

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা পুরো দেশকে ক্ষুব্ধ করেছে। এমন নিষ্ঠুরতা সভ্য সমাজের জন্য লজ্জার। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথে দ্রুত বিচারের দাবি উঠেছে। মানুষের এই ক্ষোভ কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অধিকাংশ আলোচিত মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কখনো তদন্ত শেষ হয় না, কখনো সাক্ষ্যগ্রহণ বিলম্বিত হয়, আবার কখনো উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। ফলে অপরাধীরা এক ধরনের বার্তা পেয়ে যায় যে, ভয়াবহ অপরাধ করেও শেষ পর্যন্ত পার পাওয়া সম্ভব। এ সংস্কৃতিই সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যত দ্রুত ধর্ষণের বিচার শেষ হবে, সমাজে এর প্রভাব তত বেশি পড়বে। বাস্তবতাও তা-ই বলে। অপরাধ দমনে কঠোর আইনের চেয়ে আইনের কার্যকর প্রয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ধর্ষণ মামলার তদন্ত ১৫ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার বিধান রয়েছে। বিচারও ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সময়সীমা মানা হয় না। আইন কাগজে-কলমে থাকে, বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখা যায় না।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর সরকার দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার কাজ চলছে। এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু একটি মামলায় দ্রুত ব্যবস্থা নিলেই হবে না; পুরো বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। কারণ সমস্যা একক নয়, এটি একটি দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক সংকট।
ধর্ষণ মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমত, তদন্তের দুর্বলতা। অনেক সময় ফরেনসিক রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। তদন্ত কর্মকর্তার বদলি হয়, আলামত সংরক্ষণে ঘাটতি থাকে। দ্বিতীয়ত, আদালতে মামলার অতিরিক্ত চাপ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে হাজার হাজার মামলা বিচারাধীন। অথচ সে তুলনায় বিচারকের সংখ্যা খুবই কম। ফলে শুনানির তারিখ পিছিয়ে যায়। তৃতীয়ত, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব। অনেক সাক্ষী ভয়, চাপ কিংবা অনীহার কারণে আদালতে উপস্থিত হন না অথবা বয়ান পরিবর্তন করেন। এতে বিচার আরও দীর্ঘ হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেছেন, রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হয়ে বিচারব্যবস্থাকে ঠিক করতে হবে। এ বক্তব্যের ভেতরেই সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে। কারণ ধর্ষণের মতো অপরাধ কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও সামাজিক নৈতিকতার প্রশ্ন।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই ধর্ষণ কমাতে চায়, তাহলে শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিলেই চলবে না। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত সংস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং বিচারকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত বিচার। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আলোচিত ঘটনার পর রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের হিসাব শুরু হয়। এতে মূল বিচার প্রক্রিয়া আড়ালে চলে যায়। অথচ একটি শিশুর জীবন কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না। অপরাধী যে-ই হোক, তার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।