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন হাব্রে। তার মুখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, কিন্তু সাক্ষীদের গলার কাঁপনে, কান্নায় আদালত ভারী হয়ে উঠেছিল। রায় হলো, আজীবন কারাদণ্ড। এটাই ছিল আফ্রিকার মাটিতে প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধের ঐতিহাসিক বিচার।

অতএব আমাদের শাসকশ্রেণিকে মনে রাখতে হবে, ভয়ের সংস্কৃতিতে গড়া ক্ষমতা ভেঙে পড়ে খুব সহজেই। মুসোলিনি, হিটলার, পিনোশে, ফুজিমোরি, হাব্রে কিংবা হাসিনার গল্প তাই শুধু স্বৈরশাসকের পতন নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের অদম্য চেতনার গল্প, যা শেষ পর্যন্ত অত্যাচারের শিকল ভেঙে ফেলে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১০

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১১

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১২

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৩

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৪

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৫

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৬

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৭

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৮

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৯

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

২০
X