

গত রোববার সন্ধ্যায় বুদাপেস্টে থাকা মানে ছিল ডানিউব নদীর তীরে আবার ইতিহাস তৈরি হতে দেখা। আলোকিত পার্লামেন্ট ভবনের বিপরীতে নদীর ধারে যখন উচ্ছ্বসিত জনতা জড়ো হয়ে ‘রিয়া রিয়া হাঙ্গেরিয়া’ এবং ‘হাঙ্গেরি ইউরোপ’ স্লোগান দিচ্ছিল, তখন বোঝা যাচ্ছিল এই নির্বাচনে পিটার মাগইয়ারের তিসা পার্টির বড় জয় শুধু একটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই বিজয় ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য ভালো খবর। একই সঙ্গে এটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য খারাপ খবর, তারা ভিক্টর অরবানের শাসনের সমর্থক। এখন মূল প্রশ্ন হলো—হাঙ্গেরি কি প্রথম দেশ হিসেবে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি পপুলিস্ট (জনতাবাদী) শাসন থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে এবং ইউরোপ কি এ পরিবর্তন সফল করতে দেখাতে পারবে যথেষ্ট রাজনৈতিক ইচ্ছা।
শুক্রবার সন্ধ্যায় হিরোস স্কয়ারে বিপুল সংখ্যক তরুণের ভিড়ে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের শক্তি অনুভব করা যাচ্ছিল। ১৯৮৯ সালে যেখান থেকে তরুণ ভিক্টর অরবান কমিউনিস্ট শাসন শেষ করার ডাক দিয়েছিলেন, সে জায়গাতেই এবার নতুন প্রজন্ম তার নেতৃত্বাধীন শাসনের অবসান চাইছিল। তারা স্লোগান দিচ্ছিল ফিদেস পার্টির বিরুদ্ধে এবং আবারও বলছিল রাশিয়াকে চলে যেতে হবে। কারণ, এখন সবাই জানে, বর্তমান অরবান মূলত পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
শনিবার সন্ধ্যায় বুদা অঞ্চলে অরবানের শেষ নির্বাচনী ভাষণ শুনতে গিয়ে এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। পুরো আয়োজন ছিল সাজানো, পতাকা, মাইক আর আলো দিয়ে ভরপুর। কিন্তু সেখানে প্রাণের উচ্ছ্বাস ছিল না। বরং তা ক্লান্ত মানুষের এক ছোট সমাবেশের মতো মনে হচ্ছিল। অরবান নিজেও ক্লান্ত, বিরক্ত এবং কিছুটা রাগান্বিত ছিলেন। এমনকি তিনি তরুণদের নিয়েও অভিযোগ করেন। তখন মনে হচ্ছিল তিনিই যেন এখন সেই পুরোনো শাসনের প্রতীক। ফেরার পথে বাসে একজন নারী আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছিল, এ সমাবেশে অংশ নিতে তারা কত টাকা পেয়েছে।
নির্বাচনের দিন সকাল পর্যন্তও ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড ছাড়ালে আশাবাদ বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা ৭টায় ভোট শেষ হওয়ার পর দ্রুতই বোঝা যায় যে, তিসা পার্টি বড় ব্যবধানে জিতছে। মানুষের ইচ্ছা এতটাই প্রবল ছিল যে, ভোটে কারচুপি, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা ভোট কেনার চেষ্টা কিছুই তা থামাতে পারেনি। রাত ৯টার কিছু পর মাগইয়ারের ফেসবুকে একটি বার্তা আসে, অরবান তাকে ফোন করে পরাজয় স্বীকার করেছেন। এরপরই উদযাপন শুরু হয়। অনেকেই আনন্দে বলছিল অরবান চলে গেছে।
সেই রাতে দানিউবের তীরে মাগইয়ার তার বিজয় ভাষণ দেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন হাঙ্গেরিকে এমন একটি দেশ বানানোর, যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। তিনি সংবিধানিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার এবং ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ার কথা বলেন। জনতা তখন ইউরোপের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিল।
পরের দিন থেকে শুরু হয় বাস্তব বিশ্লেষণ। এ পরিবর্তন কি সত্যিই সম্ভব? ১৯৮৯ সালের মতো বড় ঘটনা না হলেও অনেকেই এটিকে একই ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখছে। নির্বাচনে বড় জয়ের ফলে তিসা পার্টি সংসদে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, যা দিয়ে তারা সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে। এতে তারা অনেক বাধা অতিক্রম করতে পারবে, যেগুলো অন্য দেশগুলোয় সমস্যা তৈরি করছে। তবে প্রেসিডেন্ট ও সাংবিধানিক আদালত এখনো চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ফিদেস পার্টি কতটা ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং অরবান কতটা বাধা দেয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। তবুও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।
অর্থনৈতিক দিকটি আরও কঠিন। হাঙ্গেরির অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ফিদেস এরই মধ্যে এ বছরের বাজেটের বড় অংশ খরচ করে ফেলেছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা নেই। মাগইয়ারের সামাজিক সুবিধা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তিসা পার্টি দুর্নীতির মাধ্যমে নেওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কথা বলছে, কিন্তু তা সহজ হবে না। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নের আটকে থাকা বিপুল অর্থ দ্রুত পাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোপের দেশগুলোকে এ পরিবর্তনকে সমর্থন করা উচিত। তবে তা শর্তহীন নয়। শর্তগুলো শুধু কাগুজে নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব রাজনৈতিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে হওয়া দরকার। যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা।
বুদাপেস্টের রাস্তায় তরুণদের ইউরোপের পক্ষে ইতিবাচক স্লোগান দেওয়া দেখে মনে হয়েছে এটি যেন হাঙ্গেরির ইউরোপে ফিরে আসার আরেকটি অধ্যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও এখানে দায়িত্ব রয়েছে। কারণ, অতীতে তারা অরবানের শাসনকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছে। বিপুল অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যবহৃত হলেও তা থামাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। অনেক ইউরোপীয় নেতা দীর্ঘদিন অরবানকে সহ্য করেছেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ ঘটনা দেখাতে পারে যে পপুলিস্ট শাসন থেকেও বেরিয়ে আসার পথ আছে। ১৯৮৯ সালে হাঙ্গেরি যেমন কমিউনিজম থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তেমনি ২০১০ সালে তারা দুর্বল গণতান্ত্রিক শাসনে ঢুকে পড়ে। এখন যদি তারা সফলভাবে সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে তা বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
লেখক: ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি