

ফুটবল কখনো এমন মঞ্চ সাজায়, যেখানে মাঠের লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে বাইরের গল্প। বুধবার আটলান্টায় ঠিক তেমনই এক মঞ্চ প্রস্তুত—আর্জেন্টিনার মুখোমুখি ইংল্যান্ড। দুই দলের সাক্ষাৎ মানেই অদৃশ্য উত্তাপ। এবারের গল্পটা রচিত হচ্ছে অন্য জায়গা থেকে—দুটি দল এই পর্যায়ে আসতে প্রাণ বাজি রাখা লড়াই করেছে।
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়ে সংগ্রামী যাত্রা শুরু করে। মিশরের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ ১১ মিনিটে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য এক জয় ছিনিয়ে আনে। সবশেষে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে পরাজিত করে শেষ চারে পা রাখে দলটি। প্রতিটি ম্যাচেই যেন হারের দুয়ার থেকে ফিরে আসার এক অলিখিত অভ্যাস গড়ে তুলেছে লিওনেল স্কালোনির দল।
ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে লিওনেল মেসি নিজেই বাস্তবতা মেনে নিয়ে বলেন, ‘আমাদের এটিকে বাস্তবসম্মতভাবে দেখতে হবে। এটি একটি পরাশক্তি, একটি দুর্দান্ত দলের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। আমাদের লক্ষ্য থাকবে সেরা শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় থেকে ফের মাঠে লড়াই করা।’ ৩৯ বছর বয়সেও আসরে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি এখন কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে।
সাবেক আর্জেন্টাইন তারকা কার্লোস তেভেজের চোখে এই দলটাকে বোঝা সহজ নয়। সাবেক মানচেস্টার ইউনাইটেড ফরোয়ার্ড বলেন, ‘এই দলটিকে বিশ্লেষণ করা খুব কঠিন। আমার মনে হচ্ছে, এই দলটি আমাদের এমন এক অভ্যাসে অভ্যস্ত করে তুলছে যেখানে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিচ্ছে।’ সত্যিই তো—যেখানে দলগত ছন্দ হোঁচট খায়, সেখানে একজন মেসির জাদুকরী পা নির্ধারক হয়ে ওঠে, দলকে টেনে তোলে।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের গল্পটাও কম নাটকীয় নয়। থমাস টুখেলের দল শেষ ষোলোয় মেক্সিকো সিটির প্রতিকূল আবহাওয়ায় দশজন নিয়ে লড়াই করে জয় ছিনিয়ে আনে। পরবর্তী সময়ে মিয়ামির তীব্র গরম আর আর্দ্রতার মধ্যে অতিরিক্ত সময়ে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ওঠে। শারীরিক ও পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা জয় করার এই ক্ষমতাই যেন ইংল্যান্ডের এবারের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। দলের প্রাণভোমরা হয়ে উঠেছেন রিয়াল মাদ্রিদের ২৩ বছর বয়সী মিডফিল্ডার জুড বেলিংহাম—মেক্সিকোর বিপক্ষে দুই গোল, নরওয়ের বিপক্ষে আরও দুটি করেছেন। অধিনায়ক হ্যারি কেন এখনো দলের ভরসার প্রতীক হয়ে আছেন ঠিকই। আসরের গল্পটা ক্রমশ বেলিংহামময় হয়ে উঠছে। ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল জানেন, শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ভর করে থাকা যায় না বেশিদূর। দলের খেলা আরও নিয়ন্ত্রণ আর নিখুঁত হওয়া দরকার, এমন প্রকাশ্য দাবিও তুলেছেন এই জার্মান কোচ।
মজার বিষয়, এই লড়াই হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির ক্যারিয়ারের একেবারে প্রথম ম্যাচ—যেন দুই দশকের এক কিংবদন্তি অধ্যায়ে যুক্ত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক পাতা। সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ইয়ান রাইট অবশ্য আত্মবিশ্বাসী, ‘আর্জেন্টিনাকে খেলতে দেখে মনে হচ্ছে, ওদের হারাতে পারব। তারা যেভাবে খেলে এবং যেভাবে তারা নিজেদের ডিফেন্সিভ লাইনে সংকুচিত করে রাখে, আমার মনে হয় আমরা তাদের আটকে দিতে এবং তাদের রক্ষণ ভেঙে দিতে সক্ষম হব।’
দুই দলই সেমিতে এসেছে ভিন্ন দুই পথ ধরে—একদল অভিজ্ঞতা আর বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আত্মবিশ্বাস নিয়ে, আরেক দল তারুণ্যের ছন্দ আর মোমেন্টাম নিয়ে। আটলান্টার মাঠে তাই বুধবার শুধু নব্বই মিনিটের লড়াই নয়, বরং দুই ধরনের ফুটবল দর্শনের সংঘাত। বাজি শুধু ফাইনালের টিকিট নয়, বাজি এই মুহূর্তে কে বেশি ক্ষুধার্ত, কে বেশি প্রস্তুত, সেই প্রশ্নের উত্তরও। ফল যাই হোক, এই সেমিফাইনাল প্রমাণ করে দেবে—কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া দলগুলোই শেষমেশ ইতিহাস লেখার সাহস রাখে।