

দেশে দিন দিন নৃশংসতা বাড়ছে। শুক্রবার গাজীপুরের কাপাসিয়ায় নিজ ঘরে এক পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ওই পরিবারেরই কর্তা। আবার বগুড়ার সদর উপজেলায় নবজাতক সন্তানের গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মা ও সৎ বাবার বিরুদ্ধে। এসব হত্যাকাণ্ড যে সমাজের মানবিক অবক্ষয়েরই নিদর্শন, তা সন্দেহাতীত।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে, গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা (পূর্বপাড়া) গ্রামে পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—ওই বাড়ির গৃহকর্তা ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন খানম, তার তিন মেয়ে মিম (১৪), হাবিবা (১০), ফারিয়া (২) এবং শ্যালক রসুল (২২)। জানা যায়, শ্যালক রসুলকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় ফোনে ডেকে নিয়ে আসেন দুলাভাই ফোরকান। পরে রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়লে স্ত্রী, শ্যালক এবং তিন মেয়েকে গলা কেটে হত্যা করেন। ফোরকান ঘটনার পর থেকে পলাতক আছেন। শুক্রবার রাত ১২টায় ফোরকান তার এক আত্মীয়কে ফোন করে বলেন, ‘সবাই মরে গেছে, কাউরেই বাঁচাইয়া রাখি নাই।’ কেন এই হত্যাকাণ্ড? এ বিষয়ে স্বজনদের ভাষ্য বলছে, আরেক বিয়ে নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য। ফোরকান মিয়া আরেকটি বিয়ে করার কথা স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে শারমিন খুব মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। মূলত তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন এ মনোমালিন্য চলছিল। স্ত্রীকে মারধরও করতেন স্বামী।
এদিকে বগুড়ার সদর উপজেলায় লোকলজ্জার ভয়ে নবজাতক সন্তানের গলা কেটে হত্যা করে পুকুরে ফেলে ঘটনায় আটক করা হয়েছে মোছা. নিপা আক্তার ও তার বর্তমান স্বামী মো. দুলাল মিয়াকে। জানা যায়, বগুড়া সদরের নারুলী এলাকার জাহিদুল ইসলামের ছেলে শুকুর আলীর সঙ্গে প্রায় এক বছর আগে গাবতলী উপজেলার উঞ্চুরখী এলাকার নিপা আক্তারের বিয়ে হয়। তবে দাম্পত্য কলহের জেরে প্রায় ছয় মাস আগে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। চলতি বছর সদর উপজেলার শেখেরকোলা ইউনিয়নের নুর আলমের ছেলে দুলাল মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় নিপার। গত শুক্রবার রাতে নিপা একটি সন্তান প্রসব করেন। পরে লোকলজ্জার ভয়ে নবজাতকের গলায় ব্লেড চালিয়ে হত্যা করা হয়। খবরদুটো গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ মানুষ একটি প্রশ্ন তোলেন যে, যে কোনো মানুষের ক্ষেত্রে তো বটেই, পিতা-মাতা কীভাবে নিজ সন্তানদের প্রতি এত নির্মম-নির্দয় হতে পারেন? সত্যিকারই বিস্ময়কর, যে সন্তানের কল্যাণের জন্য বাবা-মা সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন, তারা কি করে এতটা বর্বর হতে পারেন সেই সন্তানদের প্রতি! দুই ঘটনাই আপাতত যে কারণ জানা যাচ্ছে, সে বিবেচনায় একটি বিষয় অনিবার্যভাবেই হাজির হয়। তা হচ্ছে, স্বার্থপরতা। একজন পিতা সে আরেকটা বিয়ে করবে, এটা একান্তই তার নিজ স্বার্থ। আর আরেক ঘটনায় মা ও বাবা সমাজে নিজেদের লজ্জা ঢাকতে এক সদ্যজাতকে হত্যা। স্বয়ং ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এই শ্রেষ্ঠত্বের নমুনা!
আমরা মনে করি, সমাজে মানবিক অবক্ষয় গভীর হলে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তীব্র হলেই শুধু হত্যার মতো চূড়ান্ত সব অপরাধ সংঘটিত হওয়া সম্ভব। আমাদের সমাজে খুনের মতো অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়া, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আসা কিংবা বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রতার অসংখ্য উদাহরণ এসব অপরাধে জড়াতে অপরাধীরা সন্ত্রস্ত হয় না। ফলে রাষ্ট্রে একদিকে আইনের শাসনের দুর্বলতা; অন্যদিকে সামাজিক-মানবিক-নৈতিক অবক্ষয় চরম উদ্বেগের দিক।