মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:২৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরেকবার উঠে দাঁড়ান বেগম খালেদা জিয়া

ড. মোহা. হাছানাত আলী
আরেকবার উঠে দাঁড়ান বেগম খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের রাজনীতির বিস্তৃত আকাশে কিছু নাম নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে থাকে। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, ইতিহাসের ধারা বারবার ঘুরে যায়—তবু কিছু নাম মুছে যায় না। বেগম খালেদা জিয়া ঠিক এমনই একটি নাম—যা জাগায় আশা, জাগায় প্রেম-ঘৃণার ভিন্ন অনুভূতি, কিন্তু সবশেষে এক অনিবার্য বাস্তবতা এনে দেয়: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস তাকে ছাড়া পূর্ণ হয় না। আজ তিনি প্রায় নিঃশব্দ, প্রায় নিশ্চল। রাজনৈতিক উত্তাপের মাঠ থেকে বহু দূরে, হাসপাতালের সাদা দেয়ালের ভেতর বন্দি একটি দহনশীল ইতিহাস।

কিন্তু এমন মুহূর্তেই মানবিকতার গভীর আলোয় তার দিকে তাকিয়ে বলার ইচ্ছে জাগে—উঠে দাঁড়ান, বেগম জিয়া। আরেকবার।

ইতিহাসের করিডোরে বেগম খালেদা জিয়ার পদচারণা ছিল উজ্জ্বল ও দীপ্তময়। তবে বেগম জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল না কোনো প্রস্তুত পরিকল্পনার ফল। এ ছিল ভাগ্যের নির্মম আহ্বানে পাওয়া এক দায়িত্ব। রাজনৈতিক পাণ্ডিত্য, বক্তৃতার মহিমা, তাত্ত্বিক জ্ঞান—কোনোটাই তখন তার পরিচয়ের অংশ ছিল না। তবু রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর সামরিক অস্থিরতার ভয়ানক সময়ে এক নারীর ওপর চাপানো হয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভার। এ এমন সময়, যখন আত্মীয় হারানো এক তরুণ বিধবার শোকে জীবন স্তব্ধ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু তিনি স্তব্ধ হননি। রক্তাক্ত শোককে তিনি পরিণত করেন দায়িত্বের নতুন রূপে—নিজের না, রাষ্ট্রের, জনগণের, গণতন্ত্রের প্রতি। এই রূপান্তর সহজ ছিল না। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে জাতীয় নেত্রী—যাত্রাটা ছিল বন্ধুর পথ, কাঁটায় ভরা, অবিশ্বাসে ঘেরা। কিন্তু সময়ই তার শিক্ষক; দায়িত্বই ছিল তার প্রশিক্ষণ। ব্যক্তির ভেতরে লুকানো পাহাড়সম শক্তি—যে শক্তির নাম খালেদা জিয়া।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি ছিল নিত্যসঙ্গী। তার ভেতর উঠে দাঁড়ানো একজন নারীর গল্প—এ গল্প শুধু রাজনীতির নয়; এ গল্প সাহসের। কর্তৃত্বের ঘরানা ভেঙে তাকে সামনে আসতে হয়েছে শত উপহাস, অপবাদ, রাজনৈতিক আক্রমণ মোকাবিলা করে। কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব, হুমকি, দলীয় বিভাজন, রাষ্ট্রক্ষমতার বিরোধিতা—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক চলমান ঝড়ের মধ্যে। তারপরও তিনি কখনো কণ্ঠস্বর হারাননি; কখনো মাথানত করেননি। তিনি জানতেন, তার ওপরে শুধু পরিবারের নয়, একটি রাজনৈতিক যাত্রার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

এ দৃঢ়তা ছিল ব্যক্তিমানুষের ভেতরে লুকানো পাহাড়সম শক্তি। এ শক্তির দীপ্তি আজও তার ভক্ত-অনুসারীদের চোখে জ্বলজ্বল করে। রাজনীতির বাইরে বেগম জিয়ার জীবনে যে শোক, যে নিঃসঙ্গতা, যে আঘাত—তা যে কোনো মানুষকে ভেঙে দিতে পারত। ভাইয়ের মৃত্যু, সন্তানের মৃত্যু, স্বামীর হত্যা, দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা—সবকিছু নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই কঠিন। তবু তিনি ভাঙেননি। অভিযোগ করেননি ইতিহাসের কাছে; বদলা নিতে চাননি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। এই মানবিক শক্তি, এই নীরব সহ্যক্ষমতা তাকে রাজনীতির বাইরে একজন মহীয়সী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। গণতন্ত্রের যাত্রায় তার অবদান অপরিসীম। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সেই আন্দোলনে বেগম জিয়া দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। দল, মত, মতাদর্শ পেরিয়ে তিনি সংগ্রামের সাধারণ মঞ্চে এসেছিলেন যাতে একটি প্রজন্ম ভোটাধিকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও নাগরিক মর্যাদা ফিরে পায়। এ দৃশ্য ছিল বিরল। এ দৃশ্য আমাদের দেখিয়েছে, জাতীয় স্বার্থে নেতৃত্ব কেমন উদার হতে পারে।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম জিয়া: দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করেছেন; বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বিস্তার ঘটিয়েছেন; রপ্তানি বাণিজ্য ও গার্মেন্টস খাতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন; শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে নতুন প্রণোদনা দিয়েছেন; স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের সূচনা করেছেন। অবশ্যই রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল, ত্রুটি ছিল, সমালোচনা ছিল কিন্তু তার ভূমিকা অস্বীকার করে বাংলাদেশ আজকের অবস্থানে আসত না।

আজকের বেগম জিয়া আগের মতো আওয়াজ তোলেন না। তার চোখে আগুন নেই, আছে গভীর নীরবতা। তার হাতে মাইক নেই, আছে স্যালাইনের সুচ। একসময়ের প্রবলমতি নেত্রী আজ শয্যাশায়ী, দুর্বল, চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল। রাত-বিরাতে হাসপাতালের কক্ষে তার নিঃশ্বাসের ওঠানামা যেন এক ইতিহাসের প্রবাহকেই থমকে দেয়। প্রশ্ন জাগে—যে নারী সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, যিনি কখনো হার মানেননি, তাকে কি এভাবে একা, অসহায়, রোগশয্যায় দেখে আমাদের বিবেক শান্ত থাকে?

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, তিনি আজ একজন মানুষ। মানবিকতার কাছে রাজনীতি তুচ্ছ। একজন অসুস্থ প্রবীণ নারীকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, কৌশল, মহড়ার মধ্যে আটকে রাখা সভ্যতার কাজ নয়। জাতির মহান নেতাদের আমরা সবসময়ই দেখেছি—রাজনৈতিক ভিন্নতা থাকলেও মানবিক মর্যাদায় তারাই সবার আগে এগিয়ে এসেছেন। আজ খালেদা জিয়ার প্রতি সেই একই মানবিক আচরণ দেখানো আমাদের দায়িত্ব। রাষ্ট্র, সমাজ, প্রতিপক্ষ—সবার জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজনটা একটাই: তার জীবন রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তিনি কি আবার উঠতে পারবেন? ইতিহাস বলে: হ্যাঁ, পারবেন ইনশাআল্লাহ। রাজনীতি হয়তো তার শরীরের কাছে আর দাবি রাখে না। কিন্তু জীবন তাকে এখনো ডাকে।

যে নারী বারবার ভেঙে পড়ে আবার দাঁড়িয়েছেন—রক্তাক্ত রাজপথ থেকে, অপবাদ থেকে, কারাবাস থেকে, নিষেধাজ্ঞা থেকে, রাজনৈতিক হিংসা থেকে—তিনি কি আবার উঠতে পারবেন না? নিশ্চয়ই পারবেন। এ ওঠা হয়তো রাজনীতির মাঠে নয়, কিন্তু মানবিক মর্যাদার, শারীরিক সুস্থতার, জীবনের আলো ফিরিয়ে পাওয়ার পথে হবে। মানবিকতার আলোয় দাঁড়িয়ে একটি জাতির প্রার্থনা আপনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন আমাদের মাঝে। আমরা আজ তাকে দেখি: সাদা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা এক দৃঢ়চেতা নারীকে, রাজনীতির ঝড় পেরিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া শরীরকে, কিন্তু অটুট এক মনোবলকে। এই দৃশ্য রাজনৈতিক স্লোগান জাগায় না; এ দৃশ্য জাগায় মানবিক দায়বোধ। এ কারণেই আমরা বলি—বেগম জিয়া, আপনি আরেকবার উঠুন। আপনার হাত শক্ত হয়ে উঠুক, চোখে ফিরে আসুক আলো, মুখে ফিরুক সেই স্থিরতা, যা একসময় লাখো মানুষকে সাহস দিত। ইতিহাস আপনাকে ভুলবে না, কিন্তু আমরা চাই, আপনি নিজেই ইতিহাসের পরবর্তী পাতাগুলো দেখুন— সুস্থভাবে, মর্যাদার সঙ্গে, জীবনকে নতুন করে ধারণ করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এক প্রতীক—দৃঢ়তার, সহনশীলতার, সংগ্রামের, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টিকে থাকার। আজ তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনীতি নয়, মানবিক সহমর্মিতা। সেই সহমর্মিতার জায়গা থেকেই এই প্রার্থনা—আরেকবার উঠে দাঁড়ান, বেগম খালেদা জিয়া। জাতি চান আপনি সুস্থ হন। ইতিহাস চায় আপনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুন। মানবিকতা চায় আপনি জীবনের দিকে ফিরে তাকান নব আলোয়।

লেখক: প্রফেসর, উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১০

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১১

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১২

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৩

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৪

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৫

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৬

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৭

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

১৮

ছাত্রলীগ নেতা ডেবিট আটক

১৯

ভারতের পুশইন নিয়ে ছাত্রদল নেতা আবিদের স্ট্যাটাস ভাইরাল

২০
X