

শেষ বাঁশির পর আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মুখে স্বস্তির ছাপ, স্বস্তি ছিল লিওনেল মেসির মধ্যেও। মিয়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে নাটকীয়তা শেষে আর্জেন্টিনা জিতেছে ঠিকই, ম্যাচের চিত্রনাট্য ছিল নাভিশ্বাস তোলার মতো—আর্জেন্টিনাকে ঠেলে দিয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের দোরগোড়ায়।
ম্যাচের ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত থ্রু বল ধরে জাল কাঁপান মেসি। এটি বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের তার রেকর্ড ২০তম গোল। চলতি আসরে এটি মেসির সপ্তম গোল, যা তাকে রেখেছে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। বিশ্বকাপে টানা আট ম্যাচে গোল করার রেকর্ডও বড় করেছেন। এগিয়ে যাওয়ার পরই ছন্দ হারায় আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দে সমতা টানে, বিরতির পর মার্তিনেজের লক্ষ্যভেদে ফের এগিয়ে যায় আকাশি-সাদারা। দ্বীপরাষ্ট্রের লড়াই থামেনি—অতিরিক্ত সময়ে সিদনি লোপেজ কাব্রালের বাঁকানো শটে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে পরাস্ত করে। শেষমেশ মেসির অ্যাসিস্ট থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে জয় নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার। পুরো ম্যাচে কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া করেন ১০ সেভ, যার পাঁচটি ছিল মেসির শট ঠেকিয়ে।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে মেসি স্বীকার করেন, প্রতিপক্ষকে অবমূল্যায়নের কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, ‘স্পেন বা উরুগুয়ের কাছে হারেনি বলেই জানতাম এই ম্যাচ সহজ হবে না।’ প্রথম গোলের পর ছন্দে ফেরার বদলে উল্টো বল দখল হারিয়ে রক্ষণে সেঁধিয়ে যাওয়ার কথাও অকপটে বলেন ইন্টার মায়ামি তারকা। লড়াই চালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে স্প্যানিশ ভাষায় মেসির মন্তব্য ছিল, দল বরাবরই শেষ পর্যন্ত মাঠে লড়ে যায়, আর এদিনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও প্রতিপক্ষের প্রশংসায় ছিলেন উদার। তার ভাষায়, সহজ প্রতিপক্ষ বলে কিছু হয় না, আর কেপ ভার্দে সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছে। উল্টো দিকে কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তা বলেন, ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে দুবার সমতা টেনে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াই ছিল বড় অর্জন। যা নিজেদের পরিচয় ও মর্যাদা গর্বের সঙ্গেই বিশ্ব মঞ্চে তুলে ধরেছে।’
মাঠের বাইরের দৃশ্যও ছিল দেখার মতো। কড়া লড়াইয়ের পরও শেষ বাঁশি বাজতেই কেপ ভার্দের কয়েকজন খেলোয়াড় মেসির কাছে ছুটে যান জার্সি বদল আর সেলফির আবদার নিয়ে, আর মেসিও হাসিমুখে সাড়া দেন সেই অনুরোধে। রসিকতা করে তিনি পরে বলেন, মাঠে তাকে রীতিমতো কষে ফাউল করা হয়েছে, অথচ খেলা শেষ হতেই সেই একই খেলোয়াড়েরা ছবি তুলতে মুখিয়ে ছিলেন। এমন দৃশ্য বিশ্বকাপের কঠোরতম লড়াইয়ের পরও ফুটবলের সৌন্দর্যকেই যেন নতুন করে চেনায়।
পরিসংখ্যানের খাতা খুললে বোঝা যায়, এই ম্যাচ কেন এত আলাদা। টানা আট ম্যাচে গোল করে মেসি গড়েছেন নতুন রেকর্ড, এই ধারাবাহিকতায় গোলসংখ্যা ১২। ক্যারিয়ারে ২০তম বিশ্বকাপ গোলের পাশাপাশি এই আসরে সাত গোল নিয়ে তিনি এখন গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে, এমবাপ্পের চেয়ে এক গোল এগিয়ে। অথচ নিজের এত অর্জনের মধ্যেও সংবাদ সম্মেলনে মেসি বারবার ফিরে গেছেন দলের সামষ্টিক পারফরম্যান্স আর প্রতিপক্ষের লড়াইয়ের প্রসঙ্গে, নিজের গোলের বন্দনা নয়। বিস্ময়কর মেসিকে থামিয়ে যেভাবে ১২০ মিনিট লড়ে গেছে কেপ ভার্দে, তা দেশটির সমর্থকদের গর্বিত করেছে।
মেসি নিজেই সাক্ষী দিলেন, স্বীকার করলেন—ম্যাচে দল প্রচন্ড চাপে ছিল। মনে করিয়ে দিলেন, বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচই কঠিন, কারণ শক্তির ব্যবধান আগের মতো বড় নেই। এখন আর্জেন্টিনার সামনে অপেক্ষা করছে মিশরের চ্যালেঞ্জ, যারা টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে উঠে এসেছে শেষ ষোলোয়।