

রাজশাহী বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোয় অস্ত্রোপচারের (সিজারিয়ান) মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জরুরি পরিস্থিতিতে মা ও নবজাতকের জীবন বাঁচাতে ব্যবহৃত এ চিকিৎসাপদ্ধতি এখন হয়ে উঠছে ‘সাধারণ নিয়ম’। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালগুলোয় এখন প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে চারজনেরই জন্ম হচ্ছে সিজারিয়ানে—যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রায় তিনগুণ।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচার’-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজশাহী বিভাগের সরকারি হাসপাতালে সিজারের হার ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, প্রয়োজনভিত্তিক সিজারের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন ছাড়া সিজার করালে মায়ের শরীরে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়, নবজাতকের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে এবং পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ বাড়ে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গবেষক দল। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ৩৯৩ জন প্রসূতির ওপর করা জরিপের ভিত্তিতে এ ফলাফল উঠে এসেছে।
নওগাঁ জেলায় সিজারের সর্বোচ্চ হার—৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০০টি জন্মের প্রায় অর্ধেকই অস্ত্রোপচার করে হচ্ছে। রাজশাহী বিভাগজুড়ে গড়ে এই হার ৪১ শতাংশ। এমনকি কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে সিজার বেশি হচ্ছে—যাকে গবেষকরা অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক বলছেন।
গবেষক দলের প্রধান, ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক আবেদা খাতুন বলেন, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও সিজারের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তার ভাষায়, ‘যখন সরকারি হাসপাতালগুলোতেও বেসরকারি খাতের মতো সিজারের প্রবণতা দেখা যায়, তখন স্পষ্ট হয় চিকিৎসা-সুবিধার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সুবিধা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।’
তিনি জানান, অযৌক্তিক সিজার শুধু শারীরিক জটিলতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করে। তাই সরকারি হাসপাতালে তদারকি জোরদার, প্রোটোকল মেনে চলা এবং সঠিক কারণ ছাড়া অস্ত্রোপচার না করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
গবেষণায় সিজার বৃদ্ধির তিনটি প্রধান কারণ বলা হয়েছে—প্রথমত, জনবল সংকট; দ্বিতীয়ত, স্বল্প ঝুঁকিকে বড় করে দেখা; তৃতীয়ত, রোগীর চাপ সামলাতে দ্রুত প্রসব সম্পন্ন করার প্রবণতা। চিকিৎসকরা দ্রুত রোগী ছাড়ানোর স্বার্থে সিজার করছেন, যা আন্তর্জাতিক নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
৩১ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রসূতির মধ্যে সিজারের হার বেশি। উচ্চশিক্ষিত নারীরা সাধারণত বেশি সিজার করেন, কিন্তু রাজশাহীতে দেখা গেছে উল্টো চিত্র—নিম্ন আয়ের, কম শিক্ষিত নারীরাও অপ্রয়োজনীয় সিজারের শিকার হচ্ছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, মাতৃত্বসেবায় আর্থসামাজিক বৈষম্য স্পষ্ট। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রসূতির অংশগ্রহণ না থাকলে তাদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেকেই চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হন, প্রশ্ন করার সুযোগও পান না।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজার করা এক প্রসূতি বলেন, ‘ডাক্তার বলেছেন এখনই সিজার করতে হবে—তাই করেছি। না করলে ঝুঁকি থাকবে, এমনটাই বলা হয়েছে।’
চিকিৎসকদের অনেকে মনে করেন, প্রসবকালীন জটিলতা হঠাৎ বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে, আর পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক প্রসব পর্যবেক্ষণ করা সব সময় সম্ভব হয় না। তাই অনেকে অস্ত্রোপচারকে ‘নিরাপদ ও কার্যকর’ পদ্ধতি ভাবেন। অথচ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজার করার ঝুঁকি স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় অনেক বেশি—যেমন রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ, ভবিষ্যৎ গর্ভধারণে জটিলতা, নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, অ্যানেসথেসিয়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এমনকি মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মত, অপ্রয়োজনীয় সিজারের হার বাড়তে থাকলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাতৃমৃত্যু হ্রাস করা কঠিন হবে। স্বাস্থ্য ব্যয়ও বাড়বে।
ডাক্তার আবেদা খাতুন বলেন, ‘এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এসডিজির লক্ষ্যপূরণে এটি বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।’
গবেষণায় কিছু সুপারিশও করা হয়েছে: সরকারি হাসপাতালে সিজার সিদ্ধান্তে কঠোর নজরদারি, ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন অনুসরণ, নার্সদের উন্নত প্রশিক্ষণ, স্বাভাবিক প্রসববান্ধব অবকাঠামো তৈরি, সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রসূতির সিদ্ধান্তে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
সহযোগী অধ্যাপক আবেদা খাতুন বলেন, যথাযথ নীতি ও তদারকি থাকলে সরকারি হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় সিজারের হার অনেকটাই কমানো সম্ভব।