

ঢাকার সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা আবারও এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্তি, প্রশাসনিক রদবদল ও কাঠামোগত টানাপোড়েন—এ তিনের মিলিত সংকট আজ তাদের শিক্ষাজীবন সেশনজটে ঠেলে দিয়েছে। যখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একই শিক্ষাবর্ষে পাঁচ মাসের ক্লাস শেষ করে সেমিস্টার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সাত কলেজের নবীন শিক্ষার্থীরা এখনো ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ করতেই পারেনি। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতার প্রকট উদাহরণ।
২০১৭ সালে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই সাত কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। তখন থেকেই সমস্যার সূচনা। শিক্ষক সংকট, পাঠ্যসূচি সমন্বয়, পরীক্ষা পরিচালনা ইত্যাদি সবকিছুতে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছে, দাবি জানিয়েছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের পথ খোলা হয়নি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করার ঘোষণা দেওয়া হলে মনে করা হয়েছিল, এবার হয়তো নতুন পথের সূচনা হবে। কিন্তু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা স্পষ্ট না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
বর্তমানে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে ভর্তি কার্যক্রম চলছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি ভিত্তি, প্রশাসনিক কাঠামো ও শিক্ষাদানের রূপরেখা এখনো পরিষ্কার নয়। শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন যে, প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই আইনি দিক থেকে সুনির্দিষ্ট নয়, তার অধীনে কীভাবে প্রথম বর্ষের ক্লাস নেওয়া হবে? তাই তারা ক্লাস শুরুর ব্যাপারে অনাগ্রহী। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ভর্তি নিয়ে দিশেহারা, ক্লাস কবে শুরু হবে তা তারা কেউই জানে না।
সরকারি পরিকল্পনার মধ্যেই দেখা দিয়েছে মতবিরোধ। প্রস্তাবিত ‘হাইব্রিড মডেল’ যেখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে, ৬০ শতাংশ সশরীরে তা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে তীব্র বিরোধ। এরই মধ্যে ভর্তিপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও বিলম্ব শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলেছে। আগস্টে ভর্তি পরীক্ষা হলেও শিক্ষক-কর্মচারী সংকট ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার কারণে এখনো ভর্তি শেষ করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষক আন্দোলনের সময় কর্মচারীদের দিয়ে ভর্তি পরিচালনা করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও দক্ষতা—দুটিরই প্রশ্ন তোলে। সব মিলিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরাই। তারা জানে না কবে ক্লাস শুরু হবে, কবে সেশনজট কাটবে, কবে তারা স্নাতক সম্পন্ন করতে পারবে। তাদের হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা একটি সাধারণ প্রশাসনিক সংস্কার ব্যর্থতার মূল্য।
এ জটিল পরিস্থিতির সমাধান কী? প্রথমত, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো ও আইনি অবস্থান নিয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়পক্ষের গ্রহণযোগ্য একটি মডেল ঘোষণা করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, ভর্তি, পাঠদান ও পরীক্ষা—এ তিনটি ক্ষেত্রে একটি সাময়িক রূপরেখা দিতে হবে, যাতে বর্তমান শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা আর বিলম্বের শিকার না হন। তৃতীয়ত, সাত কলেজের জন্য যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেগুলো বাস্তবসম্মত হতে হবে; পূর্বের মতো অপ্রস্তুত ও অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সেশনজট আরও দীর্ঘ হবে।
আমরা মনে করি, সরকারি নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা উচিত প্রতি সপ্তাহের বিলম্ব মানে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ঝুলে থাকা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষকসমাজ সবার সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপই পারে এ সেশনজট ও অসংগতি থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে।