নাদিয়া খোমামি
প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১১:৩১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রযুক্তিযুগে মনোযোগ সংকট

প্রযুক্তিযুগে মনোযোগ সংকট

আমরা কি কোনো গল্পের কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি? যদি এমন কোনো কাহিনি থাকে, যা আমাদের নিঃশর্ত মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য, তবে সেটি নিশ্চয়ই এমন এক ক্রাউন কোর্টের বিচারকের গল্প, যিনি নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার মামলায় বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, আর সে সময়ই জানতে পারেন যে, তার নিজের ছেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু গত সপ্তাহান্তে রোজামুন্ড পাইক বুঝতে পারলেন, এত তীব্র আবেগময় এবং মানসিকভাবে নাড়া দেওয়া একটি নাটকও দর্শকদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত মুগ্ধ ও মনোযোগী রাখতে পারেনি। লন্ডনের উইন্ডহ্যামস থিয়েটারে ‘ইন্টার আলিয়া’ নাটকের প্রদর্শনী শেষে পর্দা নামার পর পাইক আবার মঞ্চে ফিরে আসেন। তবে তিনি একক অভিনন্দন গ্রহণের জন্য ফেরেননি। তিনি ফিরে এসেছিলেন একজন দর্শকের আচরণের প্রতিবাদ জানাতে। কারণ, ওই ব্যক্তি তার অভিনয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মোবাইলে বার্তা পাঠাচ্ছিলেন। পাইক বলেন, ‘হয়তো বিষয়টি খুবই জরুরি ছিল। হয়তো আপনি একজন চিকিৎসক এবং কারও জীবন বাঁচাচ্ছেন। আমি সত্যিই আশা করি সেটাই ছিল। কিন্তু আমরা এসব দেখতে পাই, অনুভব করতে পারি। আমি মনে করি যেন পুরো দর্শকসারিকে একসঙ্গে ধরে রাখার দায়িত্ব আমার। তাই যখন এমন কিছু দেখি ও অনুভব করি, তখন তা খুব কঠিন হয়ে যায়।’

তবে পাইক আসলে শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারের শিষ্টাচার নিয়ে কথা বলছিলেন না। তিনি যে বিষয়টির কথা বলছিলেন, তা হলো শিল্পকর্মের সামনে পুরোপুরি উপস্থিত থাকার আমাদের ক্রমশ কমে যাওয়া ক্ষমতা। কোনো শিল্পকর্মের সঙ্গে সময় কাটানো, তার ভেতরে ডুবে যাওয়া এবং তার প্রভাবে আচ্ছন্ন হওয়ার পরিবর্তে আমরা এখন যেন শুধু তার ওপরের স্তরটুকু ছুঁয়ে চলে যাই। থিয়েটারে দর্শকদের অনুপযুক্ত আচরণের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে পাইক প্রথম নন। চলতি বছরের শুরুতে সিনথিয়া এরিভো ওয়েস্ট এন্ডে ড্রাকুলা নাটকের অভিনয় থামিয়ে দেন, যখন তিনি দেখেন একজন দর্শক নাটকটির ভিডিও ধারণ করছেন। ২০১৭ সালে হ্যামলেট নাটকে অভিনয়ের সময় অ্যান্ড্রু স্কট বিখ্যাত ‘টু বি অর নট টু বি’ স্বগতোক্তি মাঝপথে থামিয়ে দেন, কারণ তিনি দেখতে পান একজন দর্শক ইমেইল পাঠানোর জন্য ল্যাপটপ খুলেছেন। সম্প্রতি লেসলি ম্যানভিলও সেসব দর্শকদের সমালোচনা করেছেন, যারা পর্দা নামার পর করতালি দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, ‘করতালি দিন বা না দিন, কিন্তু আমাদের মুখের সামনে মোবাইল ফোন তুলে ধরবেন না।’

একই প্রবণতা বহু বছর ধরে সিনেমা হলগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। মহামারি এবং স্ট্রিমিং সেবার উত্থান মানুষের দেখার অভ্যাসকে এতটাই বদলে দিয়েছে যে, এখন অনেক স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠান চিত্রনাট্যকারদের গল্প আরও সহজভাবে লিখতে বলছে। কারণ তারা জানে, অনেক দর্শক চলচ্চিত্র বা ধারাবাহিক দেখার সময় একই সঙ্গে মোবাইল ফোনও ব্যবহার করেন। আমি মনে করতে পারি না, শেষ কবে কোনো মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখেছি আর কারও মোবাইলের আলো আমার চোখে পড়েনি। মোবাইল ফোন বেজে ওঠে, কেউ কেউ ইনস্টাগ্রামে দেওয়ার জন্য চলচ্চিত্রের শুরুর দৃশ্য ভিডিও করে। সম্প্রতি একটি প্রদর্শনীতে আমার সামনের সারির একজন দর্শক প্রায় পুরো চলচ্চিত্রজুড়েই এক্সে স্ক্রল করছিলেন। এমনকি মার্টিন স্করসেজিও বলেছেন, দর্শকদের খারাপ আচরণের কারণে তিনি আর সিনেমা হলে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখেন না। প্রশ্ন হলো, যখন আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতা সেই যৌথ দর্শক-অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, যে অভিজ্ঞতার ওপর তার পুরো কর্মজীবন দাঁড়িয়ে আছে, তখন তা আমাদের সমাজ সম্পর্কে কী বার্তা দেয়?

এটি শুধু নাটক, সিনেমা বা টেলিভিশনের ক্ষেত্রেই নয়। বুকটক নামের জনপ্রিয় অনলাইন পাঠক সম্প্রদায়ে অনেক কনটেন্ট নির্মাতা স্বীকার করেছেন যে, তারা উপন্যাসের দীর্ঘ বর্ণনামূলক অংশ এড়িয়ে যান এবং শুধু সংলাপ পড়েন। ফলে গল্পের ঘটনাপ্রবাহ জানা হয় ঠিকই কিন্তু লেখার ভাষার সৌন্দর্য, আবহ, অনুভূতি ও গভীরতা অনেকটাই হারিয়ে যায়। জাদুঘরেও একই চিত্র দেখা যায়। বিখ্যাত শিল্পকর্মের সামনে মানুষ ভিড় করে সেলফি তোলার জন্য, অথচ ছবিটিকে মন দিয়ে দেখার সময় খুব কমই দেয়। ক্রমেই সংস্কৃতি ও শিল্পকলাকে এমন এক উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা লাইক ও শেয়ার পাওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে সময় কাটানোর এই কমে যাওয়া সক্ষমতা ডিজিটাল যুগের একটি সরাসরি ফল। বহু বছর ধরে যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমরা জনজীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি, সেগুলো আমাদের খণ্ডিত ও বারবার বিঘ্নিত মনোযোগের অভ্যাস গড়ে তুলেছে। অন্তহীন স্ক্রল করা, মাঝপথে অন্য কিছুতে চলে যাওয়া, কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখে পরেরটিতে চলে যাওয়া এখন আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ।

প্রকৃতপক্ষে এ পদ্ধতির ওপরই এসব প্ল্যাটফর্মের পুরো ব্যবসায়িক কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। এর ফল হলো এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে আমরা বিশ্বাস করতেই কষ্ট পাই যে, কোনো কিছু আমাদের সম্পূর্ণ ও অবিভক্ত মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য হতে পারে। বিশ শতকের শুরুর দিকে লেখালেখি করতে গিয়ে ভার্জিনিয়া উলফ গভীর মনোযোগকেই তার গদ্যের মূল উপাদানে পরিণত করেছিলেন। জলের ওপর আলোর ঝিলিক, লন্ডনের সকালের আবহ কিংবা জানালার কাচে আটকে থাকা একটি মথের মৃত্যুযন্ত্রণা—এসব ক্ষুদ্র দৃশ্য ও অনুভূতিকেও তিনি অসাধারণ মনোযোগের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। উলফ এবং আধুনিকতাবাদী লেখকদের কাছে মনোযোগ দিয়ে দেখা শুধু শিল্প উপভোগের একটি উপায় ছিল না। এটি ছিল মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক শর্ত। এখন আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছেছি যে, বিভিন্ন উৎসব এবং জ্যাক হোয়াইটের মতো সংগীতশিল্পীরা অনুষ্ঠানস্থলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করছেন। কারণ, দর্শকদের অনেকেই মঞ্চে কী ঘটছে তার চেয়ে নিজেদের ফোনের পর্দার দিকেই বেশি মনোযোগী।

২০২৩ সালে এ লিটল লাইফ নাটকে জেমস নর্টনের নগ্ন দৃশ্যের ছবি ফাঁস হওয়ার পর আরও অনেক থিয়েটার এখন ইয়ন্ডার পাউচ ব্যবহারের কথা ভাবছে। এই বিশেষ পাউচে দর্শকদের মোবাইল ফোন অনুষ্ঠান চলাকালে বন্ধ অবস্থায় রাখা হয়। মনোযোগ ধরে রাখার পরিবেশ তৈরির জন্য যদি এমন বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়, সেটিই দেখায় পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে। তবে শুধু একটি পাউচ ব্যবহার করলেই মনোযোগ ফিরে আসবে না। আশার কথা হলো, এর বিপরীতে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়াও ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। অনেক তরুণ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কম পোস্ট করছেন, স্মার্টফোনের পরিবর্তে সাধারণ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন এবং এমন অভিজ্ঞতার খোঁজ করছেন যেখানে বারবার বিঘ্ন ঘটার সুযোগ কম। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মানুষ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে, সবসময় সংযুক্ত থাকারও একটি মূল্য আছে। মহৎ শিল্পকর্ম সবসময়ই আমাদের কাছ থেকে একটি বিষয় দাবি করে এসেছে। সেটি হলো সাময়িকভাবে নিজের সত্তাকে পেছনে সরিয়ে রেখে অন্য একজনের জগতে প্রবেশ করার মানসিকতা। যদি আমরা সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি, তাহলে শুধু মোবাইল না দেখে একটি নাটক শেষ পর্যন্ত দেখার সামর্থ্যই হারাব না, আমরা হারাব একটি গল্পের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার ক্ষমতা। আর তার সঙ্গে হারিয়ে যাবে একটি গল্পের মাধ্যমে বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাও।

লেখক: গার্ডিয়ানের শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংবাদদাতা। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিশ্বকাপ নায়ক থেকে রাতারাতি সোস্যাল মিডিয়া তারকা কেপ ভার্দে গোলরক্ষক 

সংবাদিক আবদুল হাই সিদ্দিকের বাবার মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সেই ওমরাহযাত্রীর মৃত্যু, মরদেহ পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন ধর্মমন্ত্রী

প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ভেষজ উদ্ভিদ সাদা মটমটিয়া

সমতায় শেষ ইরান-নিউজিল্যান্ডের দুর্দান্ত লড়াই

আজকের নামাজের সময়সূচি

আমগাছে উঠে অনলাইনে হাজিরা দিলেন প্রধান শিক্ষক

পারদ গলল ইরান-যুক্তরাষ্টের, হিম হচ্ছেন নেতানিয়াহু?

এলাকাবাসীর সহযোগিতায় একের পর এক পুশইনচেষ্টা প্রতিহত বিজিবির

পিরোজপুরে মায়ের হাতে ছেলে খুন

১০

দক্ষিণ লেবাননে ৩০ সেনা সদস্য হারাল ইসরায়েল

১১

দুপুরে কাজ নিষিদ্ধ করল সৌদি সরকার

১২

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আশাবাদী লেবানন

১৩

স্পেনের ফুটবলারের সাড়ে ৮ বছরের কারাদণ্ড 

১৪

হাটে উঠল হাঁড়িভাঙা, ৩০০ কোটির বাণিজ্যের আশা

১৫

উন্মুক্ত হলো হরমুজ, শুরু হলো জাহাজ পারাপার

১৬

ফরিদপুরে যুবলীগ নেতাসহ আটক ২

১৭

সৌদি আরব-উরুগুয়ে ম্যাচে গোলাপি জার্সিতে রেফারি, কারণ জানাল ফিফা

১৮

নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যে : ইরানের প্রেসিডেন্ট

১৯

বল যখন ভেতরে ঢুকতে চায় না, তখন কোনোভাবেই ঢুকবে না : স্পেন কোচ

২০
X