মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শ্যামসুন্দর সিকদার
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর সেবামনোবৃত্তি কীভাবে তৈরি হবে

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর সেবামনোবৃত্তি কীভাবে তৈরি হবে

পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে আমলাতন্ত্র নেই। এ আমলাতন্ত্র যাদের নিয়ে, তাদের আমাদের দেশের সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বলে। এখানে আবার ‘কর্মচারী’ শব্দটার মধ্যে কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত। আর আমলা দুই রকমের হয়—সামরিক আমলা ও বেসামরিক আমলা। কিন্তু দেশে কার্যত আমলা বলতে অনেকেই শুধু বেসামরিক আমলাকেই বোঝে, তাও আবার ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদেরই প্রধানত মনে করা হয়। কারণ, নীতিনির্ধারণে ও দেশ পরিচালনায় তারা সংশ্লিষ্ট। আর জনগণ তাদের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের সেবা পেয়ে থাকে।

যাক, আমি আজ আলোচনা করব ওই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সেবার মনোবৃত্তি প্রসঙ্গে। আমি যখন চাকরি করতাম তখন এবং এখন যা দেখেছি—তাতে আমার অভিজ্ঞতা হলো, জনগণকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ‘কতিপয়’ কর্মচারির মন-মানসিকতা ইতিবাচক নয়। তাই তাদের সেবা মনোবৃত্তির দুর্বল দিকটা প্রশ্নবিদ্ধ করে পুরো পেশাদারিত্বকে। আমি বলি, অনেক সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী আছেন, যাদের সেবা প্রদানে আন্তরিকতা ও কর্মতৎপরতা খুবই প্রশংসাযোগ্য। তারা প্রকৃতই জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু সমস্যা রয়েছে ওই যে বললাম কতিপয়ের মধ্যে।

দেশের প্রচলিত আইনে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে সেবা প্রদানের নিয়ম আছে। আর সেখানে সংশ্লিষ্ট সেবাপ্রত্যাশী ওই নিয়মে সহজেই সেবা পাওয়ার কথা; কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, সেবা সহজে মিলে না। বরং হতে হয় নানাভাবে হয়রানি। এ হয়রানির পেছনে কাজ করে ওই ‘কতিপয়’ দুষ্ট প্রকৃতির কর্মচারী বা কর্মকর্তা। আমি আজ এমন কিছু ঘটনা উল্লেখ করব। তবে তার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক অন্য কথা বলি।

প্রকৃতপক্ষে সেবা মনোবৃত্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রথমে নিজ পরিবার থেকে এবং পরে তার শিক্ষাজীবনের পরিবেশ ও শিক্ষকদের কাছ থেকে। সন্দেহ নেই, দেশে পারিবারিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পরিবেশ এখন খুব একটা সুদৃঢ় ও সন্তোষজনক নয় বলেন অভিজ্ঞমহল। শুধু সংক্ষেপে এইটুকুই বলি যে, উভয় শিক্ষার ক্ষেত্রে এখন নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ হতাশাজনক। কাজেই প্রশ্ন আসে, আমাদের দেশে এখন দিনে দিনে ইতিবাচক সেবা মনোবৃত্তির মানুষ কতজনকে তৈরি হচ্ছে? তাই পরিণতিতে যা ঘটার তাই ঘটছে।

আমার চাকরিতে প্রবেশন পিরিয়ড শেষ করার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে প্রথম স্বতন্ত্র অফিসের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। উল্লেখ্য, দেশে ম্যাজিস্ট্রেট-কর্মকর্তাকে উপজেলা ভূমি অফিসের দায়িত্ব দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটি সৃজন হয় আমার ব্যাচ থেকেই। আমি এটি প্রথমে আন্তরিকভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না। কারণ, আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মানজনক চাকরি ছেড়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলাম আমার পিতার নির্দেশে। আমার পিতা বলেছিলেন, ‘শোনো, মৃত মানুষের বিচার করেন ভগবান। জীবিত মানুষের বিচার করেন হাকিম আর এ দায়িত্ব পাওয়া যায় অনেক পুণ্যের ফলে। তাই তুমি হাকিম হও।’ আবার পরে মৃত্যুকালে তার শেষ কথা ছিল, ‘কখনো বিচার বিক্রি করবে না এবং গরিবের পেটে লাথি মারবে না।’

আমি মানুষের সেবা করার জন্যই মনে মনে ব্রত নিয়েছিলাম। সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কাজ শুরু করার পর আমার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলি, একজন গরিব মানুষ আমার অফিসে ঢোকার সময় আমার পিয়ন তাকে দরজায় বাধা দেয় এবং বলেছিল—অনুমতি ছাড়া ঢোকা যাবে না। আমি তা শুনতে পেয়ে তাকে ডেকে বলি, এভাবে কখনই কোনো মানুষকে আমার অফিসে ঢুকতে বাধা দেওয়া যাবে না। [আমি সচিব থাকার সময়ও কোনোদিন অফিসের দরজার সামনে এক সেকেন্ডের জন্যও লাল বাতি জ্বালাইনি।]

বস্তুত আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীরা যে জনগণের সেবক—সে কথাই কতিপয় কর্মচারী মনে রাখে না। অনেকেই নিজেকে মাস্টার (প্রভু) মনে করে। তাই আমার ওই পিয়নের মনেও সেই শিক্ষাটা ছিল। যাই হোক, প্রসঙ্গক্রমে একটু বলি যে, আমি ওই ভূমি অফিসে কর্মরত থাকার সময় একটা গুচ্ছগ্রামে (আদর্শ গ্রাম) ৪৫টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। [ঘরগুলো তৈরি করে দেয় একটি এনজিও কারিতাস। আমরা শুধু সরকারি খাসজমি দিয়েছিলাম।] আরেক গুচ্ছগ্রামে ৭০টি ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি দেওয়া হয়েছিল। আবার একটি চরজমিতে ৪০০টি ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি প্রদান করা হয়। আরেকটা বেশ বড় সমবায় সমিতিকে ৩৬৪ একর খাস জমি দেওয়া হয়েছিল ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে। এ ছাড়া ভূমি সংস্কার কর্মসূচির আওতায় মোট ১৭টি ইউনিয়নে প্রায় ১৪০০ ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছিল। আবার তখন ঋণ সালিশি বোর্ডের মামলা নিষ্পত্তির আইন (১৯৮৮) করা হয়েছিল। আমি সেই ঋণ সালিশি বোর্ডের মামলা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম নিষ্পত্তি করেছিলাম। তখন যিনি আমার ইউএনও (আবদুর রহমান সাহেব) ছিলেন তিনিও খুব সৎ এবং জনদরদি মানুষ ছিলেন। আমার চাকরি জীবনের সেটা ছিল স্বর্ণযুগ এবং এত হতদরিদ্র মানুষের সেবা করার সুযোগ আর পরে কখনো আমি পাইনি।

চাকরিকালে আমি অনেক মানুষের বৈধ অনুরোধ রক্ষা করতাম। আবার আমার বন্ধু ব্যাচমেট কিংবা সিনিয়র বা জুনিয়র অনেক কর্মকর্তাকেও আমি অনেকের পক্ষ হয়ে অনুরোধ করতাম। আমি নিজে যে সব অনুরোধ পেতাম তা আইনগত সমস্যা না থাকলে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে দেখব বলতাম এবং আমি কোনো অনুরোধ না পেলেও যেটা মানুষের আইনত প্রাপ্য সেবা, সেটা এমনিতেই আমি করে দিতাম। আর আমি যাদের অনুরোধ করতাম, তাদের বলতাম সহযোগিতা করুন, কোনো বেআইনি সুবিধা দিতে বলছি না। তখনো অনেক ক্ষেত্রে দেখেছি, আইনত বৈধ বিষয়েও কতিপয় কর্মকর্তা ত্বরিত গতিতে প্রার্থিত সেবা না দিয়ে বরং হয়রানি করত। এমনই ছিল আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা। আমি কখনই কোনো মানুষকে ঘোরানো পছন্দ করতাম না। আমার একটা অভ্যাস ছিল, সহকারী সচিব থেকে ফাইল পুটআপ হলে এবং সেটা আমার পর্যায়ে নিষ্পত্তিযোগ্য হলে একই দিনে সিদ্ধান্ত দিয়ে, তা আবার সহকারী সচিবের টেবিলে ফেরত যেত। এরকম কার্যপদ্ধতি আমি আমার অফিসে নিশ্চিত করেছিলাম।

একাধিক ঘটনা উল্লেখ করতে পারি। সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা বলি। ঘটনাটা জনৈক কাকা আর ভাইপোর মধ্য হতে সৃষ্ট। কাকা ভাইপোকে ৫৩ লাখ টাকা ধার দিয়ে যৌথ মালিকানার জমিতে দোকান নির্মাণ করতে বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশন কাজ সম্পন্ন করে। তারপর আরও টাকা দাবি করে ভাইপো কাকার অংশে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। এমনকি দা নিয়ে খুন জখমের ভয় দেখায় তার স্ত্রী ও বখাটে এক ছেলেসহ। বৃদ্ধ কাকা থানায় গিয়ে জিডি করে এবং পুলিশের সহায়তা চাইলে ঠিকমতো সহায়তা পায় না। আমি সংশ্লিষ্ট ডিসিকে ফোন করলে ডিসি তখন ইউএনওকে বলে দেয় হেল্প করতে। আমি সেখানের এসপিকে এবং ওসিকে মেসেজ দিলে তারা কোনো রেসপন্স করে না। তখন স্বরাষ্ট্র সচিবকে বললে সে জিডির কপি চায়। তাকে তা পাঠাই। কিন্তু সচিব সাহেব কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না—তার ফিডব্যাক পাই না।

আমাদের সিভিল সার্ভিসের অতীত ঐতিহ্য, সুনাম, মর্যাদা ও অহংকার আছে। গর্ব করার মতো কিছু গল্পও আছে। আবার নিকট অতীত থেকে কিছু নেতিবাচক প্রচারও আছে, ঈর্ষা আছে। বিদ্বেষমূলক কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আলোচনাও আছে। তবে এ প্রচারণার দায় কে নেবে? কোনো সন্দেহ নেই সুনাম আর সুকৃতির দাবিদার হতে চায় সবাই। কিন্তু দুর্নামের দায় কেউ নিতে চায় না।

সুতরাং ওপরের বর্ণনায় বুঝতে পারা যায়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে কোন লেভেলে এবং কার মধ্যে কতটুকু সেবার মনোবৃত্তি রয়েছে। এ সেবার মনোবৃত্তি কোনো কর্মচারীর মানসিকতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মস্থ না হলে, তা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে কি তৈরি করা সম্ভব?

লেখক: সাবেক সচিব

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাজেটে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে : মির্জা ফখরুল 

মৌচাকে থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল খুন

মহানগর যুবদল নেতা বহিষ্কার

নুরজাহান বেগমের মৃত্যু : সমাজের এক নির্মম আয়না

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি নেতা সোহেল রানাকে স্থায়ী বহিষ্কার 

পবিপ্রবির নতুন উপাচার্য হলেন প্রফেসর ড. এস এম হেমায়েত জাহান

তনু হত্যা  / ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ ২ আসামির বিরুদ্ধে 

নাগরিকসেবায় অবহেলা করলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ডিএসসিসি প্রশাসকের

হোয়াটসঅ্যাপে ইসরায়েলের সাইবার হামলা, মামলা করবে মেটা

রাজধানীতে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১০

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ট্রেনিং সেন্টার / ৬ দিনব্যাপী ফাউন্ডেশন কোর্সের দ্বিতীয় পর্ব শুরু

১১

এনসিপিতে যোগ দিলেন বিভিন্ন দলের শতাধিক নেতাকর্মী

১২

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া বাণিজ্য : হালাল পণ্যে বড় সম্ভাবনা

১৩

ছেলের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা

১৪

মুক্তির আগেই সাফল্যের দুয়ারে ‘ককটেল ২’

১৫

ইসরায়েলে ছোড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেনি যুক্তরাষ্ট্র

১৬

নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে আনতে কাজ করছে সরকার : মঈন খান

১৭

অতিরিক্ত ফাউলের অভিনয় করলে বিশ্বকাপে দেখতে হবে হলুদ কার্ড

১৮

ছাত্রলীগ নেতা ডেবিট আটক

১৯

ভারতের পুশইন নিয়ে ছাত্রদল নেতা আবিদের স্ট্যাটাস ভাইরাল

২০
X