

১৯৯০-৯১ সালের কথা। বাংলাদেশ থেকে অস্ত্র এবং সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রথমবারের মতো রীতিমতো যুদ্ধের জন্য দেশের বাইরে গমন করে প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট নামের একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন। তাদের সঙ্গে আরও ছিল মেডিকেল কোর, ইঞ্জিনিয়ারিং কোর, সাপ্লাই কোর, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর ও সদর দপ্তরের আরও কিছু সেনাসদস্য। সৌদি আরব-কুয়েত সীমান্তে অবস্থান নেয় প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট। সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশে ইরাকি সৈন্যরা ততদিনে কুয়েত দখল করে সৌদি আরব দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইরাকের এমন পরিকল্পনা রুখে দিতে বহুজাতিক বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের সৈন্যরাও অস্ত্র হাতে মরুভূমির বুকে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র নগরীর মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা এবং সৌদি নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রণাঙ্গনে অবস্থান নিয়েছিল বাংলাদেশের সেনারাও। এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রকাশ করেছিল সিএনএনসহ বহু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে মধ্যভাগ থেকে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে। উভয়পক্ষের মিসাইলগুলো আকাশে মুখোমুখি আঘাত করত আর বিকট শব্দে উভয় মিসাইল ভেঙে পড়ত মরুভূমি কিংবা সমুদ্রের বুকে, যা দেখা যেত আমাদের অবস্থান থেকেও। ঝাঁকে ঝাঁকে জঙ্গি বিমান আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেত কুয়েতের মাটিতে অবস্থান করা ইরাকি সৈন্যদের ওপর বোমাবর্ষণের উদ্দেশ্যে। এক-একটি জ্বালানি তেলের মজুত কিংবা তেলের খনির ওপর বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গগনবিদারী শব্দ হতো আর আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলে উঠত অনেক উঁচুতে। এরপর কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আকাশ ছেয়ে যেত।
তখন ইন্টারনেট কিংবা মোবাইলের এমন প্রচলন ছিল না। তারপরও আমরা খবর পাচ্ছিলাম দেশে বিরাট পরিবর্তন হচ্ছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নীতি আর অনড় অবস্থানের কারণে এরশাদ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে এবং ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যুদ্ধের মাঠে বসেই শুনলাম ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ১৪০টি সংসদীয় আসনে জয়লাভ করেছে এবং তারই নেতৃত্বে সরকার গঠন হতে যাচ্ছে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একজন নারী প্রধানমন্ত্রী হবেন—এ বিষয়টি মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বহুজাতিক বাহিনীতে উপসাগরীয় বেশ কিছু দেশের মুসলমান সৈন্যরা অংশ নিয়েছিল বলে তারাও এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন করতে থাকে আমাদের। আমরা যথাসাধ্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা তোমরা পোষণ করছ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণের আগে মুসলমানপ্রধান দেশ বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শীতল সম্পর্ক বিরাজ করছিল। শহীদ জিয়ার হাত ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষত সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজ করার বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেই ধারাবাহিকতা আবারও সৃষ্টি করেছিলেন খালেদা জিয়া, সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ।
বাংলাদেশ একটি উদার গণতান্ত্রিক দেশ। নানা ধর্ম-বর্ণ ও মতের মানুষ এখানে যুগের পর যুগ সুখে-শান্তিতে বসবাস করে আসছে। শুধু কিছু স্বার্থন্বেষী মহল বিভাজন তৈরি করে ভিনদেশীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে কিংবা নিজেদের হীনস্বার্থ উদ্ধার করে। তাই খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারও সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হয়ে উঠবে বলে বিশ্বাস ছিল আমাদের। তবে সত্যিকার অর্থে আমাদের মাঝেও ছিল খালেদা জিয়ার সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে নানারকম প্রশ্ন। কারণ, তাকে একমুহূর্তও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল তার প্রতিপক্ষ। তবে তা কাটিয়ে উঠতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি।
এরই মধ্যে যুদ্ধ শেষ হলো এবং ১৯৯১ সালের মে মাসে ফিরতি ফ্লাইট চালু হলো। সৈন্য দলের প্রথম বহর নিয়ে বিশেষ বিমানযোগে আমাকে আসতে হয়েছিল সৌদি আরবের দাম্মাম বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে।
বিমানবন্দরে নেমেই অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করলাম ততদিনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা খালেদা জিয়া অপেক্ষা করছেন তার প্রাণপ্রিয় সেনাদের স্বাগত জানাতে। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে সাধারণ সৈন্যদের এভাবে অভ্যর্থনা এবং স্বাগত জানাবেন, এমনটা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী হিসেবে এবং সেনানিবাসে দীর্ঘ সময় কাটানোর কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ সেনাসদস্য এবং তাদের পরিবারের একজন মা। তার দুই সন্তান পিনু (তারেক জিয়া) ও কোকো সাধারণ সৈনিকদের আপন করে নিতেন, তাদের সঙ্গেই খেলতেন এবং কখনো কখনো তাদের কোলেও চড়তেন। তাই সাধারণ সৈনিকদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নিজ সন্তানের মতোই মনে করতেন খালেদা জিয়া।
বিমানবন্দরে সেদিন তাকে দেখেই মনে হয়েছিল পুত্রবৎসল একজন মা যেমন দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা তার সন্তান দেশে ফিরলে তাকে দেখার জন্য আকুতি নিয়ে অপেক্ষা করেন, একজন বেগম জিয়াও যেন ঠিক তেমনিভাবে মা রূপে তার সন্তানতুল্য সেনাসদস্যদের স্বাগত জানাতে স্বয়ং বিমানবন্দরে ছুটে এসেছিলেন। সেদিনই শ্রদ্ধায় মাথানত হয়ে আসে এ মহীয়সী নারীর প্রতি।
১৯৯১ সালেই আমাকে সামরিক প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে হয় বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে। প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে খালেদা জিয়া বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে আসতেন নবীন অফিসারদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও সালাম গ্রহণের জন্য। আমার সুযোগ হয়েছিল দুটি ব্যাচের ক্যাডেট তথা নবীন অফিসারদের প্রশিক্ষণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার। একজন নবীন অফিসার গড়ে তোলার পেছনে প্রশিক্ষকদের ভূমিকার কথা জানা ছিল খালেদা জিয়ার। তাই কুচকাওয়াজ শেষে নবীন অফিসারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রশিক্ষকদের খোঁজ করতে কোনোদিন ভুল করেননি। তাদের সামনে ডেকে আন্তরিকতার সঙ্গে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতেন। খুব কাছে দাঁড়িয়ে শোনা তার সেই কথা আজও যেন কানে বাজে।
মিলিটারি একাডেমিতে প্রায় পাঁচ বছর কর্মজীবন শেষে আমাকে পাঠানো হয় বগুড়া সেনানিবাসে। এক গ্রীষ্মের দুপুরের কথা। মাঠের প্রশিক্ষণ শেষ করে দুপুরের খাবারের জন্য আমরা তখন অফিসার্স মেসের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সেনা ইউনিটের কাজকর্মের বাইরে মেস সেক্রেটারি হিসেবে অফিসার্স মেস পরিচালনা করা আমার অতিরিক্ত দায়িত্ব ছিল। হঠাৎ করে খবর এলো আমাকে দ্রুত অফিসার্স মেসে যেতে হবে এবং একজন ভিভিআইপি আসবেন, তাকে রিসিভ করতে হবে। এর বাইরে কিছু না বলে দ্রুততম সময়ে আমাকে মেসের ভিভিআইপি রুম পরিদর্শন করে সদর দপ্তরে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বলা হলো। ঊর্ধ্বশ্বাসে অফিসার্স মেসে গেলাম এবং ভিভিআইপি রুম ঠিকঠাক করে সদর দপ্তরে রিপোর্ট দিলাম। তখনই জানলাম দিনাজপুর থেকে ঢাকায় ফেরার পথে খালেদা জিয়াকে বহনকারী হেলিকপ্টারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তিনি বগুড়া সেনানিবাসে জরুরি অবতরণ করবেন। ঢাকা থেকে আরেকটি হেলিকপ্টার আসার আগপর্যন্ত তিনি অফিসার্স মেসের ভিভিআইপি রুমে অপেক্ষা করবেন। অল্প সময়ের মধ্যে অফিসার্স মেসের সব প্রবেশ পথ বন্ধ করে দেওয়া হলো। আমার ওপরের পদবির কোনো অফিসারও ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পরেই স্বয়ং জেনারেল অফিসার কমান্ডিং খালেদা জিয়া ও তার গুটিকয়েক সঙ্গীকে নিয়ে অফিসার্স মেসে আসলেন। খালেদা জিয়া ও তার সঙ্গী সেলিনা রহমান ভিভিআইপি রুমে চলে গেলেন আর বাকিরা মেসে বসার রুমে অপেক্ষা করতে লাগলেন।
খালেদা জিয়ার এডিসি (মেজর পদবির সামরিক সহকারী) ছিলেন আমাদের আগের ব্যাচের। কথা প্রসঙ্গে জানালেন তারা ক্ষুধার্ত। ঢাকায় গিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা ছিল। আমি বললাম অফিসারদের জন্য রান্না করা সাধারণ ভাত, ডাল, লাল শাক আর মাছ আছে দুপুরের খাবার হিসেবে। কী মনে করে যেন আমি মেসে ঢুকেই বাবুর্চিদের দুটি মুরগি দ্রুত রান্না করতে বলেছিলাম। তখনো সেই রান্না শেষ হয়নি। সব শুনে কোনো কিছু না ভেবে এডিসি ভিভিআইপি রুমে গেলেন এবং বেরিয়ে এসে বললেন রুমের ভেতর দুপুরের খাবার পাঠাতে হবে। আমি জানতাম ভিভিআইপিদের খাবার আগে ডাক্তার এবং এসএসএফ সদস্যরা পরীক্ষা করেন এবং তারপরই তা পরিবেশন করা হয়। কে শোনে কার কথা। ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার আসার আগেই খেয়ে নিতে চাইলেন সবাই। আমিও যথারীতি ভিভিআইপি রুমে দুজনের খাবার আর বাকিদের জন্য ডাইনিং রুমে খাবার পরিবেশনের ব্যবস্থা করলাম। আর মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকলাম যেন সবকিছু ঠিকঠাকমতো হয়। সিনিয়র অফিসার একজন বলেই ফেললেন, এত সাধারণ খাবার খাওয়ানোর জন্য আমার নাকি চাকরি চলে যাবে। আমি বললাম আল্লাহ ভরসা।
ভিভিআইপি রুম থেকে খাবার পরিবেশনার দায়িত্বে থাকা মেস ওয়েটার অবশিষ্ট খাবার নিয়ে বের হয়ে এলো। উঁকি দিয়ে দেখলাম সব খাবারই একটু একটু করে খাওয়া হয়েছে। একদিকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আবার অন্যদিকে নতুন চিন্তা হলো খাবার খেয়ে কোনো অসুবিধায় পড়বেন না তো ভিভিআইপিরা?
একটু পর ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার এসে পৌঁছল এবং সবাই হেলিপ্যাডে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। বেগম জিয়াও ভিভিআইপি রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। গাড়িতে ওঠার আগে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম তিনি মেস পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে ডাকলেন। এমনকি মেসের বাবুর্চি ও ঝাড়ুদারও বাদ পড়ল না। সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন এবং বললেন বাইরে গেলে সাধারণত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়া হয়। অনেক দিন পর ঢাকার বাইরে এসে সাদা ভাত, ডাল ও শাক খেয়ে তিনি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছেন। তার চোখের ইশারায় এডিসি টাকাভর্তি একটি খাম আমার হাতে তুলে দিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে ম্যাডাম নির্দেশ দিলেন বাবুর্চি, ঝাড়ুদার এবং মেসওয়েটারদের যেন এই টাকা বণ্টন করে দিই। টাকা হাতে নিয়ে আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। ম্যাডাম গাড়িতে উঠলেন এবং চলে গেলেন। আমার চোখ ভিজে উঠল। প্রথামাফিক স্যালুট করতেও ভুলে গেলাম।
সাধারণ সৈনিকদের মা-রূপী একজন খালেদা জিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, এ কথা ভাবতেই চোখ ভিজে যায়। তাই এ কথা ভাবতে চাই না। ভাবতে চাই দেশের স্বার্থে তার আপসহীন নেতৃত্বের কথা, যিনি বলেছিলেন বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। প্রকৃত অর্থে এই দেশই সব দেশপ্রেমিক নাগরিক বিশেষত সৈনিকদের একমাত্র ঠিকানা। যে কোনো মূল্যে তাই এই দেশকে রক্ষা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব, যা শিখিয়ে গেছেন আমাদের প্রিয় মা বেগম খালেদা জিয়া। ওপারে ভালো থাকুক আমাদের প্রাণপ্রিয় মা।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত মেজর, গবেষক, বিশ্লেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]