

ঈদযাত্রা আনন্দের, ভালোবাসার এবং পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এক দারুণ উপলক্ষ; কিন্তু এই আনন্দ যদি প্রাণহানির মাধ্যমে ম্লান হয়, তাহলে তা পুরো জাতির জন্যই বেদনার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতি বছর ঈদ কেন্দ্র করে আনন্দযাত্রা অনেক ক্ষেত্রে রূপ নেয় শোকযাত্রায়। এবারের ঈদেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সড়ক, রেল ও নৌ—তিনটি পরিবহন খাতেই ঘটেছে একাধিক দুর্ঘটনা। এসব ঘটনায় প্রাণহানিও উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সড়কপথে প্রাণহানির সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবন। এবার অনেক প্রশ্নও সামনে এসেছে—কেন এই পুনরাবৃত্তি? কেন আমরা নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে পারছি না?
ঈদযাত্রার সময় সড়ক দুর্ঘটনা যেন ভয়াবহ চক্রে আবদ্ধ। অতিরিক্ত যাত্রীবহন, বাস মালিকদের লোভ, ফিটনেসহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি; সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। এবারের ঈদে মহাসড়কগুলোয় দীর্ঘ যানজটের পাশাপাশি দেখা গেছে বাসচালকদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা। যাত্রী তুলতে গিয়ে এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বহু যান। অনেক ক্ষেত্রে বাসের সঙ্গে ট্রাক বা মাইক্রোর সংঘর্ষে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন; যা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। ঈদের সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হলো ফিটনেসহীন যানবাহন। অনেক পুরোনো ও অচলপ্রায় বাস ঈদের আগে রাস্তায় নামানো হয়; যেগুলোর ব্রেক বা স্টিয়ারিং সিস্টেমে থাকে সমস্যা। মূলত এসব গাড়িই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে থাকে। প্রশ্ন হলো—সমস্যাগ্রস্ত এসব যান কীভাবে সড়কে নামার অনুমতি পায়?
এবার আসি রেলের কথায়। নিরাপদ যাত্রার মাধ্যম হিসেবে দেখা হলেও এই রেলপথকেও নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। ঈদের সময় ঘরমুখো মানুষের চাপে টিকিট সংকটের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে ট্রেনের ছাদে, দরজায় বা বগির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে যাত্রা করেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদের পরদিন ২২ মার্চ রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাতে জানা যায়, রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত দুই গেটম্যানের কেউ না থাকায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। তাহলে বলা যায়, দায়িত্ববানদের দায়িত্বহীনতার কারণে এমন দুঃখজনক ঘটনা। আবার বিভিন্ন স্থানে লাইনচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে, যা রেল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অবহেলার ইঙ্গিত বৈ কিছু নয়।
নৌপথে দুর্ঘটনার চিত্রও উদ্বেগজনক। ঈদের সময় লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রীবহন নিয়মিত ঘটনা। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ও রাজবাড়ীর দৌলতপুরের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে আমরা কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।
তবে এসব পরিস্থিতি নতুন নয়। প্রতি বছরই ঈদ এলে আমরা একই চিত্র দেখি, কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা হয়, তারপর সবকিছু আবার আগের মতোই চলতে থাকে। এর মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি।
সরকারের করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে সড়ক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি। মহাসড়কগুলো নিরাপদ করতে হলে নিয়মিত যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। ফিটনেসহীন যানবাহন কোনোভাবেই সড়কে নামতে পারবে না—এমন কঠোর অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে চালকদের লাইসেন্স যাচাই এবং তাদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি। অদক্ষ চালকের হাতে স্টিয়ারিং মানেই সম্ভাব্য দুর্ঘটনা।
প্রয়োজন ট্রাফিক আইন প্রয়োগেও দৃঢ়তা। অনেক সময় দেখা যায়, আইন থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ নেই। অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং এবং নিয়ম ভঙ্গের জন্য তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে প্রতিটি মহাসড়কে সিসিটিভি ও স্পিড মনিটরিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে; যাতে আইন ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
রেলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ট্রেনের সংখ্যা ও বগি বাড়াতে হবে; যাতে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ কমে। পাশাপাশি রেললাইন ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে জোর দেওয়া প্রয়োজন। যাত্রীদের ছাদে বা ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ওঠা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
নৌপথে দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রতিটি নৌযানে যাত্রীসংখ্যা সীমা কঠোরভাবে মেনে চলা যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি লাইফ জ্যাকেট, লাইফবয়া এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখার বিষয়টিও বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ছাড়া আবহাওয়া খারাপ থাকলে নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ কঠোরভাবে পালনে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা শুধু চালকের ভুলের ফল নয়, এর পেছনে মালিকপক্ষেরও বড় ধরনের দায় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবহন মালিকরা লাভের আশায় অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ চালক নিয়োগ দেন, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। আবার যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা, ব্রেক বা ইঞ্জিনের ত্রুটি উপেক্ষা করা—এসবও মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নৌপথেও একই চিত্র দেখা যায়; অতিরিক্ত যাত্রী বা মালপত্র বহন, লাইফ জ্যাকেট ও নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, এবং আবহাওয়ার সতর্কতা উপেক্ষা করা—এসবই মালিকদের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ। এ ছাড়া মালিকরা অনেক সময় চালকদের ওপর অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ সৃষ্টি করেন, যার ফলে তারা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালাতে বাধ্য হন। এতে মনোযোগ কমে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অনেক মালিক এসব অনিয়ম করেও পার পেয়ে যান। সুতরাং, সড়ক ও নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে মালিকপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে মালিকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ ছাড়া, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শুধু সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেল ও নৌপথকে আধুনিক ও আকর্ষণীয় করতে হবে। এতে যাত্রীচাপ ভাগ হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে।
এ কথাও বলা প্রয়োজন—সব দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়; যাত্রীদেরও কিছু করণীয় রয়েছে। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, যাত্রীদের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধও গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, যাত্রীদের উচিত ফিটনেসবিহীন বা অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই যানবাহনে না ওঠা। অনেক সময় তাড়াহুড়োর কারণে আমরা ঝুঁকি জেনেও এসব যানবাহনে উঠে পড়ি; যা শেষ পর্যন্ত মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।
দ্বিতীয়ত, বাস বা ট্রেনে ওঠার সময় তাড়াহুড়া বা ধাক্কাধাক্কি না করে নিয়ম মেনে চলা জরুরি। ট্রেনের ছাদে বা দরজায় ঝুলে যাত্রা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নৌপথে যাত্রার সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। তৃতীয়ত, চালক যদি বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান, তাহলে যাত্রীদের উচিত প্রতিবাদ করা। অনেক সময় যাত্রীরা নীরব থাকেন; যা চালকদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। সচেতন যাত্রীই নিরাপদ যাত্রার অন্যতম নিশ্চয়তা। চতুর্থত, যাত্রার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা উচিত। শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়িয়ে আগেভাগে টিকিট কাটা এবং নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করলে ঝুঁকি অনেকটা কমানো সম্ভব।
সবশেষে, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। আমরা অনেক সময় দুর্ঘটনাকে ‘নিয়তি’ বলে মেনে নিই, যা আসলে সঠিক নয়। অধিকাংশ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। নিয়ম মেনে চলা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করলেই এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
এখনই সময় কথার বাইরে গিয়ে বাস্তব, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। কারণ, প্রতিটি দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সমস্যা আমরা জানি, কিন্তু সমাধানে যথেষ্ট দৃঢ় নই। শুধু শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন বা দায়সারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
পথ যদি বারবার রক্তাক্ত হয়, তাহলে তা শুধু একটি যাত্রার ব্যর্থতা নয়—এটি রাষ্ট্রের, সমাজের ব্যর্থতা। তাই এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—আমরা কী প্রতি বছর একই শোকগাথা রচনা করে যাব, নাকি সম্মিলিত উদ্যোগে সেই গল্প বদলে দেব?
নিরাপদ যাত্রা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর এ অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকারের, বাস মালিকদের, চালকের, যাত্রীর—সবার সম্মিলিত দায়িত্বেই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ, মানবিক ও দায়িত্বশীল যাতায়াত ব্যবস্থা। না হলে ঈদের আনন্দ বারবার হারিয়ে যাবে শোকের ভারে, আর আমাদের উৎসব হয়ে উঠবে এক অনন্ত বেদনার স্মৃতি।
সাধারণ নাগরিকদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটা কৌতুক দিয়ে লেখাটা শেষ করছি। ‘রবিন ও সবুজ দুই বন্ধু। তাদের দুজনের বোঝাপড়াও বেশ ভালো। সবুজ একদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে পথে দেখতে পেল জটলা। উকি দিয়ে দেখে বুঝল, তার বন্ধু রবিনের বাবাকে বেঁধে একদল লোক চরমমাত্রায় পেটাচ্ছে। সবুজ মনে মনে ভাবল—‘লোকটা দুষ্টু প্রকৃতির। কিছু একটা ঘটিয়েছে নিশ্চয়ই সে কারণে মার খাচ্ছে।’ একদিন পর বন্ধু রবিনের সঙ্গে দেখা সবুজের, বলল—‘কিরে, কাল দেখলাম তোর বাবাকে একদল লোক বেঁধে পেটাচ্ছে। তোর বাবাতো ভালোই মার খেতে পারে!’ রবিন আক্ষেপ নিয়ে বলল, ‘বেঁধে মারলে তোর বাপও খেতে পারবে!’
লেখক: বার্তা সম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]