

শুধু বাঙালি নয়, বিশ্বের কয়েকটি দেশের মানুষ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য লড়াই করেছেন, জেলজুলুম সহ্য করেছেন, বরণ করেছেন ফাঁসির দড়ি। কেননা ভাষা শুধুই অক্ষর আর ধ্বনির সমষ্টি নয়; ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। কোনো ভাষা যখন হারিয়ে যায়, তখন সেই ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সভ্যতার বহু শতাব্দীর জ্ঞান, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন। নেপালের ‘নেওয়ার’ জনগোষ্ঠীর ‘নেপাল ভাষা’ আন্দোলন ঠিক এমনই এক সংগ্রামের ইতিহাস। যে ইতিহাস আমাদের অনেকেরই অজানা।
‘নেপাল ভাষা’ আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ শুরু হওয়া আন্দোলন নয়। এটি প্রায় আড়াই শতাব্দী ধরে চলমান এক দীর্ঘ প্রতিরোধের নাম। এ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কীভাবে ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, আবার একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ কীভাবে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা দিয়ে সেই দমননীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছে। নেপাল ভাষার ইতিহাস মূলত রাষ্ট্রীয় অবহেলা, দমন ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছে। এ কারণে নেপাল ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার দাবি নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের দলিল।
১৭৬৮ সালে শাহ রাজবংশের উত্থানের পর থেকে নেপালের ভাষা নীতিতে এক মৌলিক পরিবর্তন আসে। গোরখা ভাষাকে রাজদরবার ও প্রশাসনের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এর মাধ্যমে নেপাল ভাষা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা হারাতে শুরু করে। একসময় যে ভাষা রাজকাজ, আদালত ও প্রশাসনে ব্যবহৃত হতো, তা ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এ প্রক্রিয়া রানা শাসনামলে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
রানা শাসনের সময় নেপাল ভাষার বিরুদ্ধে যে দমননীতি চালু হয়, তা নিছক অবহেলা নয়; এটি ছিল একটি সচেতন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। ১৯০৬ সাল থেকে নেপাল ভাষায় লেখা কোনো নথি আদালতে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করা হতো না। নেপাল ভাষায় লেখালেখি করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। বহু লেখক ও চিন্তাবিদকে জরিমানা, কারাদণ্ড, শারীরিক নির্যাতন ও নির্বাসনের শিকার হন। বই বাজেয়াপ্ত করা হয়, নিষিদ্ধ করা হয় ধর্মীয় ভজন গাওয়া, এমনকি টেলিফোনে নেপাল ভাষায় কথা বলাও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধে পরিণত হয়। একটি ভাষাকে সামাজিক পরিসর থেকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করার এমন পরিকল্পিত প্রচেষ্টা ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।
তবু ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো, চরম দমনই অনেক সময় প্রতিরোধের জন্ম দেয়। নেপাল ভাষার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। ১৯০৯ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত সময়কাল নেপাল ভাষার নবজাগরণ বা রেনেসাঁ যুগ হিসেবে পরিচিত। এ সময়ে কিছু সাহসী মানুষ রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নেপাল ভাষায় সাহিত্যচর্চা, অনুবাদ, ব্যাকরণ রচনা ও শিক্ষার কাজ শুরু করেন। নিস্থানন্দ বাজ্রাচার্য, সিদ্ধিদাস মহাজু, জগৎ সুন্দর মল্ল ও যোগবীর সিং কংসকার—এ চারজনকে নেপাল ভাষার ‘চার স্তম্ভ’ বলা হয়, কারণ তাদের অবদান ছাড়া ভাষাটির আধুনিক রূপ কল্পনাই করা যায় না।
নিস্থানন্দ বাজ্রাচার্যের প্রকাশিত প্রথম মুদ্রিত নেপাল ভাষার বই ভাষার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। শুক্তরাজ শাস্ত্রীর ব্যাকরণ রচনা ভাষাটিকে একটি প্রমিত কাঠামোর মধ্যে আনতে সাহায্য করে। ধর্মাদিত্য ধর্মাচার্যের সম্পাদিত সাময়িকী কেবল সাহিত্যচর্চার মাধ্যমই নয়, বরং ভাষা আন্দোলনের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। এ সময়েই ‘নেওয়ারি’ নামের পরিবর্তে ‘নেপাল ভাষা’ নামটির স্বীকৃতির দাবিও প্রথম সুসংগঠিতভাবে উত্থাপিত হয়, যা পরবর্তীকালে আন্দোলনের একটি কেন্দ্রীয় দাবিতে পরিণত হয়।
নেপাল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৪০ সাল এক বেদনাবিধুর অধ্যায়। এ সময়ে রানা সরকার গণতন্ত্রকামী ও ভাষাসংগ্রামীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালায়। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ভাষাসংগ্রামী শুক্তরাজ শাস্ত্রীকে ফাঁসি দেওয়া হয়, যা নেপালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক মর্মান্তিক ঘটনা। বহু লেখক ও সাহিত্যিককে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে বসেই চিত্তধর হৃদয় তার অমর সাহিত্যকর্ম সুগত সৌরভ রচনা করেন। বুদ্ধের জীবন অবলম্বনে লেখা এ মহাকাব্য নেপাল ভাষা সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন। সিদ্ধিচরণ শ্রেষ্ঠ কারাবাসের মধ্যেই যে কবিতাগুলো রচনা করেন, সেগুলো পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের প্রেরণায় পরিণত হয়। এ ঘটনাগুলো প্রমাণ করে রাষ্ট্র লেখককে বন্দি করতে পারে, কিন্তু চিন্তাকে বন্দি করতে পারে না।
রানা শাসনের দমননীতির বিরুদ্ধে থেরবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নেপাল ভাষায় ধর্মীয় শিক্ষা ও গ্রন্থ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সরকার ভিক্ষুদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং ১৯৪৪ সালে আটজন ভিক্ষুকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে সরকার এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ভিক্ষুদের সাহিত্য ও ধর্মীয় কার্যক্রম নেপাল ভাষার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গভীর ভূমিকা রাখে।
রাষ্ট্রীয় দমন থেকে রক্ষা পেতে নেপাল ভাষা আন্দোলন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ভারত ও তিব্বতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাসী নেওয়াররা সংগঠন গড়ে তোলেন, সাময়িকী প্রকাশ করেন এবং ভাষা আন্দোলন বাঁচিয়ে রাখেন। কলকাতা, কালিম্পং ও লাসাভিত্তিক ব্যবসায়ীদের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থন ছাড়া এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হতো না। নেপালের বাইরে থেকেও যে একটি ভাষা আন্দোলন এত শক্তভাবে পরিচালিত হতে পারে, নেপাল ভাষা আন্দোলন তার এক বিরল উদাহরণ।
১৯৫১ সালে রানা শাসনের পতনের পর প্রথম গণতান্ত্রিক যুগে নেপাল ভাষা কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ পায়। বই, সাময়িকী ও সংবাদপত্র প্রকাশ শুরু হয়। রেডিও নেপালে নেপাল ভাষায় সংবাদ সম্প্রচার ভাষার জন্য একটি বড় অর্জন ছিল। শিক্ষাব্যবস্থায় নেপাল ভাষা ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থী এ ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ পায়। এ সময়কালকে নেপাল ভাষা শিক্ষার একটি স্বর্ণযুগ বলা যায়।
কিন্তু এ অগ্রযাত্রা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৬০ সালে পঞ্চায়েত শাসনব্যবস্থা চালু হলে আবারও ‘এক ভাষা’ নীতি প্রাধান্য পায়। নেপাল ভাষাকে গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৬৫ সালে রেডিও নেপাল থেকে নেপাল ভাষার সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হলে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। মিছিল নিষিদ্ধ থাকায় কবিতা, গান ও সাহিত্যসভাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রধান মাধ্যম। এ আন্দোলন ইতিহাসে ‘বাইস সালিয়া আন্দোলন’ নামে পরিচিত। যদিও এ আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে পারেনি, তবে এটি একটি নতুন প্রজন্মের ভাষাকর্মী তৈরি করে। এ প্রজন্ম পরবর্তী দশকগুলোয় নেপাল ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়। পঞ্চায়েত শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন নেপাল ভাষার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়। মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং ভাষাটি ধীরে ধীরে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে হারিয়ে যেতে থাকে।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মাধ্যমে পঞ্চায়েত শাসনের অবসান ঘটে এবং নেপাল একটি বহুভাষিক রাষ্ট্র হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। তবে বাস্তবে নেপাল ভাষার অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হয়নি। ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্থানীয় সরকারে নেপাল ভাষার ব্যবহার অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে আন্দোলন নতুন করে তীব্র হয়। এ রায়ের প্রতিবাদে প্রতি বছর ১ জুন ‘কালো দিবস’ পালিত হয়, যা নেপাল ভাষা আন্দোলনের এক প্রতীকী অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
২০০৬ সালের পর লোকতন্ত্র যুগে ভাষাগত স্বাধীনতা কিছুটা বাড়লেও নেপাল ভাষা আজও সূক্ষ্ম বৈষম্যের শিকার। অনেক ক্ষেত্রে নেপাল ভাষায় আবেদন গ্রহণ করা হয় না, সংগঠনের নাম নিবন্ধনে বাধা দেওয়া হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, নেপাল ভাষা আন্দোলন এখনো শেষ হয়নি; এটি নতুন বাস্তবতায় নতুন রূপে চলমান।
নেপাল ভাষা আন্দোলন আমাদের শেখায় যে, ভাষা রক্ষা মানে কেবল শব্দ রক্ষা নয়; এটি একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সম্মান রক্ষার সংগ্রাম। এ আন্দোলন নেপালের ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্বের এক জীবন্ত দলিল, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভাষা বাঁচলে মানুষ বাঁচে, আর মানুষ বাঁচলেই ইতিহাস বেঁচে থাকে।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক