

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছে গতকাল। কালবেলায় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন বলছে, দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় শিল্প ও কৃষি খাতে উৎপাদন ব্যয় কমাতে বাড়তি ভর্তুকির উপযোগিতা যেখানে স্পষ্ট, সেখানে আসন্ন বাজেট পরিকল্পনায় মিলছে ভিন্ন চিত্র।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন নতুন অর্থমন্ত্রী। তবে এ বাজেটের আকার যতই বিশাল হোক না কেন, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য এবার কোনো সুখবর থাকছে না। দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বাড়ছে। এমন সময় উৎপাদন খরচ কমাতে বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন ছিল; কিন্তু সরকার হাঁটছে উল্টো পথে। অর্থাৎ আসন্ন বাজেটে কৃষি ও বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো উৎপাদনশীল খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি না করা এ সংকটকালীন সময়ে এক ধরনের সংকোচন নীতি।
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান দুটি স্তম্ভ যথাক্রমে শিল্প ও কৃষি খাত। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ দুটি খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধির উপযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। দেশের অর্থনীতি রক্ষার অন্যতম শর্তও এ দুই খাত। জ্বালানি ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে দেশের শিল্পকারখানাগুলোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি আয়ে। অন্যদিকে, সার ও সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকের দুশ্চিন্তা এমনিতেই বেড়েছে। প্রণোদনা না বাড়লে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, কোনো সন্দেহ নেই। এটি সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার ওএমএস বা খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো জনকল্যাণমূলক খাতেও কমছে ভর্তুকি। এতে নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হবে, এটাই স্বাভাবিক। অবশ্য এ ক্ষেত্রে সরকারের ভাষ্য হচ্ছে, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য তারা নানা কার্ড সরবরাহ করছে।
প্রণোদনা কমার পেছনে কি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফের শর্তপূরণের বিষয় আছে? আমরা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নই। তবে নতুন করে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ার আশায় যদি এ ভর্তুকি সংকোচনের কৌশল হয়, তা হয়তো সাময়িকভাবে বাজেট ঘাটতি কমাবে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তিকে দুর্বল করতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্সে প্রণোদনা বাড়ালে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাময়িক বাড়াতে পারে। কিন্তু দেশের ভেতরে যদি কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়, তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সে রেমিট্যান্সের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে কি?
আমরা মনে করি, বিরাজমান অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় কৃষি ও শিল্পে প্রণোদনা বাড়ানোর উপযোগিতা রয়েছে। বিশেষ করে চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে দেশের শিল্পকারখানাগুলোয় এক ধরনের সংকট বিরাজ করছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। কমেছে উৎপাদন। তাই এ খাতকে চাঙ্গা করার প্রয়োজন। অন্যদিকে আমাদের জাতীয় জীবনে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। আর কৃষি উৎপাদনে দরকারি পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে, তা সংকট বাড়াবে। বিস্ময়কর হচ্ছে, সরকারের নিজস্ব অর্থ বিভাগের বাজেট পর্যবেক্ষণেই যখন বলা হয়েছে, এ দুই খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন, তখন বাজেট পরিকল্পনায় এ ভিন্ন চিত্রের বাস্তবতা কী? খোদ সরকারের মূল্যায়নের সঙ্গে বাজেট বরাদ্দের এ বৈপরীত্য কাম্য নয়। আমাদের প্রত্যাশা, চূড়ান্ত বাজেট ঘোষণার আগে সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবেন। দেশের কৃষক ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখাই এ সময় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।