

মানুষের জীবনে বরকত এমন এক অমূল্য নিয়ামত, যা শুধু সম্পদের প্রাচুর্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অল্প সম্পদে তৃপ্তি, সময়ের সঠিক ব্যবহার, ইবাদতে স্বাদ, পরিবারে শান্তি এবং কর্মে সফলতার মধ্যেই বরকতের প্রকৃত প্রকাশ ঘটে। আমাদের আশপাশের অনেককে অধিক পরিমাণে উপার্জন করতে দেখা যায়; কিন্তু দিনশেষে তারা অশান্তি ও হতাশার গল্প শোনান। এর কারণ হলো, চলার পথে তার কিছু গোনাহ ও ভুল অভ্যাস এমন আছে, যা অজান্তেই জীবন থেকে বরকত কেড়ে নিয়েছে।
নিচে কালবেলার পাঠকদের জন্য এমনই পাঁচটি অভ্যাসের কথা তুলে ধরা হলো:
১. মিথ্যা ও প্রতারণা
মিথ্যা ও প্রতারণা বরকত ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনের ক্ষেত্রে অসততা মানুষের উপার্জনকে বরকতহীন করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি সত্য কথা বলে এবং পণ্যের দোষ-ত্রুটি প্রকাশ করে, তবে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তবে তাদের লেনদেনের বরকত মুছে ফেলা হয়। (বোখারি: ২০৭৯)
অতএব, প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত লাভ সাময়িকভাবে বেশি মনে হলেও তা প্রকৃত অর্থে কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত করে।
২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি বরকত লাভেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ুতে বরকত দেওয়া হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে (বোখারি: ৫৯৮৬)। যেখানে সম্পর্ক রক্ষা বরকতের কারণ, সেখানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নিঃসন্দেহে বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ।
৩. সুদ ও হারাম উপার্জন
সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা মানুষের হক নষ্ট করে অর্জিত সম্পদ বাহ্যিকভাবে বাড়লেও তাতে বরকত থাকে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন। (সুরা আল বাকারা: ২৭৬)
তাফসিরবিদগণ বলেন, এখানে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার অর্থ শুধু সম্পদ কমে যাওয়া নয়; বরং সেই সম্পদের বরকত, কল্যাণ ও শান্তি উঠে যাওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে ইবনে কাসির: ১/৬১৩)
৪. দিনের প্রথম ভাগকে অবহেলা করা
সকালের সময়কে আল্লাহ তাআলা বিশেষ বরকতময় করেছেন। অথচ অনেকেই দিনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টি ঘুম, অলসতা বা অপ্রয়োজনীয় কাজে নষ্ট করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকত দান করুন’। (আবু দাউদ: ২৬০৬)
তাই ফজরের পরের সময়কে ঘুমের মধ্যে না কাটিয়ে, ইবাদত, জ্ঞানার্জন ও জীবিকার কাজে ব্যয় করা বরকত অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
৫. অলসতা ও কর্মবিমুখতা
অলসতা মানুষকে ধীরে ধীরে ইবাদত, জ্ঞানচর্চা, উপার্জন এবং কল্যাণর পথে বাধা সৃষ্টি করে। এজন্যই রাসুলুল্লাহ (সা.) বারবার অলসতা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়েছেন। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় চাই’। (মুসলিম: ২৭০৬)
যে বিষয় থেকে নবী (সা.) নিজেই নিয়মিত আশ্রয়থ প্রার্থনা করেছেন, তা যে মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য বড় ক্ষতির কারণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অলসতা মানুষের সময়, সম্ভাবনা ও জীবনের বরকত নষ্ট করে দেয়।
শেষ কথা
বরকত এমন এক নেয়ামত, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। তাই জীবনের বরকত ধরে রাখতে হলে মিথ্যা ও প্রতারণা বর্জন করতে হবে, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে, সুদ ও হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকতে হবে, দিনের প্রথম ভাগকে মূল্য দিতে হবে এবং অলসতাকে পরিহার করতে হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলে, আল্লাহ তার জীবন, সময়, পরিবার ও রিজিকে এমন বরকত দান করেন, যা কোনো পার্থিব হিসাব দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।
লেখক: শরিয়াহ কনসালট্যান্ট