কালবেলা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:২১ পিএম
আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

আলোচনার আড়ালে থাকা এক সৎ কর্মকর্তার বিদায়

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ। ছবি : কালবেলা
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ। ছবি : কালবেলা

সরকারি চাকরির দীর্ঘ পথচলারও একদিন শেষ হয়। কেউ বিদায় নেন আলোচনার কেন্দ্রে, কেউ থেকে যান মানুষের শ্রদ্ধা আর স্মৃতিতে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদের বিদায় ছিল দ্বিতীয়টির মতো। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ছিল তার কর্মজীবনের শেষ দিন। এ উপলক্ষে তাকে সংবর্ধনা জানায় দুর্নীতি দমন কমিশন।

প্রায় ৩১ বছরের কর্মজীবন শেষে দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক অধ্যায় শেষ করলেও সহকর্মীদের কাছে তিনি থেকে গেলেন একজন সৎ, নিরহংকার ও পেশাদার সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে, যার পরিচয় ছিল কাজে—প্রচারে নয়।

বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম। এ ছাড়া সংস্থাটির সব মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক ও উপসহকারী পরিচালকসহ সব কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কর্মকর্তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

অবসর জীবনে কী করতে চান— এমন প্রশ্নে কালবেলাকে আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সাংবাদিকতা করেছি। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৩ বছর সাংবাদিকতা করেছি। অবসরে আমি আমার পূর্বের পেশায় ফিরে যেতে চাই। বাকি জীবন সাংবাদিকতা করেই কাটাতে চাই।’

দুদকে অনেক কর্মকর্তা এসেছেন, গেছেন। কেউ আলোচিত হয়েছেন বড় কোনো মামলার কারণে, কেউ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে, কেউ আবার বিতর্কে। কিন্তু আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ ছিলেন ভিন্ন ধরনের কর্মকর্তা। প্রচারের আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখে নীরবে দায়িত্ব পালন করাই ছিল তার স্বভাব। নিজের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেই তিনি সবসময় বড় করে দেখেছেন— স্মৃতিচারণ বক্তব্যে এমনটাই বলেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।

অনেকেই যখন ক্ষমতার সঙ্গে আপস করে পদপদবি বা পদোন্নতি ভাগিয়ে নেন সেখানে আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ ছিলেন ভিন্ন এক চরিত্রের মানুষ। কখনো ক্ষমতার সঙ্গে আপস করেননি, মাথানত করেননি কোনো অন্যায় আবদারের কাছে। যার মূল্য তাকে তার পেশাগত জীবনে চুকাতে হয়েছে চরমভাবে। একাধিকবার পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। বেশ কয়েকবার অন্যায় দাবি না মেনে মামলার তদন্তের দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে তার জীবনে।

জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে (বিএসিবি) জেলা দুর্নীতি দমন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরে যখন ব্যুরো থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠিত হয়, তখন সেই রূপান্তরের পুরো সময়টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। মাঠপর্যায়ের তদন্ত, গোয়েন্দা কার্যক্রম, প্রশাসনিক দায়িত্ব— ধাপে ধাপে প্রায় প্রতিটি স্তর অতিক্রম করে তিনি প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অভিজ্ঞ কর্মকর্তায় পরিণত হন।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী। গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর আইন ও ব্যবসায় প্রশাসনেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। দুর্নীতি দমন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, তদন্ত কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে দেশ-বিদেশে একাধিক প্রশিক্ষণে অংশ নেন।

থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও করেছেন।

দুদকের ভেতরে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল গোয়েন্দা কার্যক্রমে দক্ষতা। দীর্ঘ সময় কমিশনের গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্ব দিয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান কার্যক্রম তদারকি করেছেন। তার সহকর্মীরা বলেন, তিনি কখনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে বিশ্বাস করতেন না। অভিযোগের পেছনের নথি, তথ্য, প্রমাণ ও আইনি ভিত্তি যাচাই করেই তিনি সিদ্ধান্ত নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এ কারণে অনেক জটিল অনুসন্ধানে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।

২০২৫ সালে তিনি মহাপরিচালক পদে পদোন্নতি পান। দায়িত্ব পালনের সময় প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও কাজ করেছেন। কমিশনের ভেতরে দক্ষ জনবল তৈরি এবং আধুনিক তদন্ত ব্যবস্থার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে সহকর্মীরা জানান। তাকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা একটি বিষয়ে প্রায় একমত—আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদ ছিলেন অত্যন্ত সংযত একজন মানুষ।

অপ্রয়োজনীয় প্রচার, ব্যক্তিগত প্রচারণা কিংবা সংবাদমাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরার প্রবণতা তার মধ্যে ছিল না। অনেক আলোচিত অনুসন্ধানের পেছনে কাজ করলেও তিনি কখনো ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেননি। বরং প্রতিষ্ঠানকে সামনে রাখাই ছিল তার নীতি।

দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘জাহিদ স্যারকে যতটা কাছ থেকে দেখেছি, ততটাই মনে হয়েছে তিনি দায়িত্বকে চাকরি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের প্রতি অঙ্গীকার হিসেবে দেখতেন। তিনি কম কথা বলতেন, কিন্তু যেটুকু বলতেন, সেটুকুই কাজের কথা।’

প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার মতে, দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানে কাজ করা সহজ নয়। একদিকে রাজনৈতিক, অন্যদিকে প্রশাসনিক ও সামাজিক নানা চাপের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই বাস্তবতায় দীর্ঘ সময় সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করাও একটি বড় অর্জন। আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদের কর্মজীবনকে তারা সেই দৃষ্টিতেই মূল্যায়ন করেন।

সরকারি চাকরির শেষ দিনেও তার মধ্যে কোনো বাড়তি আবেগের প্রকাশ দেখা যায়নি। প্রতিদিনের মতোই অফিসে এসেছেন, সহকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন, দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন এবং নীরবে কর্মস্থল ছেড়েছেন। হয়তো এটাই তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বড় পরিচয়— কাজের সময় যেমন নীরব, বিদায়ের সময়ও তেমনি নীরব।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা অবসরের পর বিস্মৃত হয়ে যান। কিন্তু একজন কর্মকর্তা তার পদবির জন্য নয়, কর্ম ও চরিত্রের জন্য স্মরণীয়। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর আজ তিনি অবসরে। দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হয়েছে, কিন্তু একজন সৎ, নির্লোভ ও নীরব কর্মীর পরিচয় হয়তো থেকে যাবে দুদকের করিডোরে, সহকর্মীদের স্মৃতিতে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার ইতিহাসের এক অনুল্লেখিত অথচ সম্মানজনক অধ্যায়ে।

শেষ কর্মদিবসে অনুভূতি জানতে চাইলে সদ্যবিদায়ী মহাপরিচাল আবদুল্লাহ্-আল-জাহিদ বলেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দিত। আমি এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আজকের পর থেকে আমি মুক্ত। দুদকের মতো অতিগুরত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অত্যন্ত চাপের। এই চাপ দায়িত্বের। নিজের প্রতি নিজের কমিটমেন্টের।’

আবদুল্লাহ্-আল্-জাহিদের সহধর্মিণী বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা এবং দেশের প্রখ্যাত গাইনোকলজিস্ট।

কালবেলা/এসওআর
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৩ বছরের গৌরবময় পথচলায় হোটেল সারিনা ঢাকা

আইইউবিএটিতে বিএনসিসির পাঁচ দিনব্যাপী ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠিত

১ মিনিটের টর্নেডোতে লন্ডভন্ড গ্রাম

ফাইনালে ইউরোজয়ী স্পেন, কেমন হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার একাদশ?

বিদ্রোহীদের হামলায় মালিতে অন্তত ৫০ সেনা নিহত

‘স্পেন ২-১ ব্যবধানে জিতবে’

কুয়েত প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বার্তা

এআইইউবি ও বিআইজিএফের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই

২ সমীকরণে গোল্ডেন বুট জিততে পারেন মেসি

মিডল্যান্ড ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক কৌশলগত সম্মেলন অনুষ্ঠিত

১০

কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে আবারও হামলা চালাল ইরান

১১

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার বার্ষিক গালা ডিনার ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

১২

বগুড়ার আলোচিত সেই তিন ইউনিয়নের নতুন নাম ঘোষণা

১৩

মোজতবা খামেনির নির্দেশনা মেনে চললেই বিজয় অর্জন সম্ভব: গালিবাফ

১৪

সালিশে প্রকাশ্যে জুতাপেটা, ইউপি চেয়ারম্যানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

১৫

আলোচিত শিশু আয়নী হত্যা মামলার রায় সোমবার

১৬

তারকারাও চাইছেন আর্জেন্টিনার জয়, মেসিদের ঘিরে শোবিজে উচ্ছ্বাস

১৭

শিপার্স কাউন্সিল অফ বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

১৮

শিশুকে নির্যাতন করে মাদ্রাসা শিক্ষকের রিলস / ‘পিচ্চি পোলাপানরে কান্না করাইতে ভালোই লাগে’

১৯

ঢাকাসহ ১৭ জেলায় রাতের মধ্যে ঝড়ের আভাস

২০
X