

বড় স্বপ্ন নিয়ে কোচ নিয়োগের প্রথা ভেঙে কার্লো আনচেলত্তিকে দায়িত্ব দিয়েছিল ব্রাজিল। নরওয়ের কাছে হেরে স্বপ্নটা ফিকে হয়ে গেছে। তার পরও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের পুনর্গঠনের ভারটা ইতালিয়ান কোচের কাঁধেই রেখেছিল সেলেসাওরা। নিজ দেশ ইতালি এই কোচকে পেতে চায়—বর্ষীয়ান কোচকে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ।
ইতালিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের নতুন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পাওলো মালদিনি নিজেই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। ফেডারেশনের সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, আনচেলত্তি ও পেপ গার্দিওলা দুজনের সঙ্গেই প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। মালদিনির ভাষায়, ‘বিশ্বের সেরাদের দিয়েই শুরু করাটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে, যদিও এই দুই কোচকে পাওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করাটাই আপাতত মূল কাজ।’ গার্দিওলার সঙ্গে বার্সেলোনায় বৈঠক হলেও তার পারিশ্রমিক ও শর্ত নিয়ে জটিলতার খবরও ভেসে বেড়াচ্ছে ইতালির সংবাদমাধ্যমে।
ইতালি ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬—টানা তিন বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি, যা আজ্জুরিদের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ফুটবলশক্তির জন্য রীতিমতো লজ্জার। এই বছরের মার্চে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে প্লে-অফে পেনাল্টিতে হেরে বিশ্বকাপের দরজা বন্ধ হওয়ার পরই কোচ জেনারো গাত্তুসো পদত্যাগ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে আসেন সিলভিও বালদিনি, যিনি এখনো জাতীয় দলের হাল ধরে আছেন। দেশটির ফুটবল সংস্থার নতুন সভাপতি জোভান্নি মালাগোর হাত ধরে জুলাইয়ের শুরুতে মালদিনিকে চার বছরের জন্য টেকনিক্যাল ডিরেক্টর করে আনা হয়, সঙ্গী হিসেবে পাশে রাখা হয় লিওনার্দোকে, উপদেষ্টা হিসেবে। লক্ষ্য একটাই—দীর্ঘমেয়াদি একটা কাঠামো তৈরি করা, যা ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ইতালিকে সঠিক পথে রাখবে।
কিন্তু আনচেলত্তিকে পাওয়া মোটেও সহজ কাজ নয়। ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়া এই ইতালিয়ান কোচ বিশ্বকাপের আগেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেছেন। তার বেতন-ভাতার অঙ্কটাও চোখ কপালে তোলার মতো—বার্ষিক বেতনের পাশাপাশি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য বাড়তি বোনাস, ব্যক্তিগত বিমান সুবিধা, রিওর কাছে বিলাসবহুল আবাসন। এমন একটা প্যাকেজ ছেড়ে হুট করে চলে আসাটা যে কোনো কোচের জন্যই কঠিন সিদ্ধান্ত। ব্রাজিলের দায়িত্বে থাকাকালীন বাছাই পর্ব, প্রীতি ম্যাচ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ১৭ ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি, যদিও শেষটা মধুর হয়নি।
আনচেলত্তির জীবনবৃত্তান্তই বলে দেয়, কেন তাকে নিয়ে এত আগ্রহ। উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল কোচ তিনি—এসি মিলানের হয়ে দুবার আর রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনবার মিলিয়ে মোট পাঁচ শিরোপা তার ঝুলিতে। ইউরোপের পাঁচ প্রধান লিগেই শিরোপাজয়ী একমাত্র কোচও তিনি—মিলানকে ইতালিয়ান লিগ, চেলসিকে প্রিমিয়ার লিগ, পিএসজিকে লিগ ওয়ান, বায়ার্ন মিউনিখকে বুন্দেসলিগা আর রিয়াল মাদ্রিদকে লা লিগা মুকুট পরিয়েছেন। এমন সিভি নিয়ে কোনো জাতীয় দল আগ্রহী না হয়ে পারে না।
আনচেলত্তি বা গার্দিওলা—কারও সঙ্গেই যদি শেষমেশ কথা না এগোয়, ইতালির হাতে বিকল্পও প্রস্তুত। ২০২০ সালের ইউরোজয়ী রবার্তো মানচিনির নাম ঘুরেফিরে আসছে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের আলোচনায়। সাবেক কোচ আন্তোনিও কন্তে ও বিশ্বকাপজয়ী মিডফিল্ডার আন্দ্রেয়া পিরলোও তালিকায় আছেন।
ব্রাজিল অবশ্য এই পুরো আলোচনায় বেশ সতর্ক নজরে দেখাচ্ছে। আনচেলত্তি নিজে প্রকাশ্যে ব্রাজিল ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়—ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ক্লাব কোচদের একজন কি শেষ পর্যন্ত নিজের দেশের ডাকে সাড়া দেবেন, নাকি সেলেসাওদের সঙ্গেই লিখে যাবেন আরেকটা অধ্যায়? উত্তরটা হয়তো সময়ই দেবে, কিন্তু ততদিন এই জল্পনা ফুটবলবিশ্বকে ব্যস্ত রাখবে আরও বেশ কিছুদিন।