

আধুনিক পৃথিবীতে বাজেট এক অনিবার্য অনুষঙ্গ। ব্যক্তিজীবন, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিকল্পিত হিসাবের কোনো বিকল্প নেই। অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয় নিয়ে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে আমজনতার কৌতূহল এবং অবহেলার শেষ নেই। মৌসুম এলে বাজেট নিয়ে প্রচুর বাজে কথা হয়। অর্থনীতির ‘অ’ বোঝেন না, এমন লোকও অর্থহীন কচকচানিতে ব্যস্ত থাকেন। আবার, কাজের কাজ না করেও ফুরসত পান না সরকারের দায়িত্বশীলরা। বারবার প্রতারিত জনগণও ধরে নেয়, এটা তার নিয়তি। যত বড় বাজেটই হোক, তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে না। নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। অপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের দাম কমবে। ধনী আরও ধনী এবং গরিব আরও গরিব হবে। এই অতি সরলীকরণ ধারণার সঙ্গে হতাশ জনতা আত্মীয়তা অনুভব করে। প্রচলিত গল্পের মতো নিজেদের ভাগ্যকে দোষারোপ করে। শবেবরাতের রাতে আল্লাহ মানুষের ভাগ্য লেখেন বলে বিশ্বাস করে মুসলমানরা। ভাগ্য বিড়ম্বিত রসিকজনরা মনে করেন, বিশ্বের ধনী দেশের বড়লোকদের উন্নতি লিখতে লিখতে সকাল হয়ে যায়। পরে, গরিবের খাতায় লেখা হয়, ওই যা ছিল তাই। বাজেটের আগে-পরে লোভ এবং অসহায়ত্ব নিয়ে প্রচুর হাস্যরসও উৎপাদন হয়। অর্থ বিশেষজ্ঞ ডেভ র্যামসি বলেন, ‘বাজেট হলো আপনার টাকাটা কোথায় যাবে, তা তাকে বলে দেওয়া, কিন্তু টাকা কোথায় চলে গেল, তা ভেবে পরে আফসোস করা নয়।’ বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে এমন গল্পগাছা। তবে, আধুনিক বাজেটের উৎপত্তিস্থল সভ্য দেশেও রয়েছে এ নিয়ে নানা গল্প।
বাজেট শব্দের উদ্ভব নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন প্রয়াত অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেছেন, ‘১৭২৫ থেকে ১৭৪২ পর্যন্ত রবার্ট ওয়ালপোল ছিলেন যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী এবং কার্যত প্রথম প্রধানমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সারা বছরই কর কমানো বা বাতিলের দাবি শুনতেন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকে নতুন করারোপ বা পরিবর্তনের পরামর্শ আসত। নতুন ব্যয়ের দাবিও উঠত। এসব তিনি একটি মানিব্যাগে ভরে রাখতেন। অর্থবছরের শেষ দিকে ওই কাগজগুলোর ভিত্তিতে বাজেট প্রণয়ন করতেন তিনি। শিল্পবিপ্লবের পর ইংল্যান্ডের অর্থনীতি অনেক বড় হয়ে যায়। বাজেটবিষয়ক প্রস্তাবগুলো শুধু একটা মানিব্যাগে রাখা সম্ভব হয় না। মানিব্যাগের জায়গায় চলে আসে ব্রিফকেস। বাজেটে কোন কর বাড়বে বা কমবে, তার গোপনীয়তা বজায় রাখা অপরিহার্য। ব্রিফকেসের ভেতরে থাকা বাজেটের কোনো তথ্য জেনে গেলে ব্যবসায়ীরা রাতারাতি বড়লোক বনে যেতে পারেন। গোপনীয়তা বজায় রাখতে না পারলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। দেশে দেশে বাজেট ফাঁসও হয়।
১৯৪৭ সালে যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী ছিলেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক হিউ ডালটন। ব্রিফকেসে বাজেট নিয়ে সংসদে ঢোকার সময় তাকে সাংবাদিকরা কিছু প্রশ্ন করেন। তিনিও ঠিকঠাক জবাব দেন। আর এ খবর টেলিফোনের মাধ্যমে পত্রিকা অফিসে পৌঁছে যায় তাৎক্ষণিকভাবে। কোনো কোনো খবরের কাগজ শুধু এ সংবাদকে গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করে। হিউ ডালটন সংসদে বাজেট পড়ার সময় সংসদ সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায় পত্রিকার কপি। বাজেট ফাঁস হয়ে গেছে এমন দাবিতে হইচই শুরু করে বিরোধী দল। হিউ ডালটন ভুল স্বীকার এবং পদত্যাগ করেন। গোপনীয়তা বজায় রাখা শুধু অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নয়। অর্থ সচিবসহ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদেরও দায়িত্ব। অনেক দেশে বাজেটের আগের সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মুখ্য কর্মকর্তাদের একটি হোটেলে প্রায় বন্দি অবস্থায় রাখা হতো। যাতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে কেউ। তবে, অনেক দেশের সংসদেই কর প্রস্তাব আর গোপন থাকে না। কর প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনা হয়, দরকষাকষি এবং আপস করা হয়।
বাংলাদেশেও বাজেট প্রণয়নে রয়েছে ডাকসাইটে অর্থমন্ত্রীদের নানা নাটকীয়তা। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আবুল মাল আব্দুল মুহিতসহ অনেকে বাজেট ঘোষণার কিছুদিন আগে লোকালয় ছেড়ে নিরিবিলি স্থানে চলে যেতেন। তবু, গণমাধ্যমকর্মীরা হানা দিতেন তাদের গোপন ডেরায়। বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে এবং বিরোধিতা করে ব্যানার তৈরি করে রাখত ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল। ঘোষণার পরপরই রাজপথে নেমে পড়ত তারা। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদ শাসনমালের শেষ কয়েকবছরে এসব উঠে যায়। শুধু বাজেট নয়, ফ্যাসিস্ট সরকারের সব কর্মকাণ্ডে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে বিরোধীরা। এবারের বিরোধী দল জামায়াত অবশ্য এরই মধ্যে বাজেট নিয়ে দলের সংসদ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তাদের অর্থনৈতিক ও জননীতিবিষয়ক জ্ঞান এবং সংসদীয় দক্ষতা বাড়াতে এ বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুই দিনের এ কর্মশালায় দলটির ৭৭ জন এমপি অংশ নেন। এতে, বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার রক্ষা এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনে সংসদ সদস্যদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।’ কিন্তু, কুষ্টিয়ার এমপি আমির হামজার ভাইরাল বক্তব্যে বলিষ্ঠতার কোনো প্রমাণ মেলেনি। উপরন্তু, প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি দুর্বল কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলেছেন, ‘বাজেট বড় হয়ে গেছে। ৬ হাজার কোটি টাকা হলে ভালো হতো।’
জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ঠিক করেছে বিএনপি সরকার। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি এবং অন্যরা ২৫ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে। বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও বিবিএস বলছে, গত মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। গত ১৬ মাসের মধ্যে এটা সর্বোচ্চ। তবে, অর্থায়নকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ একেবারেই অসম্ভব বলে মনে করছেন তিনি। এর আগে কখনোই সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা যায়নি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত আকবর আলি খানের মতে, ‘বাজেট হচ্ছে সংখ্যার খেলা। যুক্তির চেয়েও এতে প্রচারণা বেশি। প্রতি বছরই ঘোষণা করা হয়, বাজেটের আকার সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। তিনি বলতেন, সংখ্যায় অভিভূত হলে চলবে না। তথ্য সঠিক হলেও ব্যাখ্যা একেবারেই ভুল। এ যেন অনেকটা পুথিসাহিত্যের চরণ, ‘লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার, একুনে শুমার হলো চল্লিশ হাজার।’
দেশের তরুণদের মাদক, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখতে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর জোর দিচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। এর অংশ হিসেবে বাজেটে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩০০ কোটি টাকা। সাধারণভাবে সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে চলচ্চিত্র, নাচ, গান, নাটক, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য, শিল্পকলা, কারুশিল্প, নকশা, সফটওয়্যার, ভিডিও গেমস ইত্যাদিকে বোঝানো হয়। সরকারের ইতিবাচক এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে সৃষ্টিশীল মানুষ। কিন্তু, সমাজের নানা ধরনের অপশক্তির তাণ্ডব দমন করবে কে? সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি সিনেমা দেখাতে দেয়নি তথাকথিত তৌহিদী জনতা। হাসিনা সরকারের পতনের পর এ উগ্র গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়েছে গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র, বাউলের আখড়া, মাজার শরিফ এমনকি মৃত মানুষ। কোনো একটি ঘটনার বিচার শেষ হয়নি। হামলাকারীদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। নারীদের ঝুঁকি বেড়েছে। মানুষ এখনো মবতন্ত্রের আতঙ্কে। যদিও বাজেটে বিভিন্ন সহায়তা কার্ডের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু, দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো কিছুই সুফল বয়ে আনবে না।
বাজেট বরাদ্দ অনুমোদন করেন সংসদ সদস্যরা। দুঃখের বিষয়, তারা সবসময় জনস্বার্থে কাজ করেন না। অনেক সময় নিজেদের বা স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখেন। দলের বহু ত্যাগী নেতা ক্ষমতা পেলে হয়ে যান ভোগী। দক্ষ, যোগ্যর চেয়ে নেতার কাছে সততা চায় জনগণ। এ জন্যই হয়তো মার্কিন লেখক হারমান কেইন বলতেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, বাজেটে যতদিন ভারসাম্য না আনা যায়, ততদিন রাজনীতিবিদদের বেতন থেকে ১০ শতাংশ করে কাটা উচিত।’ আরেক মার্কিন লেখক ও প্রকাশক উইলিয়াম ফেদার বলেন, ‘বাজেট বলে দেয় আমরা কী কী কিনতে পারি না। বাস্তবতা হলো বাজেটে ‘না’ বললেও আমরা যা কেনার ঠিকই কিনে ফেলি।’ এ এক চরম বাস্তবতা। জীবন থেমে থাকে না। দারিদ্র্য, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতার মাঝেও সময় কেটে যায়। তবে, ক্ষমতাসীনদের আচরণ মনে রাখে মানুষ। দায়িত্বশীলদের ভুলের মাশুল সময় তাদের কাছ থেকে দ্বিগুণ করে নেয়।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি