

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরে বাংলাদেশ। তৎকালীন সংসদ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে মন্ত্রিপরিষদশাসিত সরকার পদ্ধতি চালু হয় দেশে। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে পঞ্চম সংসদ হয়ে ওঠে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণ মানুষের ব্যাপক কৌতূহল দেখা যায় সংসদ অধিবেশন ঘিরে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যরা তুমুল বিতর্কে প্রাণবন্ত রাখে অধিবেশন। বিশেষ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এমপিদের বাহাসে জমজমাট হয়ে ওঠে সংসদীয় রাজনীতি। একপর্যায়ে বিরোধী দলের এমপিরা সংসদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অধিবেশন কক্ষ ছেড়ে রাজপথে নামে দাবি আদায়ে। সংবিধানে নেই বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি না মেনে ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন করে বিএনপি সরকার। সংক্ষিপ্ত ওই সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। সাধারণ মানুষের ধারণা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকায় দেশের প্রধান দুটি দল পর্যায়ক্রমে ক্ষমতা গ্রহণের সুযোগ পায়। একবার সরকারি দল তো আরেকবার বিরোধী দল। এক-এগারোর ষড়যন্ত্রী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগপর্যন্ত এভাবেই চলছিল।
সেনাসমর্থিত উদ্দীনস সরকার রাজনীতিবিদদের শিক্ষা দিতে নানা হয়রানিমূলক উদ্যোগ নেয়। তখন মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যাপক আলোচিত বিষয়। রাজনীতি থেকে দুই নেত্রীকে বাদ দেওয়ার পক্ষে সুশীল সমাজ থেকেও সহমত জানায় কেউ কেউ। দেশি-বিদেশি চাপ ও গণরোষের ভয়ে দুই বছরের মাথায় নবম সংসদ নির্বাচন দেয় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। নির্বাচনের আগে তাদের নানামুখী দৌড়ঝাঁপ ও গোপন সমঝোতার সন্দেহ প্রকাশ পায় নির্বাচনী ফলাফলে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা (২৩০ আসন) নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। ক্ষমতায় বসেই ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিন সরকারকে দায়মুক্তি দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে ইতিহাসের দুর্বল বিরোধী দলে নাম লেখায় বিএনপি। সংসদে কোণঠাসা হয়ে পড়ে তারা। বাধ্য হয়ে রাজপথে নেমে এক দীর্ঘ মজলুমের জীবন বেছে নেয় দলটি। অন্যদিকে নির্বাচিত সরকার গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ফ্যাসিস্ট হিসেবে আগে বাড়তে থাকে।
দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় শুরু করেন নবম সংসদের সংসদ নেত্রী ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে ১৯৯৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে পঞ্চম সংসদ থেকে ১৪৭ সংসদ সদস্যসহ পদত্যাগ করেন তিনি। সেই শেখ হাসিনা আজীবন ক্ষমতায় থাকার মানসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেন। সত্যিকারের বিরোধী দলকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন সংসদ থেকে। রাজপথে নামে বিএনপির সংসদীয় দল। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে হাসিনা সরকার। বিরোধী মত দমনে কড়া বার্তা দেয় তারা। আওয়ামী লীগ শুরুতে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ এরপরে ‘গণতন্ত্রের আগে উন্নয়ন’ বলে সবক দেয়। অনুসারী বুদ্ধিজীবীরা সেই অনুযায়ী বয়ান তৈরি করে। নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করে নির্বাচনের নামে প্রহসনে ডাকে বিরোধী দলকে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ-বর্জন কোনোটাতেই সুবিধা করতে পারে না বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। তবে, প্রতিবার গৃহপালিত জাতীয় পার্টি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বিরোধী দলের ভূমিকায় অভিনয় করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। দশম, একাদশ, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে একই সার্কাস অনুষ্ঠিত হয়। কখনো দিনের ভোট রাতে, কখনো পাতানো, কখনোবা আমি-তুমি নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির সঙ্গে রসিকতা করেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার। অসহায় জনগণ ভাগ্যদোষ মনে করে শেখ হাসিনাকে আজীবনের প্রধানমন্ত্রী ভাবা শুরু করে। তবে, সবকিছুর যেমন শেষ থাকে; শেখের বেটিরও শেষ দেখা দেয় দুই হাজার চব্বিশের জুলাইয়ের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে।
শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচন, সংস্কার ও বিচারকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। তবে মাঝেমধ্যেই লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এতে করে নির্বাচন নিয়ে বারবার জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া তার নিয়োগকর্তা ছাত্রনেতা এবং তাদের অভিভাবক জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মব ও নির্বাচন পেছানোর পাঁয়তারা শঙ্কিত করেছে জাতিকে। তবে মুক্তিযুদ্ধ এবং দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে বিএনপির জোরালো অবস্থানের কারণে মেঘ কেটে যায়। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পেয়েছে বিএনপি জোট। এ ঘটনা নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে শঙ্কা জাগে ঘরপোড়া গরুর মতো জনগণের মনে।
আগামীকাল বসতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত, আলোচিত ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন। নানা কারণে এবারের সংসদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত তিনটি সংসদ অকার্যকর থাকায় সংসদীয় রাজনীতির সৌন্দর্য ও গুরুত্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে জাতি। জীবনে প্রথম এবার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে কয়েক কোটি ভোটার। এর মধ্য থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। আওয়ামী লীগ গত তিনটি নির্বাচনে অন্যদের বঞ্চিত করেছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! এবার শুধু তারা নয়, তাদের গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও সংসদে অনুপস্থিত। ৭৭টি আসন নিয়ে বিরোধী দলে আছে ক্ষমতাসীন বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট। এরই মধ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা এবং শরিক দল এনসিপির নাহিদ ইসলাম বিরোধী দলের চিফ হুইপ মনোনীত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগ সদস্যই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। কেউ কেউ রাজনীতিতেও একেবারে নতুন। মাঠের রাজনীতি আর সংসদীয় রাজনীতির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সংসদীয় রীতিনীতি রীতিমতো শেখার বিষয়। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের নতুন সংসদ সদস্যদের সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনি চিফ হুইপ নিযুক্ত হয়েছেন। আরও ছয়জনকে হুইপ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে চিফ হুইপ অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য হলেও বাকিদের বেশিরভাগই এবারই প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন। অন্য এমপিদের হুইপিং করার জন্য সাধারণত আগে অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য থেকে বেছে নেওয়া হতো। এখনো স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার কাকে করা হবে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিরোধী দলের কাছে ডেপুটি স্পিকারের নাম চাইলেও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার কথা। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল কতটুকু উদারতা দেখাবে, তা হয়তো সময় বলে দেবে। তা ছাড়া, গত সংসদের স্পিকার পলাতক, ডেপুটি স্পিকার কারাগারে। রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন অধিবেশন তাদের পরিচালনা করার কথা। সিনিয়র কোনো সংসদ সদস্য সভাপতিত্ব করে হয়তো এ জটিলতা নিরসন করবেন। এ ছাড়া রয়েছে অনেক অমীমাংসিত ঐকমত্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত হবে নাকি বেআইনি তকমা পাবে সেটাও দেখার বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তা না হলে এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে প্রথম অধিবেশনেই উত্তপ্ত হতে পারে জাতীয় সংসদ। তা ছাড়া উচ্চকক্ষ গঠন নিয়েও হতে পারে উঁচুমানের জটিলতা। মোট কথা, এবারের সংসদ অনেক নতুন রসদ জোগাবে রাজনীতিতে।
ফ্যাসিস্ট আমলের দেড় দশকের অবসান এবং দেড় সহস্রাধিক প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত ত্রয়োদশ সংসদ নানা কারণেই মুখরিত হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। আইনের চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি চলবে আবেগের ঝর্ণাধারা। এরই মধ্যে বেশ কিছু বিষয় পেকে রয়েছে, যা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হবে। এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশন হওয়ায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা মেনে উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এ নিয়ে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে আসছে বিরোধী দল। এনসিপি বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করে আসছে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি ঘিরে একাধিকবার জঘন্য মব সৃষ্টি করা হয়েছে। সাংবিধানিক শূন্যতা ঠেকাতে বিএনপি বরাবর রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করে এসেছে। এখন তার ভাষণে বিএনপি তোষণ এবং শেখ হাসিনার শোষণকাল বিধৃত হচ্ছে। তার ভাষণ কেন্দ্র করে উদ্বোধনী অধিবেশন থেকে জামায়াত জোট ওয়াকআউট করতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ওয়াকআউট সংসদীয় আচরণবিধিভুক্ত। একমত না হলে হেঁটে বেরিয়ে যাবে। তবে নির্দিষ্ট সময় পর ফিরে আসতে হয়। যতবার দ্বিমত, ততবার ওয়াকআউট করা যাবে। কিন্তু অতীতের মতো সংসদ বর্জন বা পদত্যাগ না করাই ভালো। যত সংকটই আসুক, সংসদই হোক গণতন্ত্রের সংসার। শুধু প্রাণবন্ত নয়, কার্যকর হোক সংসদ। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত সংসদ হোক সর্বজনীন রাজনীতির সূতিকাগার।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি