মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সাঈদ বারী
প্রকাশ : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যেভাবে জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন

যেভাবে জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠলেন

হাসপাতালের সংকটময় বিছানায় শুয়ে থাকা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চারপাশে এখন সমগ্র জাতি নিঃশব্দ প্রার্থনায় নিমগ্ন। দল-মত-ধর্ম-বর্ণের ব্যবধান ভুলে সবাই তার জন্যই হাত তুলছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ পর্যন্ত সবার হৃদয়ে একই মিনতি—তিনি সুস্থ হোন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নেতার অসুস্থতা নিয়ে এমন সামষ্টিক আবেগ, এমন ঐক্যের বিস্তার আগে কখনো দেখা যায়নি। এই দৃশ্য বলে দেয়, খালেদা জিয়া শুধু একটি দলের নেত্রী নন; তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের মানুষের গভীরতম মানবিক অনুভূতির প্রতীক।

এই ভালোবাসা, এই ঐক্যের উৎস শুধুই তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় নয়; উৎস তার চরিত্রে, তার মহত্ত্বে, তার অসীম সহিষ্ণু ও নিঃস্বার্থ হৃদয়ে।

খালেদা জিয়া সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি ক্ষমতায় থেকেও প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করেননি আর ক্ষমতার বাইরে থেকেও বিদ্বেষকে রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেননি।

বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তপ্ত বছরগুলোয় তার আচরণ বারবার দেখিয়েছে মানুষকে ভালোবাসা, দেশকে ভালোবাসা, অন্যায়ের কাছে মাথানত না করা—এগুলোই তার রাজনীতির প্রধান ভিত্তি।

তিনি চাইলে ভিন্ন জীবন বেছে নিতে পারতেন। একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের স্ত্রী হিসেবে তিনি বিলাস-স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা জীবন কাটাতে পারতেন অনায়াসে। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। তিনি প্রবেশ করেছিলেন রাজনীতির অনিশ্চিত গোলকধাঁধায়—শুধু জনগণের কল্যাণের টানে, গণতন্ত্রের দায়ে। এটি ছিল ত্যাগের সিদ্ধান্ত, কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ, তবুও দৃঢ়।

গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই শুধু এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ৯ বছরব্যাপী আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ফ্যাসিবাদী দমনপীড়নের বিরুদ্ধেও ছিল তার দীর্ঘ, নিরলস সংগ্রাম।

জীবনের বহু সময় জেল, মামলা, গৃহবন্দিত্ব, অপমান, অপবাদ—সব তিনি সহ্য করেছেন এ বিশ্বাসে যে, গণতন্ত্রের আলো নিভে যেতে নেই। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন নিঃশ্বাস নিতে পারে স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে—এ আদর্শই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের সামনে তিনি কখনো মাথা ঝোঁকাননি। রাজনীতির ইতিহাসে খুব কম মানুষ আছেন, যারা ক্ষমতার মোহ ছেড়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এতটা নিষ্ঠা ও স্থিতি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর বিপর্যস্ত একটি দলকে সংগঠিত করে তিনি যেভাবে পুনর্গঠন করেছিলেন, তা ছিল এক নীরব বিপ্লব। অভিজ্ঞতা কম থাকলেও নেতৃত্বের শক্তি ছিল তার ব্যক্তিত্বে, সৎ ইচ্ছায়, ধৈর্যে। বিএনপিকে তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদ ছিল দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ক্ষমতা বা পদ নয়; সবচেয়ে বড় অর্জন দেশের মানুষের স্নেহ, আস্থা ও শ্রদ্ধা। এ শ্রদ্ধার গভীরতা আজ অসুস্থতার মুহূর্তে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একজন মানুষ যখন হাসপাতালের বিছানায় শায়িত হয়ে দেশের মানুষের মনোভূমিকে এমনভাবে একত্রিত করে ফেলেন, সেটিই হয়ে ওঠে তার নেতৃত্বের সবচেয়ে সত্যিকারের মূল্যায়ন।

তার জীবনে দুঃখ, সংগ্রাম, ক্ষতি ছিল প্রচুর। নিজের ও পরিবারের ওপর আঘাত আসবে জেনেও তিনি গণতন্ত্রের পথ ছাড়েননি। তার দুই পুত্রকে হারানো—একজনের মৃত্যু, একজনের দীর্ঘ নির্বাসন— এসবই ছিল তার জীবনের গভীরতম ক্ষত। কিন্তু তিনি ভেঙে পড়েননি। মহৎ হৃদয়ের মানুষরা সাধারণত ভেঙে পড়েন না—তারা নীরবে লড়াই করেন, কারও ক্ষতি চান না, কিন্তু অন্যায়ের কাছে নতও হন না। খালেদা জিয়ার জীবন তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ।

আজ যখন তিনি মৃত্যুপথযাত্রার মতো এক ভয়াবহ অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়ছেন, তখন জাতি বুঝতে পারছে—এ নারীর জীবন শুধু একটি রাজনৈতিক গল্প নয়; এটি এক অধ্যবসায়, সহিষ্ণুতা, মানবিক মর্যাদা ও ত্যাগের মহাকাব্য। সামাজিক মাধ্যমে যে অভূতপূর্ব দোয়া-প্রবাহ দেখা গেছে, তা কোনো প্রচারণার ফল নয়; এটি হৃদয়ের সাড়া।

যারা কখনো তাকে ভোট দেননি, যারা তার দলকে সমর্থন করেন না, তারাও আজ প্রার্থনার অংশ হয়ে গেছেন—এটাই এক নেত্রীকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রমাণ। মানুষের ভালোবাসা কখনো মিথ্যা হয় না। রাজনীতির গল্প বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে স্থান, তা যুগ পেরিয়েও থেকে যায়।

আজ বেগম খালেদা জিয়া সেই বিরল স্থানে অবস্থান করছেন, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মানবিক চরিত্রই তার পরিচয়। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির ঐক্যের প্রতীক—এ এক আশ্চর্য, অথচ গভীর সত্য। জাতি তার সুস্থতা কামনা করছে শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়, একটি ইতিহাসের জন্য, একটি আদর্শের জন্য, একটি মানবিকতার জন্য। তিনি যে পথ দেখিয়েছেন—সাহসের, ধৈর্যের, ন্যায়ের, আপসহীনতার; সে পথই আজ মানুষের মনে আলো জ্বেলে যাচ্ছে।

রাজনীতিতে অনেকেই ক্ষমতার চূড়ায় ওঠেন, কিন্তু খুব কম মানুষ মানুষের হৃদয়ে থাকেন। খালেদা জিয়া সেই বিরল জননীসুলভ নেত্রী, যিনি পরিণত বয়সে, অসুস্থতার বিছানায় থেকেও জাতিকে একত্রিত করতে পেরেছেন। সেই ঐক্যই আজ তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা। এই প্রার্থনা-ভরা সময়ই তার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাকরিনির্ভরতা থেকে উদ্যোক্তা: আত্মকর্মসংস্থানে আনসারের ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

১০

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১১

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১২

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১৩

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৪

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৫

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৬

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৭

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৮

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৯

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

২০
X