মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৩ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

উৎসব সবার, সমৃদ্ধি কতজনের

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
উৎসব সবার, সমৃদ্ধি কতজনের

বাংলা নববর্ষ এলেই বাতাসে একটা অন্যরকম গন্ধ মেশে। রাস্তায় লাল-সাদা পোশাকের ঢল, দোকানে দোকানে বৈশাখী সাজ, মেলায় মেলায় মানুষের কোলাহল। এ উৎসব শুধু আনন্দের নয়, এর পেছনে আছে একটি বিশাল অর্থনৈতিক স্রোত, যা প্রতি বছর চুপচাপ বয়ে যায়, কিন্তু গভীরভাবে নাড়া দেয় দেশের অর্থনীতিকে।

রমজান, ঈদ আর পহেলা বৈশাখ। এ তিনটি উৎসব যখন একসঙ্গে আসে, তখন বাজারে টাকার যে স্রোত তৈরি হয়, তা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মেলালে দেখা যায়, শুধু এ মৌসুমে অর্থনীতিতে যোগ হয় অতিরিক্ত দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন। পোশাকের বাজারে যোগ হয় প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকা, নিত্যপণ্যে সাতাশ হাজার কোটি, জাকাত ও ফিতরা বাবদ আসে সাতষট্টি হাজার কোটি টাকা। পরিবহন থেকে পর্যটন, মিষ্টি থেকে মৃৎশিল্প, সবখানেই উৎসবের ছোঁয়া লাগে।

এখানে একটু থামা দরকার। এত টাকা লেনদেন হয়; কিন্তু এ সমৃদ্ধির আলো কি সত্যিই পৌঁছায় সমাজের সবচেয়ে নিচের মানুষটির কাছে?

উত্তর সহজ নয়। গ্রামের তাঁতি যিনি সারা রাত জেগে একটি শাড়ি বোনেন, মাথার ওপরে টিনের চাল, পায়ের নিচে মাটির মেঝে, চোখের সামনে সুতার টানা, তিনি পান মাত্র তিনশ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি। সেই শাড়িই শহরের আলোঝলমলে দোকানে বিক্রি হয় পাঁচ হাজার টাকায়। মাঝখানে যে মুনাফার পাহাড়, তার সিংহভাগ চলে যায় শহরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের হাতে। গ্রামীণ উৎপাদক আর শহুরে ভোক্তার মাঝখানে যে দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল, সেটাই আসল বাধা। বৈশাখী অর্থনীতির বড় সীমাবদ্ধতা এখানেই।

পহেলা বৈশাখের শেকড় কিন্তু এ শহরে নয়। বাংলা সনের জন্ম হয় ১৫৮৫ সালে, সম্রাট আকবরের আমলে, মূলত কৃষকের কাছ থেকে ফসলের মৌসুম বুঝে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য। সেই মাঠের উৎসব, সেই ধানের গন্ধমাখা উৎসব, কালের পরিক্রমায় আজ হয়ে উঠেছে শহরের উৎসব। রমনার বটমূলে শত শত মানুষের ভিড়, মঙ্গল শোভাযাত্রার বর্ণিল আয়োজন, অভিজাত রেস্তোরাঁয় পান্তা-ইলিশের পাত। কিন্তু গ্রামের মানুষ পান্তা-ইলিশ খায় না শখ করে। ঠান্ডা ভাতের সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা আর একটু নুন, এটাই ছিল তার ভোরের সংসার। শহর সেই গ্রামীণ সারল্যকে নিয়ে বানিয়েছে উৎসবের মেনু আর সেই রেওয়াজের কারণে চৈত্রসংক্রান্তির আগে থেকেই ইলিশের দাম ছুঁয়ে যায় আকাশ। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েন নদীতে। এটা উৎসবের একটি কুফল, যা নিয়ে কথা খুব কম হয়।

তবু বৈশাখী মেলা গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে প্রাণ সঞ্চার করে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বটতলার মেলায় তাঁতের কাপড়, মাটির হাঁড়িপাতিল, বাঁশ-বেতের ঝুড়ি, লোকজ খেলনা বিক্রি হয়। সেই কারুশিল্পী, যিনি ভোর থেকে উঠোনে বসে মাটি মাখেন, সারা বছরের সুখ-দুঃখের হিসাব কষেন এই একটি মৌসুমের দিকে তাকিয়ে। ফুল ব্যবসায়ীরা বৈশাখ ঘিরে ষাট থেকে সত্তর কোটি টাকার ফুল বিক্রির স্বপ্ন দেখেন। মিষ্টির কারখানায় উৎপাদন তিন গুণ বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা একটু বাড়তি আয়ের সুযোগ পান।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো কাঠামোগত বৈষম্যে। বৈশাখী অর্থনীতির মোট আকার অর্থনীতিবিদদের অনুমানে পনেরো থেকে বিশ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এ বিপুল অর্থের বণ্টন কীভাবে হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণাও হয়নি। অথচ এ তথ্য জানা দরকার ছিল। কারণ উৎসবের আনন্দ যদি শুধু সম্পদশালীদের আনন্দ হয়, তাহলে সেই অর্থনীতির সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায় না।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে স্বাভাবিকভাবেই। উৎসবের এ টাকার জোয়ার কি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়? বাজারে বাড়তি টাকার সরবরাহ হলে চাহিদা বাড়ে আর চাহিদার সঙ্গে সরবরাহ না মিললে দাম ওঠে। উৎসব মৌসুমে এটাই ঘটে। সরকারি ও বেসরকারি বোনাস, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং

জাকাত-ফিতরার অর্থ একসঙ্গে বাজারে এলে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। সেই মানুষটির কথা ভাবুন যিনি দিনমজুর, যার বোনাস নেই, উৎসব ভাতা নেই। তিনি কিন্তু এ মূল্যবৃদ্ধির শিকার হন ঠিকই। উৎসব তার কাছে আনন্দের নয়, বাড়তি চাপের। বাজারে গিয়ে থলে ভরতে পারেন না, ফিরে আসেন মাথা নিচু করে।

হালখাতার প্রসঙ্গ এখানে না আনলেই নয়। এক সময় বাংলা নববর্ষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার ছিল এটি। ব্যবসায়ীরা পুরোনো বছরের বাকি আদায় করতেন, নতুন বছরের খাতা খুলতেন, খদ্দেরদের মিষ্টি খাওয়াতেন। সেই দোকানের বারান্দায় বসে মিষ্টির ঠোঙা হাতে খদ্দেরের সঙ্গে যে গল্প হতো, তার মধ্যে একটি মানবিক উষ্ণতা ছিল এবং একটি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলাও। নগদ কেনাবেচার প্রসার ঘটায় বাকির পরিমাণ কমেছে, হালখাতাও ফিকে হয়ে গেছে। এটা একটি সাংস্কৃতিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলারও ক্ষতি।

পহেলা বৈশাখের সম্ভাবনা কিন্তু অনেক বড়। বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় আশি লাখ ডলারের হস্তশিল্প বিদেশে রপ্তানি হয়। সঠিক পরিচর্যা আর নীতি সহায়তা পেলে এ সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়তে পারে। বৈশাখী মেলাকে যদি শুধু উৎসবের আয়োজন না ভেবে কারুশিল্পীদের জন্য একটি নিয়মিত বিপণন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতি অনেক বেশি সুফল পাবে। ই-কমার্সের মাধ্যমে গ্রামের উৎপাদককে সরাসরি শহরের ক্রেতার কাছে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে। সেই মাটির পাত্র বানানো মৃৎশিল্পী, সেই নকশিকাঁথার কারিগর, তাদের হাতের কাজ যেন শুধু মেলার একটা কোণে না থেকে পৌঁছে যায় শহরের ড্রয়িং রুমে, দেশের বাইরেও।

উৎসব মানুষকে বৃহৎ করে তোলে, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন। সেই বৃহত্তর আলো যেন শুধু মঙ্গল শোভাযাত্রায় না থেমে পৌঁছে যায় দূরের গ্রামের তাঁতির ঘরে, কারুশিল্পীর উঠানে, মেলার প্রান্তিক বিক্রেতার হাতে, যিনি ভোর থেকে রোদে বসে আছেন, একটু বিক্রির আশায়, একটু স্বীকৃতির আশায়। তবেই উৎসবের অর্থনীতি সত্যিকারের অর্থবহ হয়ে উঠবে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পদত্যাগী মন্ত্রীর বাসায় খিচুড়ি, প্রতিমন্ত্রীর সভা শেষে বিরিয়ানি দিয়ে আপ্যায়ন

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

১০

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১১

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১২

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১৩

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৪

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৫

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৬

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৭

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৮

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

১৯

ছাত্রলীগ নেতা ডেবিট আটক

২০
X