

সমাজে মানুষকে আলাদা করে দেখার সবচেয়ে সহজ কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক উপায় হলো তাকে একটি তকমা দিয়ে ফেলা। একবার কোনো মানুষ একটি তকমার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেলে তাকে আর পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; সে হয়ে যায় একটি পরিচয়, একটি পক্ষ অথবা একটি সন্দেহের প্রতীক। ‘এই দলের লোক’, ‘ওই মতের মানুষ’, ‘ওরা’, ‘আমরা’ এ ধরনের বিভাজনের ভাষা ধীরে ধীরে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের জায়গা দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সমাজে তকমা দেওয়া বা ট্যাগিং সংস্কৃতি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; সামাজিক আচরণেরও একটি অংশ হয়ে উঠেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি সবসময় ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। যে শক্তি ক্ষমতায় থাকে, সেই প্রায়ই নির্ধারণ করে কোন পরিচয়টি ‘গ্রহণযোগ্য’ আর কোনটি ‘অগ্রহণযোগ্য’। ফলে তকমাগুলো কখনো স্থায়ী নয়; ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তকমার ভাষা, লক্ষ্য এবং ব্যবহারও বদলে যায়। ঔপনিবেশিক সময়ে শাসকরা সমাজকে বিভক্ত রাখার জন্য ধর্ম, জাতি বা সংস্কৃতির পার্থক্যকে বাড়িয়ে তুলে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করত। ‘সভ্য’ ও ‘অসভ্য’, ‘বিশ্বস্ত’ ও ‘অবিশ্বস্ত’ এ ধরনের শ্রেণিবিন্যাস শুধু প্রশাসনিক ভাষা ছিল না; এগুলো ছিল শাসনের কৌশল। ধীরে ধীরে এ বিভাজনের ভাষা সমাজের ভেতরেও প্রবেশ করে এবং মানুষ একে অন্যকে বোঝার বদলে পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করতে শুরু করে। বিশ্ব ইতিহাসেও তকমা দেওয়ার এ প্রবণতার বহু উদাহরণ রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, বিশেষ করে মধ্যযুগীয় ইউরোপে, অনেক নারীকে ‘ডাইনি’ তকমা দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসেও এ প্রবণতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন তকমা রাজনৈতিক ভাষায় প্রবেশ করে, যেমন—‘রাজাকার’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘বিদেশি এজেন্ট’, ‘নাস্তিক’, ‘মৌলবাদী’, ‘উগ্রপন্থি’ ইত্যাদি। এসব শব্দের অনেকগুলোর গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে, কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্কে অনেক সময় সেগুলো প্রকৃত অর্থের বাইরে গিয়ে ভিন্নমতের মানুষকে আঘাত করার সহজ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাও এ প্রবণতার বাইরে নয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর লক্ষ করা যাচ্ছে, অস্তিত্ব সংকটে ভোগা এবং যোগ্য ও সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি ভীতি পোষণকারী এমন কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী আবারও মানুষকে তকমা দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। যে ধরনের ভাষা ও আচরণ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ভিন্নমত বা সমালোচনাকে যুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করার বদলে মানুষকে দ্রুত কোনো না কোনো তকমার ঘরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা এখনো চোখে পড়ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা কাজ করে। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ের কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর জন্যই তকমার ভাষা ব্যবহার করে। তারা মনে করে কাউকে দ্রুত একটি সন্দেহজনক পরিচয়ের মধ্যে ফেলে দিলে নিজেদের আনুগত্য প্রমাণ করা সহজ হয়। ফলে তকমা দেওয়া একটি রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়, যার উদ্দেশ্য সত্য অনুসন্ধান নয়, বরং প্রতিপক্ষকে দ্রুত দুর্বল করা।
এ প্রবণতা শুধু রাজনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি সমাজের পারস্পরিক আস্থা ও সম্পর্কের ভিত্তিকেও দুর্বল করে। সমাজবিজ্ঞানীরা যাকে ‘সামাজিক পুঁজি’ বলেন, অর্থাৎ পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং সম্পর্কের শক্তি, তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি সেটিকেই ধীরে ধীরে ক্ষয় করে। যখন একজন মানুষকে একটি নির্দিষ্ট তকমার মধ্যে আবদ্ধ করা হয়, তখন তার ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও মানবিকতা আড়াল হয়ে যায়। আমরা তখন আর একজন মানুষকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখি না; দেখি শুধু একটি পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ প্রবণতাকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছে। একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য বা একটি মতের ভিত্তিতে মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে একটি তকমার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। যুক্তি বা সংলাপের জায়গায় অনেক সময় শুরু হয় পরিচয়ের বিচার। ফলে আলোচনা সংকুচিত হয় এবং মেরূকরণ বাড়তে থাকে।
একটি সমাজ দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না যদি তার নাগরিকরা একে অন্যকে শুধু তকমার চোখে দেখে। গণতন্ত্রের শক্তি হলো মতের বৈচিত্র্যকে সহ্য করার ক্ষমতা এবং ভিন্ন মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের সংস্কৃতি। তকমা দেওয়ার রাজনীতি এ দুই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
এ কারণেই এখন হয়তো সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি নতুন করে ভাবা দরকার আমরা কি মানুষকে তকমার মাধ্যমে চিনতে চাই, নাকি মানুষ হিসেবে চিনতে চাই। মতের ভিন্নতা একটি সুস্থ সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই ভিন্নতাকে যদি আমরা শত্রুতার ভাষায় রূপ দিই, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদেরই সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ।
সম্ভবত এখন সময় এসেছে তকমার ভাষা থেকে বেরিয়ে সংলাপের ভাষায় ফিরে যাওয়ার। কারণ, একটি সুস্থ ও শক্তিশালী সমাজের ভিত্তি তকমায় নয়; বরং মানুষের প্রতি মানুষের আস্থায়। এ ক্ষেত্রে আশার বিষয় হলো, ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে যথেষ্ট সংযত ও মার্জিত ভাষা ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু সমস্যা হলো, এ সংযম এখনো পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত হয়নি। নিচের স্তরে, বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর মধ্যে তকমা দেওয়ার চর্চা এখনো অব্যাহত রয়েছে। আশা করি, দলীয় নেতাকর্মীদের এ তকমার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য শীর্ষ নেতৃত্ব দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেবেন। মনে রাখা দরকার, এ দেশে প্রতিটি ক্ষেত্রে সক্ষম মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। অকারণে তকমা দিয়ে যদি সেই মুষ্টিমেয় মানুষদেরও দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার চেয়ে বড় আত্মঘাতী ভুল আর হতে পারে না।
লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়