

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু করার পর ১০০ দিন পেরিয়ে গেছে। এপ্রিল মাস থেকে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। তবে এই সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বারবার গোলাগুলি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ রয়েছে এবং লেবাননেও সংঘাত অব্যাহত আছে। শান্তি এখনো অধরা। কারণ কোনো পক্ষই তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের লক্ষ্য ছিল শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা নয়। তারা ইরানের নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোকেও দুর্বল করতে চেয়েছিল, যাতে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে তেহরানের প্রধান লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা এবং যে কোনো মূল্যে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইরান মনে করে, বর্তমানে তাদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।
উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি
এই যুদ্ধে ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনের বহু জ্যেষ্ঠ নেতাও রয়েছেন। যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরান তার নেতৃত্ব, অস্ত্রভান্ডার এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম নয়। সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরিমাণ প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এত দ্রুত ধ্বংস হচ্ছিল যে, সেগুলো প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর ফলে গত দুই দশকে গড়ে তোলা ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পায়। ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পারমাণবিক কর্মসূচির ওপরও নতুন করে হামলা চালানো হয়। বেসামরিক অবকাঠামো এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধের আগেই চাপের মধ্যে থাকা ইরানের অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তেহরান যে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, সেগুলোর অবস্থানও ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ইরান এমন কিছু প্রতিবেশী রাষ্ট্রকেও দূরে ঠেলে দিয়েছে, যাদের সঙ্গে অতীতে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিল। তবে যুদ্ধ ইরানের প্রতিপক্ষদের জন্যও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুরক্ষার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যা তারা চায়নি। এমনকি তাদের নিজেদের ভূখণ্ডও হামলার শিকার হয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে যে নিশ্চয়তাগুলো ছিল, সেগুলো আগের তুলনায় কম নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। ফলে এই যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সম্ভবত ইরানের সামরিক সক্ষমতার ক্ষয় নয়। এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি পুরো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সামরিক দুর্বলতা থেকে অর্থনৈতিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ শুরু করে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর জবাবে মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে বিমান অভিযান শুরু করে। পরে এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরোপ করা হয়। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও হরমুজ প্রণালি এখনো বন্ধ রয়েছে। ইরানের অনুমোদন পাওয়া হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো জাহাজ চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে না। সামরিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি কূটনৈতিক সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ওয়াশিংটন যখন ন্যাটো এবং ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্র দেশগুলোর কাছে প্রণালিটি নিরাপদ করার জন্য সহায়তা চায়, তখন তারা সেই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। ইউরোপীয় সরকারগুলো এই সংঘাতকে নিজেদের প্রত্যক্ষ দায়িত্বের আওতার বাইরে বলে বিবেচনা করেছে। তেহরানের দৃষ্টিতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
ইরান মনে করে, যে শক্তি তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে আঘাত হেনেছে, সেই শক্তিই একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ফের চালু করার জন্য নিজের মিত্রদের একত্র করতে পারেনি। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়টি ইরানের কাছে শুধু অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এটি তেহরানের সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে যে, প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল কার্যকর হচ্ছে। এই আত্মবিশ্বাস থেকেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আত্মসমর্পণের পরিবর্তে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। রাশিয়া ও চীনের অব্যাহত সমর্থন, বিশেষ করে জাতিসংঘে তাদের অবস্থান, তেহরানকে এই যুদ্ধকে শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাত হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ঘিরে বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে। দেশের অভ্যন্তরেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নতুন নেতার দীর্ঘ সময় জনসমক্ষে অনুপস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিলেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র এখনো স্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ ঐক্যের একটি চিত্র ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এরপর কী হতে পারে
নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তেহরান মনে করে, বর্তমানে তারাই তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। ইরানের নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের প্রতিপক্ষ শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করতে পারেনি। তাদের মতে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে থাকলে অন্যান্য ক্ষতি এক সময় পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। এখন ইরান টিকে থাকার এই সাফল্যকে আঞ্চলিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের সুযোগে রূপ দিতে চাইছে। বিশেষ করে তারা চায়, চলমান সংঘাতের যে কোনো সমাধান যেন লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ করার সঙ্গে যুক্ত হয়। তেহরান নিজেকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। গত কয়েক বছরে তাদের প্রভাব যে হারে কমেছে, বিশেষ করে সিরিয়ায় যে অবস্থান হারিয়েছে, তা থামানোই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে তারা অবশিষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতেও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে চায়। তবে যুদ্ধ একটি নতুন বাস্তবতাও সামনে এনেছে।
ইরানের প্রচলিত সামরিক প্রতিরো ধক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। এর ফলে দেশটির নেতৃত্বের ভেতরে এমন ধারণা আরও শক্তিশালী হয়েছে যে, পারমাণবিক সক্ষমতা থাকলে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ঠেকানো যেত। এই দৃষ্টিভঙ্গি পারমাণবিক ইস্যুর সমাধানকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আলোচনাকেও কঠিন করে দিতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ আপাতত অর্থনৈতিক সংকট ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে মানুষের অসন্তোষকে আড়ালে সরিয়ে দিয়েছে। শীতকালে যে ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল, সেগুলোর জায়গায় এখন বিদেশি হুমকি ও জাতীয় প্রতিরোধের ভাষা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরিস্থিতি মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব উপলব্ধি করে যে বিক্ষোভগুলো শাসনব্যবস্থার নানা দুর্বলতা ও ব্যর্থতাকে প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাধারণত ভিন্নমত, বিক্ষোভ এবং বিদেশি চাপকে একই ধরনের অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য যুদ্ধের প্রভাবের মতোই ভবিষ্যতে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। দেশটি কি আরও কঠোর দমননীতির দিকে যাবে, নাকি সমঝোতা, সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের পথে হাঁটবে, তা অনেকাংশে এই প্রশ্নের ওপর নির্ভর করছে। এখনও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। যে নেতৃত্ব শাসনব্যবস্থার টিকে থাকাকেই বিজয় হিসেবে দেখে, তারা কি সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে? নাকি তারা শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হলো আরও আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করা এবং সম্ভব হলে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা? সম্ভবত আগামী ১০০ দিনই এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে শুরু করবে।
লেখক: ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ