

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের রাজধানীতে এক দিনের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ পুরো অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। এতে এরই মধ্যে বিভিন্ন কারণে টালমাটাল থাকা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। প্রথমে নয়াদিল্লির জনাকীর্ণ এলাকায় গাড়িবোমা বিস্ফোরণ এবং এর ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইসলামাবাদে বিচারিক কমপ্লেক্সের বাইরে আত্মঘাতী বোমা হামলা—এ দুই বিস্ফোরণের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র না থাকলেও ঘটনা দুটি উভয় দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটল, যখন প্রতিবেশী এই দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কে এমনিতেই যথেষ্ট টানাপোড়েন চলছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামাবাদে বিচারিক কমপ্লেক্সের পার্কিং লটে মঙ্গলবারের আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ২০ জন আহত হন, যা গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানীতে হওয়া সবচেয়ে মারাত্মক হামলা। এ হামলার দায় স্বীকার করেছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) সংশ্লিষ্ট জামাত-উল-আহরার (জেইউএ)।
এর ঠিক এক দিন আগে নয়াদিল্লির জনাকীর্ণ এলাকায় গাড়িবোমা বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন নিহত এবং এক ডজনের বেশি মানুষ আহত হন। দিল্লির আইকনিক রেড ফোর্টের কাছে বিস্ফোরণটি ঘটে। বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগে নয়াদিল্লির বাইরের ফরিদাবাদ শহরের একটি গ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছিল এবং পুলিশ সেই বিস্ফোরক উদ্ধারের সঙ্গে রেড ফোর্ট বিস্ফোরণের কোনো সংযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে।
দোষারোপের রাজনীতি: বিস্ফোরণের ঘটনায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কোনো প্রমাণ ছাড়াই ইসলামাবাদ হামলার জন্য ‘ভারতীয় সন্ত্রাসী প্রক্সি’কে অভিযুক্ত করে দাবি করেন, ‘ভারতের সমর্থনে’ আফগানিস্তানের ভূমি থেকে এ হামলা চালানো হয়। নয়াদিল্লি অবশ্য এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও অসত্য’ দাবি করে একে পাকিস্তানের ‘হতাশাজনক ভিন্নমুখী কৌশল’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, দিল্লি বিস্ফোরণের ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং এর জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে তিনি এখন পর্যন্ত কোনো দেশকে সরাসরি অভিযুক্ত করেননি।
আঞ্চলিক অস্থিরতা: পাকিস্তান তার নিরাপত্তা সমস্যার উৎস হিসেবে আফগান ভূখণ্ডে জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলকে দায়ী করে। আফগান তালেবানরা ২০২১ সালে কাবুলের ক্ষমতা দখলের পর থেকে পাকিস্তানে জঙ্গি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ইসলামাবাদে হওয়া হামলাকে ‘যুদ্ধের অবস্থা’ এবং আফগানিস্তান সম্পর্কে ‘জাগ্রত হওয়ার ঘণ্টা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যদিও আফগান তালেবানরা পাকিস্তানি তালেবানদের সমর্থন করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।
ফের সংঘাতের ঝুঁকি: যদিও ভারত ও পাকিস্তানের রাজধানীতে এক দিনের ব্যবধানে দুটি বিস্ফোরণ বা হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো শক্তিশালী হস্তক্ষেপ দেখা যায়নি, তবে বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভারত ও পাকিস্তান—পারমাণবিক শক্তিধর এ দুই দেশের মধ্যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানও এমনটাই মনে করেন। তার মতে, পাকিস্তান তালেবান-সমর্থিত জঙ্গিদের জন্য ভারতকে দোষারোপ করছে, যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
পাকিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত ৫: পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের ওয়ানা শহরে একটি ক্যাডেট কলেজে হামলাকারী পাঁচ সন্ত্রাসী নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। প্রদেশটির দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান জেলার এ ক্যাডেট কলেজটিতে সোমবার হামলার ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানের আইএসপিআরের বরাত দিয়ে ডন জানিয়েছে, সন্ত্রাসীরা কলেজের প্রবেশপথে বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি দিয়ে সজোরে আঘাত হানার পর ভেতরে ঢুকে প্রশাসনিক ভবনে অবস্থান নেয়। সেখানে মঙ্গলবার নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে পাঁচ সন্ত্রাসী নিহত হয়।