

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের সাক্ষাৎ মানেই বল গড়ানোর আগে বাতাসে ভাসে ইতিহাসের বারুদগন্ধ। আটলান্টায় পুরোনো গল্প ফিরছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের নতুন মোড়কে।
দক্ষিণ আটলান্টিকের হিমশীতল জলরাশিতে ১৯৮২ সালের এপ্রিলে যে আগুন জ্বলেছিল, সেই তাপ যেন আজও আঁচ করা যাচ্ছে! আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে সেনা পাঠিয়েছিল সার্বভৌমত্বের পুরোনো দাবি সামনে রেখে; ব্রিটেন পাল্টা জবাব দিয়েছিল রণতরী পাঠিয়ে। ৭৪ দিনের যুদ্ধে প্রাণ গেছে দুই পক্ষের সেনাদের। ব্রিটিশ ডুবোজাহাজের টর্পেডোয় ডুবেছে আর্জেন্টাইন রণতরী জেনারেল বেলগ্রানো, লন্ডনের ট্যাবলয়েডে সেই খবর ছাপা হয়েছিল বিজয়োল্লাসের ভাষায়। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আর্জেন্টিনার সাংবিধানিক দাবি এখনো অটুট, ফকল্যান্ডবাসীর গণভোটে ব্রিটেনের প্রতি আনুগত্যও অটল। রাজনীতির টেবিলে যুদ্ধ থেমেছে ঠিকই, কিন্তু ফুটবলের মাঠে সেই যুদ্ধ যেন প্রতিবার মুখোমুখিতে নতুন করে জেগে ওঠে।
যুদ্ধের আগেই অবশ্য বীজ বোনা হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। ওয়েম্বলিতে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে লাল কার্ড দেখানো হলে মাঠ ছাড়তে অস্বীকার করেন তিনি। ম্যাচ শেষে ইংলিশ কোচ আলফ রামসি আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলে আগুনে ঘি ঢালেন। সেই তিক্ততার ষোলো বছর পর যুদ্ধ, আর যুদ্ধের চার বছর পর ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা ফুটবলেও লড়াইয়ের উত্তাপ নামান। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক ম্যাচে তিনি লিখলেন দুই বিপরীত মেরুর গল্প—‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। ২-১ ব্যবধানে জিতে ম্যারাডোনা নিজেই পরে স্বীকার করেছিলেন, এই জয় তাদের কাছে ছিল যুদ্ধজয়ের সমান তৃপ্তির।
১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ১৮ বছরের মাইকেল ওয়েন আর্জেন্টাইন রক্ষণ চিরে গোল করলেন। ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড ইংল্যান্ডকে পরিণত করল দশজনের দলে। ২-২ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল। চার বছর পর, ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে সেই বেকহামই নিলেন মধুর প্রতিশোধ, পেনাল্টি থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে এনে দিলেন ১-০ জয়। সেদিন সাপোরোর গ্যালারিতে ব্রিটিশ সমর্থকদের গর্জন যেন বিশ বছর আগের যুদ্ধজয়ের উল্লাসেরই প্রতিধ্বনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে এ পর্যন্ত চারবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, তার আগে ১৯৬২ সালেও গ্রুপ পর্বে লড়েছিল দুই দেশ, যেখানে জিতেছিল ইংল্যান্ড। মোট হিসাবে ইংল্যান্ড জিতেছে তিনবার, আর্জেন্টিনা একবার। একবারের নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকারে, যেখানে হাসি ফুটেছিল আর্জেন্টিনার মুখে।
এবার সেই পুরোনো গল্পে যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ২০০২ সালের পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল, আর নকআউট পর্বে শেষবার দেখা হয়েছিল সেই ১৯৯৮ সালে। জয়ী দল উঠবে ফাইনালে, হারা দল নামবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ে। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির জন্য এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ, আর তাই এই লড়াইয়ে মিশে আছে আবেগের আরেক স্তর। ১৯৬৬ সালের পর নিজেদের প্রথম শিরোপার স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা তাকিয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের দিকে।
মাঠের বাইরেও এই ম্যাচের উত্তাপ কম নয়। আটলান্টার রাস্তায় ম্যাচের আগেই দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে বেঁধে গেছে হাতাহাতি, যার জেরে শহরজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা নজরদারি। ফকল্যান্ডের সেই পুরোনো ক্ষত, ম্যারাডোনার হাতের জাদু, বেকহামের প্রতিশোধ, সব মিলিয়ে এই সেমিফাইনাল শুধু একটি ম্যাচ নয়, বরং দুই জাতির ইতিহাস, অহংকার আর আবেগের এক অগ্নিপরীক্ষা।