

জেন-জিদের জুলাইকে ‘ঝুলাই’ বলে খোঁচানোর লোকের অভাব ছিল না। কারও কাছে চব্বিশের বাতি পঁচিশে নিভিয়ে দেওয়ার ছকও ছিল। এর মাঝেই ঢাকায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে মৃত্যু। একই দিনে কিছু সময়ের তফাতে রাজধানীর ঝিগাতলায় এনসিপির আলোচিত নেত্রী জান্নাত আরা রুমির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার—এ দুই ঘটনার আগে রয়েছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এনসিপির কয়েক নেতার বেদম মার খাওয়ার ঘটনা। হাদির মৃত্যুতে শোক জানিয়ে জাতির উদ্দেশে তাৎক্ষণিক ভাষণে সবাইকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আহ্বান জানিয়েছেন কাউকে হটকারী কাজে না জড়াতে। কিন্তু এ আহ্বানের প্রতিফলন ঘটেনি। বৃহস্পতিবার রাতে ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজে তার মৃত্যুর খবর জানানোর পর ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ। রাত ১০টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ মোড়সহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় জড়ো হতে থাকে তরুণরা। শাহবাগ হয়ে ওঠে বিক্ষোভে উত্তাল। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, ভারতের আধিপত্যবাদের প্রতিবাদে স্লোগান পর্যন্তই নয়, কারওয়ান বাজারে দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও ভাঙচুর চলে। ৩২ নম্বর আবার হয় হামলার লক্ষ্যবস্তু। ঘোষিত নির্বাচনের আগে এমন অবস্থা প্রত্যাশিত ছিল না।
হাদি মাস কয়েক ধরে নানা আশঙ্কার কথা বলে আসছিলেন। জুলাইয়ের ফ্রন্টলাইনাররা একটা সময় একলা হয়ে যাবেন, তাদের বাঁচতে দেওয়া হবে না—এ ধরনের কথাও বলেছিলেন। এও বলেছিলেন, তার কিছু হলে নিজের সন্তানকে যেন দেখে রাখা হয়। ওসমান হাদি বরাবরই ব্যতিক্রম স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভীষণ সোচ্চার। অল্প সময়ে তার কণ্ঠ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী ভাষা। শুধু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নয়, বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি কাউকে ছাড়েননি এ খ্যাপাটে যুবক। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ভাইরাল হাদির গণঅভ্যুত্থানে ছিল অসামান্য অবদান। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠন করেন ইনকিলার মঞ্চ। তিনি হন এর মুখপাত্র। হাদির জন্ম ঝালকাটিতে। ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় শিক্ষায় অনুরাগী ও ভদ্র প্রকৃতির। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে পুরোনো ধারার রাজনীতির কঠোর সমালোচনায় ছিলেন তীব্রতায় পারঙ্গম। ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়ে বাড়তি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১২ ডিসেম্বর দুপুর আড়াইটার পরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহতের পর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রাজধানীর এভারকেয়ারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সিঙ্গাপুরে। গোটা দেশকে কাঁদিয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জীবন শিখা নিভে গেল হাদির।
প্রায় একই স্কেলে নেপাল-শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশে দুঃশাসকের পতনসহ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ঘটনাপ্রবাহ কাছাকাছি। কিন্তু শাসনতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় নেপাল-লঙ্কার সঙ্গে ব্যাপক তফাত বাংলাদেশের। দেশ দুটিতে বাংলাদেশের মতো সংস্কার, ঐকমত্য, মব-গুজব, আন্দোলনকারী ফ্রন্টফিগারদের নানা ক্রিয়াকর্মের ক্যারিকেচার পর্ব নেই। আগে সংস্কার না নির্বাচন বিতর্ক বাধেনি। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় বা ছাত্রসংসদ নির্বাচনের বাহাসও জমেনি। সংস্কারের নামে প্রশাসনে রদবদলের হিড়িক, মিল-কলকারখানায় হামলে পড়ার সিরিজও দেখতে হয়নি। লাইফ সাপোর্টে চলে যায়নি তাদের অর্থনীতি। নেপালের এক প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে, নতুন সরকারও চলে এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের তারিখও দিয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার এক দিন পরই হাদির ওপর হামলা। রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে টলটলে অবস্থা। শ্রীলঙ্কায় বিপ্লবের কয়েক দিনের মধ্যে সেখান থেকে দুর্নীতি অনেকটা ‘নাই’ হয়ে গেছে। দেশটিতে মিছিল-মিটিংসহ উত্তেজনা চলতে থাকলেও কোনো মিল-ফ্যাক্টরিতে হামলা, কোনো দোকানপাট দখলের তথ্য নেই। মব বলতে কিছু হয়নি। যদিও চরম রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কি। দায়িত্ব নেওয়ার দিনই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী বছর ৫ মার্চ দেশটিতে হবে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন।
জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগের পর দেশটিতে রাজনৈতিক সংকট সাংবিধানিক সংকটকে বেশিক্ষণ পোক্ত করতে পারেনি। সংকট সমাধানে বিক্ষোভকারী তরুণদের প্রতিনিধিরা দফায় দফায় বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট পৌদেল ও সেনাপ্রধান অশোক রাজ সিগদেলের সঙ্গে। দ্রুত ফয়সালাও বের করে ফেলেন। ছয় মাসের মধ্যেই নির্বাচন নিশ্চিত করা, সংবিধান সমুন্নত রাখতে এবং জাতীয় ঐক্য এগিয়ে নিতে শর্টকোর্স পন্থা নেন তারা। অন্য কোনো বিষয় সামনে এনে জটিলতা পাকাননি। গুণগতভাবে তা বাংলাদেশের একদম বিপরীত। অবশ্য নেপালে দুর্নীতি কম, টাকা পাচার কম, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দখল নেই বললেই চলে। স্থানীয় নির্বাচন, ছাত্রসংসদ নির্বাচন, প্রশাসনের পদপদবি ভাগাভাগির দুষ্টক্ষত আমাদের মতো নয়। নির্বাচন দ্রুত হলে লাভ বেশি না পরে হলে সুবিধা বেশি—এ ধরনের বিষয়ে বহুমত-বহুপথের বালাইও নেই। তাই নির্বাচনের প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে। আর নেপালের ‘জেন-জি’ তরুণরা নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথের দিনই জাতীয় নির্বাচনের তারিখ আদায় করে বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ তরুণরা এ প্রশ্নে বিপরীত। রাজনৈতিক দলগুলোও বিভক্ত।
নেপালেও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সুশীলাকে নতুন প্রধানমন্ত্রী করতে সমঝোতায় পৌঁছা একদম সহজ ছিল না। এ নিয়ে মত-দ্বিমত ছিল। তবে সব মতপার্থক্য ছাপিয়ে তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মনোনীত ও শপথ নেওয়ার কাজটি তারা দ্রুত সম্পন্ন করেছে। একদিকে চলে তার শপথ ও দায়িত্ব নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করার আয়োজন। তা কার্যকর ফল দিয়েছে। নেপালের পর এবং বাংলাদেশের ঘটনার আগে শ্রীলঙ্কার ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনাও শিক্ষণীয় হতে পারত। প্রায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নেপালের স্বাভাবিকতায় ফেরা, শ্রীলঙ্কার ঘুরে দাঁড়ানোর নেপথ্য কারণ ও নীতিগুলো বাংলাদেশের জন্য পাঠপঠনের বিষয়। শ্রীলঙ্কার নতুন সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু নীতি তাদের পরিস্থিতির এমন নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এর পাশাপাশি করোনা মহামারির অভিঘাত কাটিয়ে পর্যটন খাতের ঘুরে দাঁড়ানো, কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির বিষয়টিও ইতিবাচক পরিবর্তনে সহায়ক হয়েছে। নেপাল কিংবা শ্রীলঙ্কার দিকে তাকালে একটি চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরপরই সেখানে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। জনগণ জানে সামনে কী আসছে, তাই আন্দোলনের মঞ্চ থেকে তারা খুব দ্রুত নির্বাচনী মাঠে চলে গেছে। বাংলাদেশে সেই বাস্তবতার ঘাটতির কারণে শুধু নির্বাচন ঘিরে নয়, সরকার কাঠামো নিয়েই বড় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। বৈষয়িক লাভালাভ নিয়ে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ঘেরাটোপ ব্যাপক। আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনাররা অনিরাপদ। টার্গেটে পড়ে গেছে তারা। তার ওপর অভ্যুত্থানের এক বছরের মাথায় এসে বিভাজন ও বিভক্তি। এ পরিস্থিতির সঙ্গে তিউনিসিয়ার বেশ মিল। তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লবের ২০১০-১১ সালে ২৮ দিনের আন্দোলনে দেশটির স্বৈরশাসক বেন আলি ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনার মতোই। তিউনিসিয়া থেকেই আরব বসন্তের শুরু। সেখানে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বোয়াজিজি নামের এক তরুণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে আত্মহননের মধ্য দিয়ে। এক বোয়াজিজির মৃত্যু গোটা তিউনিসিয়াকে জাগিয়ে তুলেছিল। ঠিক আবু সাঈদের মৃত্যু যেমন বাংলাদেশকে তাতিয়ে দিয়েছিল। এরপরই রাজপথ জনসাধারণের দখলে চলে আসে। ক্ষোভের আগুনে পুড়ে যায় শেখ হাসিনার অবৈধ শাসনের প্রাসাদ।
তিউনিসিয়ায়ও অন্য কারও বেন আলি হওয়া ঠেকাতে ২০১৪ সংবিধান সংস্কার করে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা হয়। কিন্তু আদতে তিউনিসিয়ায় একটি দুর্বল সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। যাদের জনসমর্থন ছিল না, সরকার গঠনের মতো তাদেরও ক্ষমতার ভাগীদার করা হয় ভারসাম্য আনার কথা বলে। ফলে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দশবার সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। মানে গড়ে প্রতি বছর একবার করে নতুন সরকার। ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনে তিউনিসিয়ায় ব্যবসা-বিনিয়োগে ধস নামে। অর্থনৈতিক মন্দার সঙ্গে বেকারত্বও বাড়তে থাকে। এতে জনঅসন্তোষও বাড়তে থাকে। এ সুযোগ নিয়ে ২০১৯ সালে কাইস সায়িদ নামের এক অধ্যাপক ক্ষমতা দখল করেন। তিউনিসের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। টিভির টক শোগুলোর জনপ্রিয় মুখ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিউনিসিয়ার অভিজাতদের সমর্থন নিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। ২০২১ সালে সংবিধান স্থগিত করে নতুন সংবিধান রচনা করে আবারও দেশে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। তিউনিসিয়া আবার সেই বেন আলির যুগে ফিরে যায়। আর ধাপে ধাপে মৃত্যু, কারাবাস, দেশান্তরী হয়ে জীবন বাঁচানো হয়ে ওঠে সেই জেসমিন বিপ্লবের সম্মুখভাগের তরুণ-যুবকদের বিধিলিপি।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন