

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এ রোগে গত ৩০ দিনে ৭০ থেকে ৮০টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। এতে কৃষক ও খামারিদের প্রায় অর্ধকোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়তে থাকায় খামারিদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বুধবার (০৩ জুন) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নে রোগটির প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। এছাড়া গয়াবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, পূর্ব ছাতনাই, বালাপাড়া, খালিশা চাপানি, ঝুনাগাছ চাপানি, নাউতারা ও ডিমলা ইউনিয়নেও ব্যাপক হারে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক গ্রামের প্রায় প্রতিটি খামারেই আক্রান্ত গরু দেখা গেছে। কোথাও কোথাও একই খামারের একাধিক গরু আক্রান্ত হওয়ায় খামারিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ডিমলা উপজেলায় অনুমানিক গবাদিপশুর সংখ্যা দুই লক্ষাধিক। এর মধ্যে খামারির সংখ্যা ১৪ হাজারেরও বেশি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়, স্থানীয় কৃষক ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লাম্পি স্কিন ডিজিজ এক ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। যদিও এ রোগ মানুষের মধ্যে ছড়ায় না, তবে গরুর জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর। সাধারণত শীতের শেষে ও গ্রীষ্মের শুরুতে মশা-মাছির বংশবিস্তার বেড়ে গেলে রোগটির সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত গরুর সংস্পর্শ ছাড়াও মশা-মাছির মাধ্যমেও এ রোগ বিস্তার লাভ করে।
আক্রান্ত গরু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয়। পরে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, খাবারে অরুচি, মুখ ও নাক দিয়ে লালা পড়া এবং পা ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। একপর্যায়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়ায় নডিউল বা গুটি সৃষ্টি হয়। পরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে লোম উঠে যায় এবং গরু দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় আক্রান্ত গরু চলাফেরা করতে পারে না। কিডনির ওপর প্রভাব পড়লে মৃত্যুও হতে পারে। এছাড়া আক্রান্ত গাভীর দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় খামারিদের আর্থিক ক্ষতি আরও বাড়ছে।
স্থানীয় সূত্র ও খামারিদের দাবি, এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন খামারে রোগটি শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
গয়াবাড়ি ইউনিয়নের বাবুপাড়া গ্রামের খামারি মানিকবাবু বলেন, আমার ৯টি গরুর মধ্যে ৩টি আক্রান্ত হয়েছে। প্রতিদিন চিকিৎসার পেছনে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। গরুগুলো নিয়ে আমরা খুব আতঙ্কে আছি।
একই গ্রামের সিএনজিচালক লুৎফর রহমান বলেন, কষ্টের টাকায় কেনা গরুটি গর্ভবতী ছিল। কয়েক দিন আগে লাম্পি রোগে গরুটি মারা গেছে। এতে আমি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি।
নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের হযরত আলী জানান, সপ্তাহখানেক আগে এ রোগে তাঁর প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের একটি ষাঁড় মারা যায়। আতঙ্কে পরে বাড়ির অন্য গরুটিও বিক্রি করে দেন তিনি।
পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কয়েকজন খামারি জানান, রোগের বিস্তারের কারণে স্থানীয় গরুর হাটেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অনেক ক্রেতা গরু কিনতে ভয় পাচ্ছেন। এতে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণে জড়িত খামারিদের মধ্যে বাড়তি উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
খামারিদের অভিযোগ, উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী, টিকা ও ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ফলে হাসপাতালে গিয়েও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে বেশি দামে ওষুধ কিনতে হচ্ছে। এ সুযোগে কিছু গ্রাম্য পশুচিকিৎসক অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেক খামারি জানান, একটি গরুর চিকিৎসায় কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
গয়াবাড়ি এলাকার এক খামারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গরু বাঁচাতে যা বলা হচ্ছে তাই করতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে সব ওষুধ পাওয়া যায় না। বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় কয়েকজন খামারি অভিযোগ করেন, অনেক এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত টিকা ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছেনি। ফলে আক্রান্ত গরু নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। অনেক খামারি ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাড়তি খরচের চাপে পড়েছেন। ২০১৯ সাল থেকে লাম্পি রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও এখন পর্যন্ত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন নিয়ে কার্যকর তৎপরতা তেমন চোখে পড়েনি। এতে প্রতি বছর জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
ডিমলা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শাহিদুল ইসলাম বলেন, লাম্পি স্কিন রোগে মৃত্যুহার তুলনামূলক কম হলেও আক্রান্ত গরু মারাত্মক দুর্বল হয়ে পড়ে। এ রোগের এলএসডি টিকা বেশ কার্যকর। এখন পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ৩৫৫ মাত্রা ভ্যাকসিন সরবরাহ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এসব ভ্যাকসিন গবাদিপশুতে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা উপজেলার মোট গবাদিপশুর প্রায় ৪ শতাংশ। চাহিদার তুলনায় এটি খুবই অপ্রতুল। এছাড়া প্রায় ৬ শতাংশ গবাদিপশুতে খামারিরা নিজ উদ্যোগে উচ্চমূল্যে ভ্যাকসিন কিনে প্রয়োগ করেছেন। এখনো প্রায় ৯০ শতাংশ গবাদিপশু ভ্যাকসিনের আওতার বাইরে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত গরুকে অবশ্যই অন্যান্য গরু থেকে আলাদা রাখতে হবে। পাশাপাশি গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মশা-মাছি নিয়ন্ত্রণ করা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য খামারিদের আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় ক্যাম্প করে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, খামার পরিদর্শন, ভ্যাকসিন বিষয়ে পরামর্শ এবং লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে খামারিদের অপ্রয়োজনে গরু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে না নেওয়া এবং আক্রান্ত গরুর ব্যবহৃত খাবার ও সরঞ্জাম আলাদাভাবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।