

ফিলিপাইন বিপ্লব বিশ্বজুড়ে ‘পিপল পাওয়ার রেভল্যুশন’ (People Power Revolution) বা ‘এডসা (EDSA) বিপ্লব’ নামেও পরিচিত। আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান। ১৯৮৬ সালের ২২ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী এই বিপ্লব ২০ বছরের স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতন ঘটায়। এর মধ্য দিয়ে ফিলিপাইনে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হয়।
এই বিপ্লবের বীজ বপন করা হয় মূলত ১৯৮৩ সালে। সে সময় জনপ্রিয় বিরোধীদলীয় নেতা বেনিগনো অ্যাকুইনো জুনিয়রকে নির্বাসন থেকে ফেরার পথে বিমানবন্দরে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ড মার্কোস সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষের দাবানল জ্বালিয়ে দেয়। অর্থনৈতিক মন্দা, চরম দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো অপরাধের ফলে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মার্কোস ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে নিজেকে জয়ী ঘোষণা করেন। এ সময় জনগণের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে এবং তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
বিপ্লবের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ম্যানিলার ‘এপিফানিও ডি লস সান্তোস অ্যাভিনিউ’ বা এডসা (EDSA) সড়ক। গির্জার সমর্থন এবং বিরোধী নেত্রী কোরাজন অ্যাকুইনোর আহ্বানে লাখ লাখ সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। মজার ব্যাপার হলো, এ বিশাল জনসমুদ্রের অস্ত্র ছিল ফুল, মোমবাতি আর প্রার্থনা। যখন মার্কোস সরকার বিক্ষোভ দমনে ট্যাংক এবং সশস্ত্র সেনা পাঠায়, তখন সাধারণ মানুষ ও সন্ন্যাসিনীরা ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং সেনাদের ফুল উপহার দেন। জনস্রোতের এ ভালোবাসা ও সাহসের কাছে নতিস্বীকার করে অনেক সেনাসদস্য বিদ্রোহ করেন এবং জনগণের সঙ্গে যোগ দেন।
পতন ঘটে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের। ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে কোরাজন অ্যাকুইনো ফিলিপাইনের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। একই দিনে জনরোষ থেকে বাঁচতে ফার্দিনান্দ মার্কোস তার পরিবারসহ দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। কোনো রক্তপাত ছাড়াই একটি শক্তিশালী স্বৈরশাসনের পতন ঘটে, যা বিশ্বকে অবাক করে দেয়।
ফিলিপাইন বিপ্লব প্রমাণ করে যে, জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি এবং অহিংস আন্দোলন যে কোনো কঠোর স্বৈরশাসনকেও উপড়ে ফেলতে পারে। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুধু ফিলিপাইনের মানুষ মুক্তি পায়নি। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়া ও পূর্ব ইউরোপের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এটি বিরাট অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে। এ বিপ্লব ইতিহাসের পাতায় বীরত্ব আর শান্তির এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।